সিলেটের দলদলি চা বাগানের চা শ্রমিক কন্যা সুস্মিতা দাস। ইউসেপ সোলায়মান চৌধুরী বালুচর টেকনিক্যাল স্কুল থেকে এবারের এসএসসি পরীক্ষায় জিপিএ ৫ পেয়ে পাস করেছে। অনলাইনে আবেদন করে সিলেট সরকারি মহিলা কলেজে ভর্তির সুযোগও পেয়েছে সে। কিন্তু টাকার অভাবে সে ভর্তি হতে পারছে না কলেজে।
সুস্মিতা বলে, আগামী ১৪ সেপ্টেম্বর ভর্তির তারিখ শেষ। কিন্তু এখনো আমার পরিবার আমাকে কলেজে ভর্তির টাকা যোগাড় করে দিতে পারেনি। আমার মা পাতা তুলে যে টাকা মজুরি পান তাতে আমাদের সংসারই চলে না। তারপরও আমাকে কষ্ট করে এসএসসি পাশ করিয়েছেন। কিন্তু এখন এককালীন এই বড় অঙ্কের টাকা দিয়ে আমাকে কলেজে ভর্তি করানোর মত সামর্থ্য আমার পরিবারের নেই। কিন্তু আমার ইচ্ছে ছিল আমি লেখাপড়া করে নার্স হব। কিন্তু এখন মনে হচ্ছে আমার স্বপ্ন আর পূরণ হবে না।
একাদশ শ্রেণিতে ভর্তির সময় আছে আর মাত্র তিন দিন। কিন্তু সুস্মিতাসহ দলদলি চা বাগানের ১১ জন চা-শ্রমিক সন্তান ভাল ফলাফল করে এসএসসি পাস করলেও আর্থিক অসচ্ছলতার কারণে এখনো তাদের কলেজে ভর্তি অনিশ্চিত।
তারা জানায়, তাদের বাবা-মা চা বাগানে চাকরি করে যে মজুরি পান তাতে তাদের সংসারই চলে না। এসএসসি পর্যন্ত লেখাপড়া করাতে বাবা-মা অনেক ধার দেনা করেছেন। তাদের সবারই স্কুলের বেতন এখনও বকেয়া রয়েছে। তাই তাদের বাবা-মা আর চান না তাদের পড়ালেখা করাতে।
এদিকে এই শিক্ষার্থীরা চান তাদের লেখাপড়া চালিয়ে যেতে। কারণ তারা বাবা মায়ের মতো চা বাগানে কাজ না করে লেখাপড়া করে অন্য পেশায় যুক্ত হতে চান।
সিলেট সরকারি মহিলা কলেজ, মদনমোহন কলেজ, দক্ষিণ সুরমা কলেজ ও সৈয়দ হাতিম আলী কলেজে ভর্তির সুযোগ পেয়েছে দলদলী চা বাগানের চা শ্রমিকদের ১১ সন্তান।
টাকার অভাবে কলেজে ভর্তি না হতে পারা শিক্ষার্থীরা হলো- সুস্মিতা দাস, সীমানা নায়েক, শ্রাবন্তী দাস, ঝর্ণা নায়েক, সিরিমা মুন্ডা, অন্তরা দাস, অজিত রাম গঞ্জু, শিল্পীমনি গঞ্জু, সীমানা নায়েক, শাওন কুর্মী, তুলি দাস, রিপন দাস।
চা শ্রমিক কন্যা অন্তরা দাস খবরের কাগজকে বলে, আমার মা ও ভাই চা শ্রমিক। দলদলি চা বাগানে কাজ করেন তারা। তারা যে টাকা মজুরি পান তাতে আমাদের তিন বেলা খাবারই যোগার হয় না। তারপরও আমার ইচ্ছার কারণে অনেক ধারদেনা করে তারা আমাতে এসএসসি পর্যন্ত পড়িয়েছেন। আমি এসএসসি পাস করলেও স্কুলে আমার দুই বছরের বেতনের টাকা বকেয়া রয়েছে। বাবা-মা বলছেন আগের স্কুলের বেতনই দিতে পারছে না তারা। এখন কলেজে ভর্তির টাকা কিভাবে দেবে। কিন্তু আমি পড়তে চাই।
সিরিমা মুন্ডা খবরের কাগজকে বলে, আমার বাবা শুধু কাজ করেন। আমরা তিন ভাইবোন লেখাপড়া করছি। আমি একাদশ শ্রেণিতে দক্ষিণ সুরমা কলেজে ভর্তির সুযোগ পেয়েছি। কিন্তু এখনো ফরম ফিলাপ করতে পারিনি আর্থিক অসচ্ছলতার কারণে। আর মাত্র দুইদিন বাকি ভর্তির। কিন্তু এখনো বাবা কলেজে ভর্তির টাকা যোগাড় করতে পারেননি। তাই তিনি বলেছেন এ বছর পড়াবে না। আগামী বছর ভর্তি করে দেবেন। কিন্তু আমি চাই এ বছরই ভর্তি হতে চাই। আমি এবার ভর্তি হতে না পারলে আমার সঙ্গের সবাই এগিয়ে যাবে আমি পিছিয়ে পড়ব। আমি এটা চাই না।
অজিত রাম গঞ্জু, শিল্পীমনি গঞ্জু দুই ভাইবোন । দুজনই এবার এসএসসি পাস করেছে। শিল্পীমনি পেয়েছে ৪.২৫ এবং অজিত পেয়েছে ৪.৪৩। পরিবারের আর্থিক অসচ্ছলতার কারণে অজিত ইতোমধ্যে বাগানের বাইরে একটি দোকানে কাজ নিয়েছে। তবে কাজ করলেও সে লেখাপড়া করতে চায়। তাই দুই ভাইবোন মিলে অনলাইনে আবেদন করে কলেজে ভর্তির জন্য। তারা দুজনই সিলেট মদনমোহন কলেজে ভর্তির সুযোগ পেয়েছে। কিন্তু টাকা না থাকায় এখন পর্যন্ত দুজনের কেউই কলেজে ভর্তি হতে পারেনি।
শিল্পীমনি গঞ্জু খবরের কাগজকে বলে, বাবা-মা কলেজে ভর্তির টাকা যোগার করতে পারেনি। তাই বলেছে এবার যেন আমরা কলেজে ভর্তি না হই। তার উপর আমাদের দুই ভাইবোনের স্কুলের বেতন এখনো বকেয়া আছে। সেগুলো পরিশোধ না করলে আমাদের সার্টিফিকেটও দিবে না স্কুল। তাই জানি না কি হবে। কলেজে ভর্তি হতে পারবো কি না তাও জানি না।
অমিয়/