২৭ জুলাই দুপুর ২টা। লক্ষ্মীপুরের দালাল বাজার-মীরগঞ্জ সড়কের গঙ্গাপুর এলাকা। একটি ট্রাক জেলা সদর থেকে মুদিদোকানের মালামাল নিয়ে রামগঞ্জ যাচ্ছিল। পথে গঙ্গাপুরের কাঁচা সড়কে আটকে যায়। বিপরীত দিক থেকে আসছিল বালুবোঝাই একটি পিকআপ। সেটিও ঠিক একই জায়গায় এসে আটকা পড়ে। দুপাশের যানচলাচল বন্ধ হয়ে যায়। গ্রামবাসী তখন ছুটে আসেন। রশি দিয়ে টেনে, পেছন থেকে ধাক্কা দিয়ে চলে উদ্ধার অভিযান। ঘণ্টাখানেকের চেষ্টায় গাড়ি দুটি রাস্তার গর্ত থেকে তোলা হয়।
প্রায় ৯ কিলোমিটার দৈর্ঘ্যের দালাল বাজার-মীরগঞ্জ সড়কের এমন চিত্র নিত্যদিনের। দীর্ঘদিন ধরে সংস্কার না হওয়ায় সড়কটি চলাচলের উপযোগিতা হারিয়েছে। রাস্তার পিচ-পাথর উঠে সড়কে বড় বড় গর্ত তৈরি হয়েছে। প্রায় প্রতিদিনই এই সড়কে যাতায়াতকারীদের দুর্ঘটনার কবলে পড়তে হয়ে। রয়েছে একাধিক মানুষের পঙ্গু হওয়ার মতো ঘটনাও। অথচ লক্ষ্মীপুর সদরের সঙ্গে রামগঞ্জ উপজেলার কয়েক লাখ মানুষের যোগাযোগের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ সড়ক এটি।
সড়কটির বিভিন্ন জায়গায় ঘুরে দেখা গেছে, প্রায় ৯ কিলোমিটার রাস্তার বেশির ভাগ অংশে কার্পেটিং উঠে বড় বড় গর্ত তৈরি হয়েছে। সবচেয়ে বেশি খারাপ অবস্থা দালাল বাজার থেকে চৌধুরী বাজার ও কাফিলাতলি থেকে মীরগঞ্জ বাজার অংশে। বৃষ্টির মৌসুমে গর্তগুলো ছোট জলাশয়ে পরিণত হয়। এসব স্থানে সিএনজিচালিত অটোরিকশা, ট্রাকসহ অন্য যানবাহনগুলো ঝুঁকি নিয়েই চলাচল করছে।
স্থানীয়রা জানান, প্রতিদিন কোনো না কোনো যানবাহন গর্তে আটকে পড়ে। তখন পুরো রাস্তায় যান চলাচল বন্ধ হয়ে যায়। যাত্রীরা অনেক সময় মাঝপথেই গাড়ি থেকে নেমে যান। সবচেয়ে বেশি দুর্ভোগে পড়তে হয় অসুস্থ রোগীদের। অ্যাম্বুলেন্সও নির্বিঘ্নে চলাচল করতে পারে না।
সিএনজিচালিত অটোরিকশার চালক মো. ইউসুফ বলেন, ‘ভাঙাচোরা রাস্তায় গাড়ি চালাতে গিয়ে প্রায়ই নাটবোল্ট খুলে পড়ে। ৯ কিলোমিটার রাস্তা পাড় হতে এক ঘণ্টারও বেশি সময় লাগে। এতে জ্বালানি খরচ বেশি হয়। কিন্তু সব সময় অতিরিক্ত ভাড়া নেওয়া যায় না।’
স্থানীয় সামাজিক সংগঠন স্বাধীনতা স্পোর্টিং ক্লাবের ভারপ্রাপ্ত সাধারণ সম্পাদক ফয়সাল কবির বলেন, ‘দীর্ঘদিন ধরে সড়কটি সংস্কারের দাবি জানিয়ে আসছি। এখন এটি মরণফাঁদে পরিণত হয়েছে। দ্রুত টেকসই সংস্কার না হলে ভোগান্তি আরও বাড়বে।’
তিনি জানান, সড়কটির দুই পাশে প্রায় ২০টি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান এবং ছয়টি ছোট-বড় বাজার রয়েছে। চৌধুরী বাজারের ব্যবসায়ী শহিদুল ইসলাম বলেন, ‘প্রায় সময় দোকানের মালামাল আনতে অতিরিক্ত ভাড়া দিতে হয়। কিন্তু গ্রাহকদের কাছ থেকে বাড়তি মূল্য নেওয়া সম্ভব নয়। এতে লাভ অনেক কমে গেছে।’
কাজীর দীঘির পাড় সমাজকল্যাণ উচ্চবিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক নিজাম উদ্দিন বলেন, ‘এর আগে রাস্তাটি খুবই নিম্নমানের সামগ্রী দিয়ে সংস্কার করা হয়। ছয় মাসের মধ্যে রাস্তায় ফাটল শুরু হয়। প্রায়ই দুর্ঘটনা ঘটে। এ বিষয়ে সংশ্লিষ্টদের কোনো মাথাব্যথা নেই।’
এ সড়কে দুর্ঘটনার কবলে পড়া সদর উপজেলার গঙ্গাপুর গ্রামের মাইক্রোবাসচালক দ্বীন মোহাম্মদ জানান, তিন মাস আগে তাকে বহন করা অটোরিকশাটি উল্টে যায়। এতে তার ডান পা ভেঙে যায়। দুই মাসের বেশি সময় তাকে চিকিৎসা নিতে হয়েছে। লাখ টাকা খরচ হয়েছে। নন্দনপুর সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের চতুর্থ শ্রেণির ছাত্রী জেদনী আক্তারের বাবা মো. সুমন বলেন, ‘আমার মেয়ে ছয় মাস আগে এই সড়কে দুর্ঘটনার শিকার হয়। নোয়াখালী হাসপাতালে দুই মাস রেখে চিকিৎসা করাই। দুই লাখ টাকার উপরে খরচ হয়েছে।’
সুসাশনের জন্য নাগরিক (সুজন) লক্ষ্মীপুর শাখার সভাপতি মোহাম্মদ কামাল হোসেন বলেন, ‘দালাল বাজার-মীরগঞ্জ সড়কটি দিয়ে দীর্ঘদিন ধরে চলাচল করা যায় না। গত এক বছরে এ সড়কে শতাধিক ব্যক্তি দুর্ঘটনায় আহত হয়েছেন।’
লক্ষ্মীপুর সদর হাসপাতালের আবাসিক মেডিকেল অফিসার (আরএমও) ডা. অরূপ পাল বলেন, ‘ওই রাস্তায় আহত হয়ে প্রায়ই হাসপাতালে রোগী আসেন। যাদের অবস্থা বেশি খারাপ থাকে তাদের নোয়াখালী কিংবা ঢাকায় রেফার করা হয়।’
লক্ষ্মীপুর সদর উপজেলা প্রকৌশলী কামরুল ইসলাম বলেন, ‘সড়কটি বর্তমানে খুবই নাজুক। এরই মধ্যে মন্ত্রণালয়ে প্রকল্প পাঠানো হয়েছে। বরাদ্দ পেলে সংস্কার কাজ শুরু করা হবে।’