শেখ হাসিনা পদত্যাগের একদফা দাবিতে ছাত্র-জনতার আন্দোলনে গত বছরের ৪ আগস্ট উত্তাল হয়ে ওঠে সমগ্র সিরাজগঞ্জ জেলা। সেই দিন সকাল থেকে সিরাজগঞ্জ শহরের মধ্যে খণ্ড খণ্ড মিছিল নিয়ে জড়ো হতে থাকে আন্দোলনকারীরা। অন্যদিকে এস এস রোডে অবস্থিত জেলা কার্যালয়ের সামনে অবস্থান নেয় আওয়ামী লীগ ও সহযোগী সংগঠনের নেতা কর্মীরা। এক পযায়ে পুলিশের সঙ্গে সংঘর্ষ শুরু হয় বিক্ষোভকারীদের, ঘণ্টা খানিক পর পিছু হাটতে থাকে পুলিশ। সেই দিন সকাল সাড়ে ১১টার দিকে এস এস রোড ও বড়পুল এলাকায় ছাত্র-জনতার ওপর হামলায় চালায় তৎকালীন সরকার দলীয় আওয়ামী লীগ নেতাকর্মীরা। নির্বিচারে গুলি চালায় তারা। এসময় আওয়ামী লীগের নেতাকর্মীদের গুলিতে প্রথম মৃত্যুবরণ করেন যুবদল নেতা সোহানুর রহমান রঞ্জু খান। এর কিছুক্ষণের মধ্যে ছাত্রদলকর্মী সুমন সেখ ও বিএনপিকর্মী চা বিক্রেতা আব্দুল লতিফের মৃত্যু হয়। এ খবর মুহূর্তের মধ্যে ছড়িয়ে পড়লে সমগ্র জেলা আরও উত্তপ্ত হয়ে ওঠে। রাজপথ দখলে নেয় ছাত্র-জনতা।
এরপর সংঘাত ছড়িয়ে পড়ে রায়গঞ্জ উপজেলাতেও। দুপুর ২টার পর উপজেলার ধানগড়ায় আওয়ামী লীগ কার্যালয়ে সামনে আওয়ামী লীগ ও ছাত্র-জনতা আন্দোলনকারীদের সঙ্গে পাল্টাপাল্টি হামলা শুরু হয়। এ সময় আওয়ামী লীগ নেতাকর্মীরা পাশেই অবস্থিত রায়গঞ্জ প্রেসক্লাবে আশ্রয় নিলে সেখানে হামলার ঘটনা ঘটে। সেখানে মারধরে এক সাংবাদিক ও ৫ জন আওয়ামী লীগ নেতাকর্মী মিলে ৬ জনের মৃত্যু হয়। এ ছাড়া সদর আসানের এমপি হেনরীর বাসা থেকে ২ ছাত্রলীগকর্মী গয়লা মহল্লার আসিফ ও জানপুরের শাহিনের পোড়া কঙ্কাল উদ্ধার করে ফায়ার সার্ভিসের সদস্যরা।
অন্যদিকে এনায়েতপুরে গুলিতে দুই ছাত্র শিহাব আহম্মেদ ও ছাত্র সিয়াম হোসেন এবং তাঁত শ্রমিক ইয়াহিয়া আলী প্রামানিক-সহ ৩ জনের মৃত্যু হয়। এরপরই এনায়েতপুর থানায় হামলা, অগ্নিসংযোগ ও অস্ত্র লুটের ঘটনা ঘটে। এসময় হামলাকারীদের মারধরে ১৫ পুলিশ সদস্যের মৃত্যু হয়। পরে সন্ধ্যার দিকে সেনাবাহিনী এনায়েতপুর থানায় পৌঁছে আহত পুলিশ সদস্যেদের উদ্ধার করে হাসপাতালে পাঠায়।
হামলা-ভাঙচুর
হাটিকুমরুল হাইওয়ে থানায় হামলা ও অস্ত্র লুটসহ জেলা ও উপজেলাজুড়ে আওয়ামী লীগের কার্যালয়, কয়েকটি পৌরসভা, দুইটি রেলওয়ে স্টেশন, বসতবাড়ি, সরকারি-বেসরকারি বিভিন্ন স্থাপনা ও প্রতিষ্ঠান এবং বেশকিছু বসতবাড়িতে হামলা, ভাঙচুর ও লুটপাটের ঘটনা ঘটে। এ ছাড়াও সিরাজগঞ্জ শহরের মুজিব সড়কে অবস্থিত সিরাজগঞ্জ-২ আসনের অপসারিত এমপি ড. জান্নাত আরা হেনরী ও স্টেশন রোডে অবস্থিত একই আসনের সাবেক এমপি অধ্যাপক হাবিবে মিল্লাত মুন্নার বাসায় হামলা, ভাঙচুর, অগ্নিসংযোগ ও লুটপাটের ঘটনা ঘটে।
লুট হওয়া অস্ত্র উদ্ধার হয়নি
এদিকে, এনায়েতপুর ও হাটিকুমরুল হাইওয়ে থানা থেকে লুট হওয়া অস্ত্রের মধ্যে এখনো ১৪টি আগ্নেয়াস্ত্র উদ্ধার হয়নি। এ দুইটি মামলায় এ পর্যন্ত ২২ জনকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। হাঁটিকুমরুল হাইওয়ে থানার কার্যক্রম বর্তমানে ভাড়া করা ভবনে চলছে।
মামলা
থানা ও কোর্ট পুলিশ সূত্রে জানা গেছে, হত্যাকাণ্ডের ঘটনায় জেলায় মোট ৯টি মামলা হয়েছে। এর মধ্যে সিরাজগঞ্জ সদর থানায় ৪টি, এনায়েতপুর থানায় আন্দোলনে নিহতের ঘটনায় ৩টি এবং ১৫ পুলিশ হত্যা ও থানায় হামলা এবং অস্ত্র লুটের ঘটনায় ১টি এবং উল্লাপাড়া থানায় ১টি মামলা হয়েছে। এর বাইরে অতীতের ঘটনার জেরে এবং গত এক বছরে নানা সময়ের ঘটনা মিলে জেলায় মোট ২৯টি রাজনৈতিক মামলা হয়েছে। এ মামলাগুলোতে অধিকাংশ আওয়ামী লীগের নেতাকর্মীদের আসামি করা হয়েছে।
গ্রেপ্তার
এসব মামলায় এ পর্যন্ত সাবেক মন্ত্রী আব্দুল লতিফ বিশ্বাস, সাবেক এমপি ড. জান্নাত আরা হেনরী, সাবেক এমপি তানভীর ইমাম, সাবেক এমপি চয়ন ইসলাম, সাবেক এমপি ডা. আব্দুল আজিজ, জেলা পরিষদের অপসারিত চেয়ারম্যান শামীম তালুকদার লাবু ও উল্লাপাড়া উপজেলা পরিষদের সাবেক চেয়ারম্যান সেলিনা মির্জা মুক্তি ও সিরাজগঞ্জ বারের সাবেক পিপি অ্যাডভোকেট আব্দুর রহমানসহ ১৬৩ জন আওয়ামী লীগের নেতাকর্মী গ্রেপ্তার হয়েছেন।
চার্জশিট
এ পর্যন্ত কাজিপুর ও সলঙ্গা থানায় দায়ের হওয়া মারামারির দুইটি মামলার তদন্ত শেষে আদালতে চার্জশিট দিয়েছে পুলিশ। এদিকে, এনায়েতপুরে গুলিতে নিহত ৩ জনের পরিবারের আপত্তির কারণে তাদের ময়নাতদন্ত হয়নি।
জুলাই যোদ্ধা তালিকাভুক্ত
জেলায় জুলাই যোদ্ধা হিসেবে শহিদদের তালিকাভুক্ত হয়েছেন ১৩ জন। তাদের মধ্যে ৬ জনের ঢাকায় এবং সিরাজগঞ্জে ৭ জনের মৃত্যু হয়। আর জেলায় আহতদের মধ্যে জুলাই যোদ্ধা হিসেবে তালিকাভুক্ত হয়েছেন ৫২৪ জন।
জেলায় ১৩ জন জুলাই যোদ্ধা হিসেবে তালিকাভুক্তরা হলেন- সিরাজগঞ্জের আন্দোলনে নিহত যুবদল নেতা ও ডেন্টিস্ট সোহানুর রহমান রঞ্জু খান, ছাত্র সুমন সেখ, চা বিক্রেতা আব্দুল লতিফ, ভ্যানচালক শিহাব উদ্দিন, ছাত্র শিহাব আহম্মেদ, ছাত্র সিয়াম হোসেন ও তাঁত শ্রমিক ইয়াহিয়া আলী প্রামানিক। এ ছাড়াও সিরাজগঞ্জ জেলায় বসবাসকারীদের ঢাকায় আন্দোলনে শহিদরা হলেন- ব্যবসায়ী সুজন মাহমুদ, ছাত্র অন্তর ইসলাম, স্যানিটারি মিস্ত্রি জাহাঙ্গীর হোসেন, রিকশাচালক মো. লেবু, নৌ বাহিনীর সাবেক কর্মকর্তা মো. মনিরুজ্জামান ও পোশাককর্মী নজরুল ইসলাম।
এ বিষয়ে সিরাজগঞ্জ সিভিল সার্জন ও জুলাই অভ্যুত্থান ২০২৪ হতাহতদের তালিকা যাচাই-বাছাই জেলা কমিটির সদস্য সচিব ডা. মো. নুরুল আমিন বলেন, ‘এ পর্যন্ত জেলায় বসবাসকারী ১৩ জন জুলাই শহিদ ও ৫২৪ জন জুলাই যোদ্ধার নাম তালিকাভুক্ত করা হয়েছে। তাদের মধ্যে ১৩ জন শহিদ ও ৪৪৮ জন জুলাই যোদ্ধার নাম ইতোমধ্যে সরকারি গেজেটভুক্ত হয়েছে। বাকিরা অপেক্ষমাণ রয়েছেন।’
সিরাজগঞ্জ পুলিশ সুপার ফারুক হোসেন জানান, ‘জুলাই অভ্যুত্থান পরবর্তীতে দায়ের হওয়া মামলাগুলোর মধ্যে ইতোমধ্যে কাজিপুর ও সলঙ্গা থানায় দায়ের হওয়া দুইটি মারামারি মামলার চার্জশিট হয়েছে। বাকিগুলোর তদন্ত চলছে। সেগুলোর দ্রুত চার্জশিট দেওয়া হবে। এছাড়া চাকরিতে কর্মরত অবস্থায় মারা গেলে সরকারি বিধান মতে প্রাপ্ত অনুদান ১৪ পুলিশ সদস্যকে প্রদান করা হয়েছে। বাকি একজনের অনুদান ওয়ারিশ সংক্রান্ত জটিলতার কারণে এখনো দেওয়া হয়নি। খুব দ্রুত তাকে অনুদান দিয়ে দেওয়া হবে।’
সিরাজগঞ্জ জেলা প্রশাসক মুহাম্মদ নজরুল ইসলাম বলেন, ‘জুলাই অভ্যুত্থানে লুট হওয়া অস্ত্র বেশিভাগই উদ্ধার করা হয়েছে। বাকিগুলো উদ্ধারের কাযক্রম চলছে। জুলাই শহিদরা ইতোমধ্যে মুক্তিযোদ্ধা মন্ত্রণালয়ের মাধ্যমে ১০ লাখ টাকা করে সঞ্চয়পত্র পেয়েছেন। এ ছাড়াও জেলা পরিষদের মাধ্যমে প্রতিজন শহিদ পরিবারকে দুই লাখ ও আহতদের ৫ হাজার টাকা করে সহায়তা দেওয়া হয়েছে। শহিদ পরিবারগুলোকে সামনে আরও কিছু অনুদান দেওয়া হবে এবং বাকি আহতদেরকে সহায়তা করার জন্য চেষ্টা করা হচ্ছে।
সিরাজুল ইসলাম শিশির/মাহফুজ