চট্টগ্রামের রাউজান থানা থেকে গত বছরের ৫ আগস্ট লুট হওয়া ৫৭ অস্ত্রের মধ্যে এখনো অনেকটিই উদ্ধার হয়নি। এ ছাড়া গত সরকারের আমলে যেসব লাইসেন্সধারী ছোট-বড় অস্ত্র ছিল তার বেশির ভাগ থানায় জমা হয়নি। সচেতন মহলের অভিযোগ, গত একবছর ধরে রাউজানে চলতে থাকা খুন, ডাকাতি, চাঁদাবাজিসহ সব ধরনের অপরাধে এসব অস্ত্র ব্যবহার করা হচ্ছে।
সংশ্লিষ্টরা বলছেন, ভৌগোলিক অবস্থানগত কারণে পাহাড়ের সন্ত্রাসীদের কাছ থেকে রাউজানের সন্ত্রাসীরা সহজে অস্ত্র কিনছে। রাউজানের মানুষ এতটাই আতঙ্কে আছেন যে, আক্রান্ত হওয়ার পরও থানায় মামলা বা অভিযোগ নিয়ে যাচ্ছেন না। সর্বশেষ গত মঙ্গলবার সত্তারঘাট এলাকায় হামলার ঘটনায় অন্তত ৩০ জন আহত হলেও কেউই থানায় অভিযোগ নিয়ে যাননি। সাধারণ মানুষের ধারণা, আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সহযোগিতা চাইলে তারা প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণ করতে পারবে না। বরং থানায় অভিযোগের কারণে তার পরিবারের ওপর আরও বড় ধরনের বিপদ নেমে আসবে। তাই তারা আঘাত পেয়েও চুপ থাকাকে নিরাপদ মনে করছেন।
স্থানীয়দের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, গত একবছর ধরে সন্ত্রাসীরা রাউজানের বিভিন্ন ইউনিয়নে প্রকাশ্যে অস্ত্র হাতে দল-উপদলে বিভক্ত হয়ে সংঘর্ষে লিপ্ত হচ্ছে। খুন যেন এখানে খুবই সহজ একটি ঘটনা। চাঁদাবাজি, মাটির ব্যবসা, পাহাড় কাটা, জমি দখল, গাছ কাটা নিয়ে এলাকাভিত্তিক নিজেদের আধিপত্য বিস্তারে প্রতিনিয়ত বন্দুকযুদ্ধে লিপ্ত হচ্ছে সন্ত্রাসীরা। এমন অরাজক পরিস্থিতিতে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর নীরব ভূমিকা অপরাধীদের অপরাধ কর্মকাণ্ডে উৎসাহ জোগাচ্ছে। বারবার অপরাধ করে পার পেয়ে যাওয়ায় তারা আরও বেপরোয়া হয়ে উঠেছে।
তবে এমন পরিস্থিতির জন্য বিএনপির বিবদমান দুটি গ্রুপের নেতারা এক পক্ষ অন্য পক্ষকে দায়ী করে আসছে। পরস্পরের বিরুদ্ধে অভিযোগ- আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে যারা সন্ত্রাস চাঁদাবাজি করেছে এখন নিজেদের রাজনৈতিক স্বার্থে সেসব সন্ত্রাসীদের দলে টেনে নিজ স্বার্থে ব্যবহার করছে।
জানতে চাইলে নিরাপত্তা বিশ্লেষক মেজর (অব.) এমদাদুল ইসলাম খবরের কাগজকে বলেন, ‘প্রশাসন নির্লিপ্ত, নিশ্চুপ। রাউজানে এত অস্ত্র কোথা হতে আসছে তা পুলিশ বলতে পারবে। তবে সবার আগে অর্থদাতা শনাক্ত করতে হবে। অর্থ থাকলে অস্ত্রের চাহিদা তৈরি হয়। পার্বত্য চট্টগ্রামে অনেক বিদ্রোহী গ্রুপ আছে। মিজোরাম থেকে পার্বত্য চট্টগ্রামে অস্ত্র আসে। অস্ত্র কেনা এখন খুব সহজ। তা ছাড়া রাউজান থানা লুট হয়েছে প্রায় একবছর। এখনো সব অস্ত্র ও গুলি উদ্ধার হয়নি। এসব অস্ত্রও অপরাধীরা ব্যবহার করছে না এ কথা বলার সুযোগ নেই।’
রাউজান থানার ওসি মনিরুল ইসলাম ভূঁইয়া বলেছেন, ‘লুট হওয়া অস্ত্রের মধ্যে একটি এলএমজি, একটি চায়না রাইফেল, পাঁচটি শটগান এবং সহস্রাধিক রাউন্ড গুলি এখনো উদ্ধার করা যায়নি। বাকিগুলো উদ্ধার হয়েছে।’
লুট হওয়া অস্ত্র অপরাধীরা ব্যবহার করছে- এমন অভিযোগের বিষয়ে তিনি বলেন, ‘এসব অস্ত্র অপরাধে ব্যবহার হওয়ার ঘটনা অস্বাভাবিক কিছু না। তবে এ পর্যন্ত হত্যাকাণ্ডে যেসব গুলি ব্যবহার হয়েছে তা ৭ পয়েন্ট ৬৫। থানা থেকে লুট হওয়া গুলি হচ্ছে ৭ পয়েন্ট ৬২। তবে শটগানের গুলির খোসা না পাওয়া পর্যন্ত শনাক্ত করা যায় না। তাই শটগানের গুলি ব্যবহারের বিষয়টি বোঝা যাচ্ছে না। সন্ত্রাসীদের হাতে অনেক গুলি আছে।’
ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার পরও অনেকেই ভয়ে প্রতিকার পেতে থানায় যাচ্ছেন না। এমন অভিযোগের বিষয়ে ওসি বলেন, ‘কেউ কেউ ভয়ে থানায় অভিযোগ বা মামলা করতে আসতে চান না। এ কথা সত্য। তবে এমন সংখ্যা খুবই কম। যারা আসতে চান না তাদের কাছে পুলিশ নিজে গিয়ে কথা বলে। তাদের মানসিকভাবে সাহস জোগানোর চেষ্টা করে।’ তিনি বলেন, ‘এই সমস্যা রাজনৈতিকভাবে সমাধান করতে হবে। পুলিশিংয়ের মাধ্যমে সমাধান করতে গেলে সহিংসতার ব্যাপকতা আরও বাড়বে।’
চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের ক্রিমিনলজি ও পুলিশ সায়েন্স বিভাগের সাবেক সভাপতি সাখাওয়াত হোসেন বলেছেন, ‘পুলিশ যদি রাজনৈতিকভাবে সমস্যার সমাধান করতে চায় তাহলে পুলিশের কাজটা কি? প্রয়োজনে এই থানায় যারা দীর্ঘদিন কাজ করেছিলেন বা অন্য জায়গার দায়িত্বশীলতার পরিচয় দিচ্ছেন তাদের এখানে পদায়ন করতে হবে।’ তিনি বলেন, ‘৫ আগস্টের পর সারা দেশ থেকে পুলিশ অস্ত্র উদ্ধার করেছে। রাউজানে কেন পারবে না। তবে এ কথা সত্য যে, স্বাধীনতার পর থেকে রাউজানের পরিস্থিতি খুব বেশি স্বাভাবিক ছিল তা না।’