ট্রেনে করে নিয়মিত বিশ্ববিদ্যালয়ে যাওয়ার সুবিধা দেশের মধ্যে কেবল চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরা পেয়ে থাকেন। চট্টগ্রাম শহর ও এর আশপাশে বসবাস করা শিক্ষার্থীরা এই ট্রেনে করে যাতায়াত করে থাকেন, যা শাটল ট্রেন নামে পরিচিত। যানজটে আটকে না পড়ার নিশ্চয়তা আর রেললাইনের দু-পাশের সবুজের সমারোহ এই ভ্রমণকে করে তোলে আনন্দময়। কিন্তু এর বিপরীত চিত্রও রয়েছে।
২২ কিলোমিটার পথের এই ভ্রমণ কখনো কখনো শিক্ষার্থীদের কাছে বিষাদের কারণ হয়ে ওঠে। বিশেষ করে বহিরাগতদের ভ্রমণ, কিশোরদের ছিনতাই ও পাথর নিক্ষেপ শিক্ষার্থীদের নিরাপত্তার জন্য বড় হুমকিতে পরিণত হয়েছে। এ ছাড়া বহিরাগতদের অশালীন অঙ্গভঙ্গির কারণে নারী শিক্ষার্থীরা প্রায় বিব্রতকর পরিস্থিতিতে পরেন। বিষয়গুলো নিয়ে একাধিকবার বিশ্ববিদ্যালয়ে প্রশাসনকে জানানো হলেও পরিস্থিতির দৃশ্যমান কোনো উন্নতি হয়নি। অবস্থা এমন- শিক্ষার্থীরা এখন অভিযোগ দিতে আগ্রহ হারিয়ে ফেলছেন।
খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, গত ছয় মাসে ১৮টি পাথর নিক্ষেপের ঘটনা ঘটেছে, যেখানে ছয় শিক্ষার্থী আহত হন। একটি ঘটনায় এক নারী শিক্ষার্থীকে হামলার হাত থেকে বাঁচতে ট্রেন থেকে ঝাঁপিয়ে পড়তে হয়েছে। একই ঘটনায় একজন পুরুষ শিক্ষার্থীকে ব্লেড দিয়ে মারাত্মকভাবে জখম করা হয়।
বিশ্ববিদ্যালয়ে অর্থনীতি বিভাগের দ্বিতীয় বর্ষের শিক্ষার্থী নওশাদ জাহান জানান, তিনি এই শাটল ট্রেনে ছিনতাইয়ের শিকার হয়েছেন। সম্প্রতি ক্লাস শেষে শহরে ফেরার পথে চলন্ত ট্রেনে তার ব্যাগ ছিনতাই হয়। ব্যাগে থাকা মোবাইল ফোনের পাশাপাশি গুরুত্বপূর্ণ নোটও তারা ছিনিয়ে নিয়ে যায়।
ঘটনার পর তিনি থানায় অভিযোগ করেননি। কারণ হিসেবে বলেন, ‘প্রক্রিয়াটি দীর্ঘসূত্রতার কারণে ঝামেলাপূর্ণ। বিশ্ববিদ্যালয়ের শাটল ট্রেনে এ ধরনের অপরাধ এখন নিত্যনৈমিত্তিক হয়ে দাঁড়িয়েছে। আমার ব্যাগটি পথশিশুদের মাধ্যমে ছিনতাই করা হয়। বয়সে ছোট হলেও তারা এ ধরনের কাজে অভ্যস্ত। তাদের সব সময় ট্রেনের বগিতে অবস্থান করতে দেখা যায়। প্রশাসন মাঝে মাঝে লোক দেখানোর জন্য তাদের তাড়ালেও কিছুক্ষণ পর তারা আবার ট্রেনে উঠে বসে।’
চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদের ব্যবহার করা যত গ্রুপ রয়েছে এর মধ্যে সবচেয়ে নির্ভরযোগ্য হিসেবে ধরা হয় ‘বিশ্ববিদ্যালয় পরিবার’ গ্রুপকে। সেখানে সম্প্রতি খোয়াই ত্রিপুরা নামে এক শিক্ষার্থী তার সঙ্গে ঘটে যাওয়া একটি ঘটনার বর্ণনা দেন। তিনি লেখেন, ‘প্রথম দুই বগি ছিল বহিরাগত যাত্রীতে ভরা।
ফতেয়াবাদ থেকে ক্যান্টনমেন্ট পর্যন্ত রাস্তায় প্রথমে দেখি দুটি টিনএজ ছেলে অশ্লীল হাতের ইশারা করল। আরেকটু পর তিনজন ছোট বাচ্চাও শাটল ট্রেনের দিকে অশ্লীল হাতের ইশারা করছে। ক্যাম্পাসে সাত বছরে প্রথমবারের মতো এমন অভিজ্ঞতার মুখোমুখি হলাম। এই অনুভূতির নাম নিরাপত্তাহীনতা। আমি চাই সবাই সাবধানে থাকুক এবং নিরাপদে যাত্রা করুক।’
চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের সহকারী প্রক্টর সাঈদ বিন কামাল চৌধুরী এ বিষয়ে বলেন, ‘শাটল ট্রেন চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রায় ২৮ হাজার শিক্ষার্থীর যাতায়াতের প্রধান ও গুরুত্বপূর্ণ মাধ্যম। অন্যান্য বাহনের তুলনায় এটিকে আমরা সহজলভ্য ও গুরুত্বপূর্ণ হিসেবে বিবেচনা করি। তবে গত কয়েক মাস ধরে শিক্ষার্থীরা অনলাইন এবং সরাসরি শিডিউল বিপর্যয়, ছিনতাইকারীদের হামলা, আসন দখল, লাইট-ফ্যান চুরি এবং পাথর নিক্ষেপের মতো বিভিন্ন অভিযোগ জানাচ্ছে।’
তিনি বলেন, ‘এসব সমস্যা সমাধানে বর্তমান প্রশাসন সচেতনভাবে কাজ করছে। আমরা রেলওয়ে এবং রেল মন্ত্রণালয়ে একটি স্মারকলিপি ও উপাচার্য স্বাক্ষরিত চিঠি দিয়েছি। চিঠিতে উল্লেখ করা হয়েছে, বর্তমানে মাত্র দুটি ট্রেন থাকায় শিডিউল বিপর্যয় হচ্ছে। আমরা বিশ্বাস করি, যদি আরেকটি ট্রেন যুক্ত করা যায়, তাহলে এই সমস্যাটি এড়ানো সম্ভব হবে। এ বিষয়ে একটি কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছে, যা বাস্তবায়নের অপেক্ষায় রয়েছে।’
শিক্ষার্থীদের ওপর ছিনতাইকারী ও দুষ্কৃতকারীদের হামলার অভিযোগের ব্যাপারে তিনি বলেন, ‘আমরা রেলের নিজস্ব নিরাপত্তা বাহিনীর সঙ্গে কথা বলেছি। তারা শিক্ষার্থীদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে সর্বোচ্চ কার্যক্রম চালিয়ে যাওয়ার আশ্বাস দিয়েছেন। এ ছাড়াও, বিশ্ববিদ্যালয়ের নিরাপত্তা বাহিনী নিয়মিত শাটলে অভিযান পরিচালনা করে বহিরাগতদের আটক করে পুলিশ দিচ্ছে। তবে আটকদের অধিকাংশই শিশু-কিশোর হওয়ায় তাদের বিরুদ্ধে আইনিব্যবস্থা নেওয়া সম্ভব হয় না, কেবল সচেতন করা যায়।’