প্রতিদিন ১ হাজার ৬০০ টন ইউরিয়া উৎপাদনের সক্ষমতা নিয়ে ৪২ বছর আগে যাত্রা শুরু করে আশুগঞ্জ সার কারখানা। কিন্তু যান্ত্রিক ত্রুটি, গ্যাসসংকটসহ নানা কারণে দিন যাওয়ার সঙ্গে সঙ্গে কারখানাটির উৎপাদন কমতে থাকে। বর্তমানে গ্যাস সরবরাহ না থাকায় উৎপাদন পুরোপুরি বন্ধ। সংশ্লিষ্টদের অভিযোগ, একটি চক্রের নির্দেশে বছরের বেশির ভাগ সময় কারখানায় গ্যাস সরবরাহ বন্ধ রাখা হয়। বাধ্য হয়ে সরকার বিদেশ থেকে সার আমদানি করে। চক্রটির সদস্যরা সেখান থেকে কমিশন বাণিজ্য করে।
খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, ব্রাহ্মণবাড়িয়ার আশুগঞ্জ উপজেলার চরচাতলা এলাকায় মেঘনা নদীর পূর্বপাড়ে ৫০০ একরেরও বেশি জায়গাজুড়ে বিস্তৃত আশুগঞ্জ সার কারখানা। ১৯৮৩ সালে চালু হওয়া কারখানাটি প্রথমদিকে দিনে ১ হাজার ৬০০ টন ইউরিয়া উৎপাদন করতে পারত। তবে ধীরে ধীরে সক্ষমতা হ্রাস পেতে থাকে। বর্তমানে কারখানাটি দিনে প্রায় সাড়ে ১ হাজার ১০০ টন ইউরিয়া সার উৎপাদন করতে পারে, যার বাজার মূল্য গড়ে সাড়ে ৪ কোটি টাকা।
ইউরিয়া সার উৎপাদনে প্রধান কাঁচামাল হিসেবে প্রাকৃতিক গ্যাস, পানি ও বাতাস ব্যবহার করা হয়। পানির জোগান দেও০য়া হয় কারখানা সংলগ্ন মেঘনা নদী থেকে। আর প্রাকৃতিক গ্যাস সরবরাহ করে বাখবাদ গ্যাস ডিস্ট্রিবিউশন কোম্পানি লিমিটেড। উৎপাদন স্বাভাবিক রাখতে প্রতিদিন ৬০০ পিএসআই চাপে প্রায় ৪৮ মিলিয়ন ঘনফুট গ্যাসের প্রয়োজন হয় আশুগঞ্জ সার কারখানায়।
জানা গেছে, গুণগত মানসম্পন্ন হওয়ায় আশুগঞ্জ সার কারখানায় উৎপাদিত প্রিল্ড ইউরিয়া কৃষকদের কাছে বেশ জনপ্রিয়। কারখানার আওতাভুক্ত প্রায় সাড়ে ৭০০ ডিলারের মাধ্যমে ব্রাহ্মণবাড়িয়া ছাড়াও সার পাঠানো হয় কুমিল্লা, চাঁদপুর, কিশোরগঞ্জ, নেত্রকোনা, সুনামগঞ্জ ও হবিগঞ্জ জেলায়।
তবে কয়েক বছর ধরে ইউরিয়া উৎপাদনে বাংলাদেশ কেমিক্যাল ইন্ডাস্ট্রিজ করপোরেশনের (বিসিআইসি) দেওয়া লক্ষ্যমাত্রা পূরণে কারখানাটি ব্যর্থ হচ্ছে। মূলত ঘন ঘন যান্ত্রিক ত্রুটির পাশাপাশি বছরের বেশির ভাগ সময় গ্যাস সরবরাহ না থাকায় বন্ধ থাকে ইউরিয়া উৎপাদন। ফলে চাহিদার জোগান দেওয়া হয় আমদানি করা সার দিয়ে। অন্যদিকে উৎপাদন স্বাভাবিক রাখতে না পেরে কারখানাটি লোকসানি প্রতিষ্ঠানে পরিণত হয়েছে।
গ্যাস সরবরাহ বন্ধের কারণে সর্বশেষ গত ১ মার্চ কারখানা কর্তৃপক্ষ ইউরিয়া উৎপাদন বন্ধ ঘোষণা করে। তার আগে গত বছরের ২১ ফেব্রুয়ারি থেকে ১৪ নভেম্বর পর্যন্ত গ্যাস সরবরাহ ছিল। কারখানার শ্রমিকদের দীর্ঘ আন্দোলনের পর গত বছরের ১৫ নভেম্বর থেকে গ্যাস সরবরাহ শুরু করে বাখরাবাদ গ্যাস ডিস্ট্রিবিউশন কোম্পানি লিমিটেড কর্তৃপক্ষ। ২৩ জানুয়ারি ইউরিয়া উৎপাদনে শুরু হয়। তখন প্রতিদিন ১ হাজার ১০০ থেকে সাড়ে ১ হাজার ১৫০ টন সার উৎপাদন হতো।
সার কারখানা কর্তৃপক্ষের দেওয়া তথ্যমতে, ২০২০-২১ অর্থবছরে ২ লাখ ৪০ হাজার টন লক্ষ্যমাত্রার বিপরীতে ইউরিয়া উৎপাদন হয় ১ লাখ ৪২ হাজার ৫৫৭ টন, ২০২১-২২ অর্থবছরে ১ লাখ ৮০ হাজার টনের বিপরীতে ৯৬ হাজার ৪৬ টন, ২০২২-২৩ অর্থবছরে ৩ লাখ টনের বিপরীতে উৎপাদন হয় ১ লাখ ৫৭ হাজার ৪২০ টন এবং ২০২৩-২৪ অর্থবছরে ১ লাখ টন লক্ষ্যমাত্রার বিপরীতে উৎপাদন হয় ৪৮ হাজার ৪৫৩ টন ইউরিয়া সার।
আশুগঞ্জ সার কারখানা শ্রমিক-কর্মচারী ইউনিয়নের সাধারণ সম্পাদক আবু কাউসার বলেন, ‘নতুন একটি সার কারখানা করতে কম করে ২০ হাজার কোটি টাকা লাগবে। অথচ আশুগঞ্জ সার কারখানা চালু রাখতে পারলে সরকারের লাভ হতো। কারখানাটির এখনো প্রতিদিন গড়ে সাড়ে ৪ কোটি টাকার ইউরিয়া উৎপাদনের সক্ষমতা রয়েছে। নতুন কিছু যন্ত্রপাতি সংযোজন আর নিরবচ্ছিন্ন গ্যাস পেলে দ্রুত সময়ের মধ্যে এটি লাভজনক প্রতিষ্ঠানে রূপ নেবে।’
তিনি আরও বলেন, ‘বিগত আওয়ামী লীগ সরকারের সময় বিসিআইসির একটি চক্র কমিশন বাণিজ্যের জন্য সার আমদানি করত। এখনো একইভাবে দেশীয় কারখানাগুলো বন্ধ রেখে বিদেশ থেকে আমদানি করে সারের চাহিদা মেটানো হচ্ছে। অথচ দেশীয় কারখানাগুলো সচল রাখতে পারলে বৈদেশিক মুদ্রা সাশ্রয় হবে।’
আশুগঞ্জ সার কারখানার উপমহাব্যবস্থাপক (প্রশাসন) তাজুল ইসলাম ভূঁইয়া বলেন, ‘কারখানার উৎপাদন পুনরায় চালুর বিষয়ে ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের সঙ্গে আলোচনা চলছে। গ্যাস সংযোগ পাওয়ার পরবর্তী ১৫ দিনের মধ্যেই উৎপাদন শুরু করা যাবে। আশা করছি, চলতি সেপ্টেম্বর মাসেই গ্যাস সরবরাহ শুরু হবে।’ তিনি বলেন, ‘বিগত সময়ে একটি চক্র গ্যাসসংকটের সুযোগকে কাজে লাগিয়ে সরকারকে সার আমদানি করতে প্রলুব্ধ করত। সেই চক্র এখন আর নেই। আশা করছি শিগগিরই সংকট কেটে যাবে।’