কুমিল্লার দাউদকান্দি উপজেলার উত্তর ইউনিয়নের কদমতলী-হাসনাবাদ সেতুর নির্মাণকাজ দীর্ঘ পাঁচ বছরেও শেষ হয়নি। সময় বাড়ানোর পরেও সেতুর কাজ শেষ না হওয়ায় তিন উপজেলার ৩০ গ্রামের মানুষকে দুর্ভোগ পোহাতে হচ্ছে। স্কুল-কলেজের শিক্ষার্থী, শিশু, রোগী ও বৃদ্ধদের বেশি কষ্ট ভোগ করতে হচ্ছে। স্থানীয়রা দ্রুত সেতুর নির্মাণকাজ শেষ করতে ঠিকাদার কোম্পানিকে বিভিন্ন সময় অনুরোধ করলেও তাতে কোনো কাজ হয়নি।
গোমতী নদীর ওপর ৫৭০ মিটার দীর্ঘ কদমতলী-হাসনাবাদ সেতুর নির্মাণকাজের দায়িত্ব পায় ঠিকাদার কোম্পানি ইএএম হোল্ডিং লিমিটেড। ২০২০-২১ অর্থবছরের জুলাই মাস থেকে ৫৮ কোটি ৭৪ লাখ ৬৫ হাজার ৬৩১ টাকার এই সেতুর নির্মাণকাজ শুরু হয়। দরপত্রের চুক্তি অনুযায়ী ২০২২-২৩ অর্থবছরের মে মাসে কাজ শেষ হওয়ার কথা ছিল। পরবর্তী পর্যায়ে প্রতিষ্ঠানটিকে সেতুর কাজ সম্পন্ন করার জন্য ২০২৫ সালের জুন মাসের মধ্যে সময় বেঁধে দেওয়া হলেও তারা সেই সময়েও কাজ শেষ করতে পারেনি। স্থানীয়রা অভিযোগ করছেন, ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানের অবহেলা ও প্রশাসনের উদাসীনতার কারণে নির্মাণকাজ শেষ হতে বিলম্ব হচ্ছে।
দাউদকান্দি উপজেলা থেকে উত্তর ইউনিয়ন, তিতাস ও মেঘনা উপজেলার কিছু অংশে যেতে খেয়া নৌকার ওপর নির্ভর করতে হচ্ছে। এতে সময় অপচয় এবং মানুষ দুর্ভোগের শিকার হচ্ছেন। সেতুর কাজের ধীরগতির কারণে দুর্ভোগ পোহাচ্ছেন উপজেলার বাহেরচর, বাজরা, বটতলী ও গঙ্গাপ্রসাদ, হাসনাবাদ ভিটিকান্দি, কান্দারগাঁও, তিতাস উপজেলার কাকিয়ালী, মোহনপুর, উজিরাকান্দি, সাতানী, দুধঘাটা, দড়িগাঁও, চরকাঁঠালিয়া, চারআনি, নন্দীরচর, মঙ্গলকান্দি, বারকাউনিয়া, কালীরবাজার, ভুঁইয়ারবাজার, নন্দনপুর, বালুয়াকান্দি, জগতপুর ও চরকুমারিয়া এবং মেঘনা উপজেলার হিজলতলী আলীপুর, বিনোদপুর, চরবিনোদপুর গ্রামের মানুষ। নৌকা নিয়ে তারা গোমতী নদী পারাপার হন। সেতুর কাজে ধীরগতিতে ক্ষুব্ধ চর অঞ্চলের বাসিন্দারা।
তবে চলতি বছরেই কাজ শেষ করার কথা জানিয়েছেন স্থানীয় সরকার বিভাগের প্রকৌশলী। ঠিকাদার কোম্পানির সহকারী প্রকৌশলী বলেছেন, সেতুর কাজ শেষ করতে আরও ৬ মাস সময় লাগবে। তবে স্থানীয়রা বলছেন, সেতুর কাজ শেষ করতে আরও ২ বছর সময় লাগবে। ১৫২টি পাইলের মধ্যে ১৫১টির কাজ সম্পন্ন হলেও ১টি পাইলের নির্মাণকাজ এখনো বাকি রয়েছে।
বাহেরচর গ্রামের ইমরান হোসেন বলেন, ‘সেতুর কাজ বছরের পর বছর ঝুলে থাকায় আমাদের ভোগান্তি বাড়ছে। ট্রলার বা ইঞ্জিনচালিত নৌকার ওপর নির্ভরশীল দুই ইউনিয়নের অর্ধলক্ষাধিক মানুষ। বিশেষ করে শিশু, শিক্ষার্থী, রোগী ও কৃষকদের জন্য যোগাযোগ এখন সবচেয়ে বড় সমস্যা। তাদের অভিযোগ, ঠিকাদার পরিবর্তন, দুর্নীতি আর দপ্তরের উদাসীনতায় সেতুর নির্মাণকাজ দীর্ঘায়িত হয়েছে।
উত্তর ইউনিয়নের হাসনাবাদ গ্রামের কৃষক আব্দুল মালেক মিয়া বলেন, ‘চরাঞ্চলের মানুষের নদী পারাপার ছাড়া কোনো বিকল্প নেই। বর্ষাকালে ঝড় বৃষ্টিতে ট্রলার চলাচল বন্ধ হয়ে যাওয়া নিত্যনৈমিত্তিক ঘটনা। এ সময় জীবনের ঝুঁকি নিয়ে চলাচল করতে হয়। জরুরি চিকিৎসায় সময়মতো হাসপাতালে পৌঁছানো প্রায় অসম্ভব হয়ে পড়ে। দাউদকান্দি পৌর সদরে যাওয়া এবং শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে পৌঁছানোও অত্যন্ত কষ্টকর। সেতু নির্মাণ দেখে আমরা চরের মানুষ স্বপ্ন দেখতে শুরু করেছিলাম। কিন্তু সেই স্বপ্ন আজ দুঃস্বপ্ন হয়ে উঠেছে।
ফজলুল হক উচ্চবিদ্যালয়ের সহকারী শিক্ষক অসিম সরকার বলেন, ‘এই ইউনিয়নের লোকজন, স্কুল, কলেজের ছাত্র-ছাত্রী, ব্যবয়াসী ও কৃষকদের যাতায়াতের জন্য সেতুটির নির্মাণকাজ দ্রুত শেষ করা খুবই দরকার। সেতুর অভাবে দাউদকান্দি উত্তর ইউনিয়নসহ মেঘনা ও তিতাস উপজেলার বিভিন্ন এলাকার মানুষকে দুর্ভোগ পোহাতে হচ্ছে।
ঠিকাদার কোম্পানি ইএএম হোল্ডিং লিমিটেডের সেতুর সাইড সহকারী প্রকৌশলী মো. নাইমুর রহমান বলেন, ‘সেতুর কাজ চলমান রয়েছে। বর্ষার কারণে কাজের গতি একটু ধীর। আমরা আশা করছি, ছয় মাসের মধ্যে সেতুর কাজ সম্পন্ন করতে পারব। সেতু নির্মাণের মেয়াদ শেষ হওয়ার বিষয়ে জানতে চাইলে তিনি বলেন, ‘সময় বাড়ানোর জন্য আমরা সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের কাছে আবেদন করেছি।
দাউদকান্দি উপজেলা (এলজিইডি) প্রকৌশলী মোহাম্মদ জাহিদ হাসান বলেন, গোমতী নদীতে ৫৭০ মিটার দীর্ঘ একটি সেতু নির্মাণে কাজের দায়িত্ব পায় কুমিল্লার মঈনউদ্দিন বাশী লিমিটেড ও মেসার্স জাকির এন্টারপ্রাইজ (জেভির)। পরবর্তী পর্যায়ে প্রতিষ্ঠানটিকে সেতুর কাজ সম্পন্ন করার জন্য ২০২৫ সালের জুন মাসের মধ্যে সময় বেঁধে দেওয়া হলেও তারা সেই সময়েও কাজ সম্পন্ন করতে পারেনি। শুনেছি কাজের সময় বাড়ানোর জন্য ঠিকাদার কোম্পানি আবেদন করেছে। সেতুর কাজ দ্রুত শেষ করার জন্য সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের সঙ্গে যোগাযোগ করা হবে।