সাতক্ষীরার আশাশুনি উপজেলার বিছট গ্রামের সাহেব আলী মোড়লের বাড়ির সামনে পানি উন্নয়ন বোর্ডের (পাউবো) বেড়িবাঁধে ফের বড় ধরনের ভাঙন দেখা দিয়েছে। খোলপেটুয়া নদীর প্রবল জোয়ারে যেকোনো সময় বেড়িবাঁধ ভেঙে আনুলিয়া ও পার্শ্ববর্তী খাজরা ইউনিয়নের বিস্তীর্ণ এলাকা প্লাবিত হয়ে যেতে পারে। এতে এলাকাবাসীর মধ্যে আতঙ্ক বিরাজ করছে।
খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, সাতক্ষীরা পানি উন্নয়ন বোর্ড বিভাগ-২-এর আওতাধীন ৭/২ পোল্ডারের বিছট গ্রামের সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের কাছ থেকে বিছট খেয়াঘাট পর্যন্ত দীর্ঘদিন ধরে বেড়িবাঁধে ভাঙন দেখা দিয়েছে। যেকোনো প্রাকৃতিক দুর্যোগ ছাড়াও খোলপেটুয়া নদীর প্রবল জোয়ারে প্রায় প্রতিবছর এই বাঁধের কোনো না কোনো জায়গা ভেঙে লোকালয়ে পানি প্রবেশ করে।
বিষয়টি পাউবোর সংশ্লিষ্ট বিভাগের কর্তৃপক্ষ অবহিত থাকা সত্ত্বেও বাঁধটি সঠিকভাবে মেরামতে কোনো কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়া হয় না। শুধু ভেঙে গেলে একজন ঠিকাদার নিয়োগ করে কাজ শুরু করা হয়। নদীভাঙনে বিছট গ্রামের পঞ্চাশের বেশি পরিবার বাস্তুচ্যুত হয়ে অন্যত্র চলে গেছে। নদীতে বিলীন হয়ে গেছে বিছট মোড়লবাড়ির জামে মসজিদ, ইবতেদায়ি মাদ্রাসা, সরকারি বড় একটি পুকুর, গাজী বাড়ির মসজিদসহ শতাধিক বাড়িঘর ও ফসলি জমি। হুমকির মুখে রয়েছে বিছট সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়।
স্থানীয়রা অভিযোগ করে বলেন, ‘পানি উন্নয়ন বোর্ডের গাফিলতির কারণে গত ৩১ মার্চ সকাল পৌনে ৯টার দিকে বিছট গ্রামের আবদুর রহিম সরদারের ঘেরের বাসার পাশ থেকে প্রায় ১৫০ ফুট এলাকাজুড়ে বেড়িবাঁধ হঠাৎ করে খোলপেটুয়া নদীতে বিলীন হয়ে যায়। এতে আনুলিয়া ইউনিয়নের ছয়টি গ্রাম প্লাবিত হয়। এসব গ্রামের ৪৫০-৫০০টি চিংড়ির ঘের প্লাবিত হয়ে চাষিদের প্রায় ১৩ কোটি টাকার ক্ষতি হয়। একই সঙ্গে ২০ হেক্টর জমির বোরো ধান ও প্রায় দেড় হেক্টর জমির গ্রীষ্মকালীন সবজি নষ্ট হয়। বাঁধ ধসে পড়ার পাশাপাশি ক্ষতিগ্রস্ত হয় প্লাবিত এলাকার প্রায় ৬০০ ঘরবাড়ি। দায়িত্বে অবহেলার কারণে পাউবো বিভাগ-২-এর তৎকালীন নির্বাহী প্রকৌশলী মো. সাখাওয়াত হোসেনকে স্টান্ডরিলিজ করা হয়।
বিছট গ্রামের ভাঙনকবলিত এলাকার রুহুল আমিন মোড়ল বলেন, ‘বর্ষা শুরুর আগে গ্রামের সাহেব আলী মোড়লের বাড়ির সামনে বেড়িবাঁধে ভয়াবহ ফাটল দেখা দেয়। কয়েকদিন আগে বাঁধের ফাটলের একটি অংশ নদীতে ধসে পড়ে। এই বাঁধ মেরামতের জন্য ঈদুল ফিতরের আগে একজন ঠিকাদার নিয়োগ দেওয়া হলেও এখনো কাজ শুরু হয়নি। ফলে খোলপেটুয়া নদীর প্রবল জোয়ারের তোড়ে বাঁধের ভাঙন বাড়ছে। বিষয়টি পাউবো কর্তৃপক্ষকে জানানো হলেও তারা কোনো গুরুত্ব দিচ্ছে না। দ্রুত বাঁধ মেরামতে কার্যকর ব্যবস্থা না নিলে বিছট গ্রামে গত ৩১ মার্চের পুনরাবৃত্তি হতে পারে। গ্রামবাসীর জানমাল রক্ষায় দ্রুত বাঁধ মেরামত করতে হবে।’
বিছট গ্রামের অবসরপ্রাপ্ত শিক্ষক নজরুল ইসলাম বলেন, ‘বেড়িবাঁধের ভাঙনের বিষয়টি পাউবো কর্তৃপক্ষ আগে থেকে অবহিত আছেন। কিন্তু বাঁধ মেরামতে তারা কোনো ব্যবস্থা নিচ্ছেন না। ঠিকাদারের কোনো লোকও এখানে আসেন না। দ্রুত ভাঙন এলাকায় জিও ব্যাগ ডাম্পিং করতে না পারলে সামনের বড় জোয়ারে বাঁধ কোনোভাবেই রক্ষা করা যাবে না। পাউবো কর্তৃপক্ষের দায়িত্বে অবহেলার কারণে বিছট গ্রাম তথা পুরো আনুলিয়া ইউনিয়নবাসীকে আবারও নদীর পানিতে ডুবতে হবে।’
আনুলিয়া ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান মো. রুহুল কুদ্দুস বলেন, ‘গত ৩১ মার্চ বিছট গ্রামের বাঁধ ভেঙে আমার ইউনিয়নে ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতি হয়। বিছট ও মনিপুর গ্রামে বেড়িবাঁধে ভয়াবহ ভাঙন দেখা দিয়েছে। আমি নিজে গত বুধবার সাতক্ষীরা পানি উন্নয়ন বোর্ড অফিসে গিয়ে বিষয়টি জানিয়ে এসেছি।’
সাতক্ষীরা পাউবো বিভাগ-২-এর নির্বাহী প্রকৌশলী মো. আবদুর রহমান তাযকিয়া বলেন, ‘খবর পেয়ে দুজন সেকশন অফিসারকে নিয়ে আমি ঘটনাস্থল পরিদর্শন করেছি। ঠিকাদার দ্রুত কাজ শুরু করবেন এবং ভাঙন রোধে জিও ব্যাগ ডাম্পিং করা হবে। আশা করছি, দ্রুত কাজ সম্পন্ন হবে।’