জয়পুরহাটের আক্কেলপুর পৌর এলাকার চক্রপাড়ার বাসিন্দা পারভীন আক্তার। স্বামী নেই। তিন সন্তান নিয়ে তার অবর্ণনীয় কষ্টের জীবন। খেয়ে না খেয়ে কোনোমতে দিন পার করেন। অথচ এক সময় তার সব ছিল। স্বামী সন্তান নিয়ে ছিল সুখের সংসার। কিন্তু তা বেশিদিন স্থায়ী হয়নি। শিলপাটার কাজ করে অসুস্থ হয়ে তার স্বামী মারা যান। ভাগ্যলক্ষ্মী এরপর আর বেশিদিন সহায় হয়নি।
তিনি বলেন, ‘শিলপাটার কাজ করে প্রথম স্বামী দুই সন্তান রেখে মারা গেল। পরে পরিবারের লোকজন দেবরের সঙ্গে বিয়ে দিল। তিনিও একই কাজ করে অসুস্থ হলেন। বিয়ের ৯ বছরের মাথায় তিনিও মারা গেলেন। এই পক্ষেরও একটি সন্তান রয়েছে। আমি এখন খুবই অসহায়।
চক্রপাড়ার বীথি আক্তারের স্বামী এখনো বেঁচে আছেন। তবে সুস্থ নন। শিলপাটার কাজ করে এখন তিনি শয্যাশায়ী। তার শ্বশুর ও দুই দেবর একই কাজ করে মারা গেছেন। পুরো পরিবারের দায়িত্ব এখন তার কাঁধে।
বীথি বলেন, ‘অনেক কষ্টে সংসার চলে। দেবরের ছোট তিনটি বাচ্চা আমাকেই লালন-পালন করতে হয়।
পারভীন ও বীথি আক্তারের মতো এমন অনেক নারী চক্রপাড়ার আছেন যারা অকালে স্বামী-স্বজনদের হারিয়েছেন। এই সংখ্যাও কম নয়। প্রায় অর্ধশত। তারা সবাই শিলপাটা তৈরির কাজ করতেন। দীর্ঘসময় ধরে এ কাজ করে তারা ফুসফুসের বিভিন্ন জটিলতায় ভুগে একসময় মারা যান। পুরো আক্কেলপুর উপজেলায় এই সংখ্যা অন্তত শতাধিক। বর্তমানে স্থানীয় প্রশাসনের তৎপরতায় এ পেশা বন্ধ হলেও বিগত সময়ে কাজ করা অনেক শ্রমিক এখন মৃত্যুর প্রহর গুনছেন। ফুসফুসে জটিলতা দেখা দেওয়ার পাশাপাশি তাদের শরীরে নানা রোগ বাসা বেঁধেছে। অনেকেই কাজ ও চিকিৎসা করাতে না পেরে পরিবার নিয়ে দুর্দশায় দিন কাটাচ্ছেন।
খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, ১৯৯৫ সালে জয়পুরহাটের আক্কেলপুর পৌর এলাকার চক্রপাড়াসহ উপজেলার কয়েকটি গ্রামে স্থানীয় কিছু মহাজন ভারত থেকে পাথরের কাঁচামাল আমদানি করে শিলপাটা তৈরি শুরু করেন। যা সারা দেশে সরবরাহ করা হতো। বেশি মজুরির আশায় এ কাজে দরিদ্র শত শত মানুষ যুক্ত হন। তাদের ধরে রাখতে মহাজনরা কৌশল হিসেবে অগ্রিম মোটা অঙ্কের টাকাও দিতেন।
চক্রপাড়া এলাকার সালাউদ্দিন আহমেদ বলেন, ‘তিন বছরের বেশি সময় হাতুড়ি-ছেনি দিয়ে শিলপাটার কাজ করেছিলাম। নাক-মুখ দিয়ে পাথরের কণা ঢুকে আমার ফুসফুস নষ্ট হয়ে গেছে। কিডনির সমস্যাতেও ভুগছি। এখন পেট ফুলে উঠেছে। ২০০৯ সাল থেকে অসুস্থ হয়ে বিছানায় শুয়ে আছি। উঠতে পারি না। আগে মানুষের কাছে হাত পেতে কিছু চিকিৎসা করেছি। চার বছর ধরে টাকার অভাবে চিকিৎসাও করাতে পারছি না।
একই এলাকার মোস্তাফিজুর রহমান বলেন, শিলপাটার কাজ করে গত ১২ বছর ধরে আমি অসুস্থ। চলাফেরা করতে পারি না। লাঠিতে ভর দিয়ে বাড়ির আঙিনা পর্যন্ত বের হই। আকরাম হোসেন নামে একজন বলেন, একটু হাঁটলেই শ্বাসকষ্ট হয়, অস্থির লাগে। সরকার যদি আমাদের সাহায্য করত তাহলে উপকার হতো।
আক্কেলপুর উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সের আবাসিক মেডিকেল অফিসার (আরএমও) ডা. আসিফ আদনান বলেন, শিলপাটার কাজ করে ফুসফুসের সমস্যা নিয়ে অনেকেই আমার এখানে চিকিৎসা নিচ্ছেন। এর আগে অনেকে মারাও গেছেন। তিনি বলেন, ‘পাথরের কণা দীর্ঘসময় আটকে থাকলে ফুসফুসের ক্ষতি হয়। চিকিৎসাবিজ্ঞানের ভাষায় আমরা এটাকে সিলিকোসিস বলি। এটার কারণে ফুসফুস নষ্ট হয়ে মৃত্যু পর্যন্ত হতে পারে। যারা বেঁচে থাকেন তারা শ্বাসকষ্টে ভোগেন। একটু চলাফেরা করলেই হাপিয়ে ওঠেন।
জয়পুরহাট জেনারেল হাসপাতালের তত্ত্বাবধায়ক সরদার রাশেদ মোবারক জুয়েল বলেন, ‘নাক-মুখ দিয়ে পাথরের কণা ফুসফুসে গেলে মরণব্যাধি ক্যানসার পর্যন্ত হতে পারে। এ ধরনের কাজ থেকে বিরত থাকা উচিত।
আক্কেলপুর পৌর সভার সাবেক প্যানেল মেয়র আবুল কালাম আজাদ বলেন, পুরো উপজেলায় শিলপাটার কাজ করে বিভিন্ন রোগে অসুস্থ হয়ে শতাধিক মানুষ মারা গেছেন। প্রশাসনসহ আমরা বিভিন্নভাবে মানুষদের সচেতন করায় এই পেশা এখন বন্ধ হয়ে গেছে। তবে যারা বিগত সময়ে কাজ করেছিলেন তারা এখন অসুস্থ।
আক্কেলপুর উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা মনজুরুল আলম বলেন, পুরো উপজেলার ৩৫টির মতো পরিবার শিলপাটা তৈরির কাজ করত। এ কাজে স্বাস্থ্যঝুঁকি থাকায় ও পরিবেশ দূষণ হওয়ায় আমরা অনেক বুঝিয়ে কাজটি বন্ধ করেছি। তাদের কৃষি প্রণোদনাসহ বিভিন্ন সহযোগিতা করা হয়। ভবিষ্যতে যদি কেউ এমন কাজ করে তাহলে তাদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া হবে।