উন্নয়নের নামে যখন গাছের শিকড় কেটে ফেলা হয়, তখন প্রকৃতি কাঁদে। কিন্তু সেই কান্না কেউ শুনে না। দেশের উত্তরের জেলা পঞ্চগড়ের সীমান্তবর্তী উপজেলা তেঁতুলিয়ার তিরনইহাট বাজার থেকে শালবাহান পর্যন্ত ১ হাজার ৮০০ মিটার সড়ক এখন যেন উন্নয়নের নামে এক নীরব নির্মমতার সাক্ষ্য হয়ে দাঁড়িয়েছে।
‘গাছ কাটিনি’ এই আশ্বাসে যখন মানুষ আশ্বস্ত, তখন বাস্তবে গাছের প্রাণ ‘শিকড়’ কেটে নির্মাণ চলছে তেঁতুলিয়ার তিরনইহাট বাজার থেকে শালবাহান পর্যন্ত ১ হাজার ৮০০ মিটার দীর্ঘ সড়কে। গাছগুলো কাটা হয়নি, কিন্তু শিকড় কেটে ফেলায় প্রকৃতির শ্বাসরুদ্ধ এক ছবি দেখা যাচ্ছে এখন প্রতিদিন।
চলমান এই সড়ক উন্নয়ন প্রকল্পে (২০২৩-২৪ অর্থবছর) ব্যয় ধরা হয়েছে ১ কোটি ৮৩ লাখ ১ হাজার ৫৭৭ টাকা, আর চুক্তিমূল্য ১ কোটি ৭৩ লাখ ৯৯ হাজার ৯৮৩ টাকা। বাস্তবায়নে নিয়োজিত মাহমুদা বেগম নামের ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানটি সড়কটি নির্মাণ করছে গাছ না কেটে। শুনতে ভালো লাগলেও বাস্তবতা ভয়াবহ, গাছ না কাটলেও কেটে ফেলা হয়েছে তাদের প্রাণ অর্থাৎ শিকড়।
এই প্রশ্ন ও অভিযোগ এখন এলাকাবাসীর প্রতিটি মুখে। গাছ কাটা হয়নি, এটা যেন লোক দেখানো মানবতা। অথচ শিকড় কেটে গাছ দাঁড়িয়ে রাখা হচ্ছে মৃত্যুর মুখে ঠেলে দেওয়ার মতোই। ঝড়-বৃষ্টিতে যে কোনো সময় ভেঙে পড়তে পারে এসব গাছ, আর তার নিচে চাপা পড়তে পারে মানুষ, দোকান, স্বপ্ন। এমনটি অভিযোগ স্থানীয় এলাকাবাসীর।
ছবি: খবরের কাগজ
সরেজমিনে দেখা যা, তিরনই বাজার সংলগ্ন সড়কের দুই পাশে ৩ ফুট বধিত করা হচ্ছে। এতে দেখা যায় সড়ক বর্ধিত স্থানে কয়েকটি গাছ দাঁড়িয়ে রয়েছে। কিন্তু গাছ না কেটে শুধু শিখড় কেটে করা হচ্ছে সড়কের কাজ। ফলে গাছের স্থানে গাছ দাঁড়িয়ে থাকছে শিখড় কাটা অবস্থায়। এতে বুঁকিতে গাছ ও মানুষও।
তবে স্থানীয়দের অভিযোগ, অনেকবার বিষয়টি জানালেও কেউ ব্যবস্থা নেয়নি। তাই প্রশ্ন উঠেছে, প্রকৃতি যখন নিঃশব্দে মরছে, তখন প্রশাসন চুপ কেন?
এদিকে স্থানীয়রা ও সচেতন মহল বলছে, এই ঘটনা উন্নয়নের প্রকৃত রূপ দেখিয়ে দেয়। যেখানে পরিকল্পনার অভাব, সমন্বয়ের ঘাটতি ও দায়িত্বহীনতা একত্রে প্রকৃতিকে হত্যা করছে।
এবিষয়ে স্থানীয় বীর মুক্তিযোদ্ধা ওবায়দুল হক বলেন, ‘উন্নয়ন চাই, কিন্তু গাছ মেরে নয়। গাছের শিকড় কেটে রাস্তা বানানো মানে মানুষের জীবনকেও বিপদে ফেলা। গাছ কর্তন করে সড়ক মির্মাণ করুক। কিন্তু গাছ রেখেছে অথচ তার শিকড় কেটে ফেলা হয়েছে। আমরা স্থানীয়রা একাধিকবার ঠিকাদার, এলজিইডি ও স্থানীয় প্রশাসনসহ জনপ্রতিনিধিদের জমিয়েছি কিন্তু কোনো ব্যবস্থা নেয়নি।
ছবি: খবরের কাগজ
এদিকে দোকানদার রাজিউর রহমান তরুণ বলেন, আমার দোকানের ঠিক পাশে গাছ, সেই গাছের শিকড় কেটে দিয়ে ঠিকাদার সড়ক নির্মাণের কাজ করছে। গাছ কাটার আগে ঠিকাদারকে আমরা অনেক বুঝিয়েছি কিন্তু তারা গাছ কাটেনি। সড়কটিকে নির্মাণের জন্য গাছ কাটা জরুরি কিন্তু গাছ না কেটে, কেটেছে গাছের শিখড়। আমরা নিরাপত্তাহীনতায় ভুগছি। যদি গাছ কোনো সময় ভেঙে দোকানে পড়ে। এই দায়ভার কেউ নিচ্ছে না।
এদিকে পথচারী মোস্তফা কামাল শিমুল বলেন, এই রাস্তা বানানো হচ্ছে মানুষের জন্য, কিন্তু এখন মানুষই সবচেয়ে বড় ঝুঁকিতে। গাছ রেখেই করা হচ্ছে সড়ক। আর একটি জীবন্ত গাছের শিকড় কেটে দিয়ে তারা উন্নয়নের গান গায়। গাছেরও জীবন আছে। সড়কটি দুই পাশ বাড়াতে যদি গাছ কর্তন করার প্রয়োজন হয় তাহলে গাছ কর্তন করুক। তাই বলে এভাবে ঝুঁকিতে ফেলবে আমাদের। প্রতিদিন শত শত মানুষ, যানবাহন চলাচল করছে। ভবিষ্যতে কোনো দুর্ঘটনা ঘটলে আামদের দায়ভার কে নিবে এটা নিশ্চিত করুক আগে।
এদিকে তেঁতুলিয়া উপজেলা এলজিইডির প্রকৌশলী ইদ্রিস আলী খান জানান, গাছ কাটার মালিক ইউএনও ও বনবিভাগ। গাছ তো আমার না। আমাদের হচ্ছে রাস্তা। আমাদের গাছ কাটার অনুমতি না পেলে আমরা তো গাছ কাটতে পারব না। গাছের শিকড় ঠিকাদারের লোকজন আমাদের না জানিয়ে কাটছে। আমি এ বিষয়ে খবর পেয়ে তৎক্ষণাৎ এসে নিষেধ করলাম, শিখড় কাটা যাবে না। গাছের মালিক যারা তারা এটার ব্যবস্থা নিবে।
উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) আফরোজ শাহীন খসরু বলেন, ‘আমি গাছ কাটার অনুমতি দিইনি। আমি খবর পেয়ে সরেজমিনে গিয়েছি, প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে।’
মো. রনি মিয়াজী/মাহফুজ