উত্তরাঞ্চলের ১৬ জেলায় শুধু মহাসড়কেই গত জুন পর্যন্ত এক বছরে ৫৮৫টি দুর্ঘটনায় মারা গেছেন শিশুসহ প্রায় ৫০০ জন। আহত হয়েছেন ৫১৭ জন। এর মধ্যে হাইওয়ে পুলিশের বগুড়া রিজিয়নের আট জেলায় সড়ক দুর্ঘটনায় মৃত্যু হয়েছে ২৭৯ জনের এবং আহত হয়েছেন ২০৭ জন এবং রংপুর রিজিয়নের আট জেলায় মারা গেছেন ১৯৫ জন ও আহত হয়েছেন ৩১০ জন। উভয় রিজিয়নে দুর্ঘটনায় গুরুতর আহত হয়েছেন ২৩৫ জন, যাদের মধ্যে অন্তত ২৫ জন চিকিৎসাধীন অবস্থায় মারা গেছেন।
মোটরযান আইন ভঙ্গ ও দুর্ঘটনায় প্রাণহানির ঘটনায় গত জুন পর্যন্ত এক বছরে বগুড়া ও রংপুর রিজিয়ন হাইওয়ে পুলিশ মামলা করেছে ৩৯ হাজার ২৬৭টি। বিভিন্ন মামলায় জরিমানা করা হয়েছে ১৩ কোটি টাকারও বেশি, যেটির মধ্যে আদায় হয়েছে ১১ কোটি।
হাইওয়ে পুলিশের তথ্যে বলা হয়েছে, দুর্ঘটনার মূল কারণ হলো ওভারস্পিড, ওভারলোডিং, চালক ও পথচারীর অসচেতনতা, অদক্ষ চালক এবং যান্ত্রিক ত্রুটি। বিশেষ করে বেপরোয়া গাড়ি চালানো এবং রাস্তায় সংকেত সম্পর্কে সচেতন না থাকা দুর্ঘটনার অন্যতম কারণ।
উত্তরাঞ্চলে দুর্ঘটনা বেশি ঘটে বগুড়া রিজিয়নের সিরাজগঞ্জের হাটিকুমরুলে। যেখানে গত এক বছরে তিন শিশুসহ ৭১ জন মারা যান। রংপুর রিজিয়নের গাইবান্ধার গোবিন্দগঞ্জে এক শিশুসহ ৫৪ জন মারা গেছেন। চার চাকার যানবাহনের দুর্ঘটনা বেশি হয়েছে রংপুর রিজিয়নে ২৯৪টি, বগুড়া রিজিয়নে ১৯৫টি। মোটরবাইকের দুর্ঘটনা রংপুরে ৭২টি, বগুড়ায় ৫৮টি।
বগুড়া রিজিয়নের পুলিশ সুপার অ্যাডিশনাল ডিআইজি মো. শহিদ উল্লাহ জানিয়েছেন, সড়ক দুর্ঘটনা কমাতে পরিবহন শ্রমিক ও পথচারীদের সচেতন করার জন্য লিফলেট বিতরণ ও মাইকিং করা হচ্ছে। যানবাহনের গতি পর্যবেক্ষণে স্পিডগান ব্যবহার করা হচ্ছে এবং অতিরিক্ত গতির জন্য আইনি ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে।
তিনি বলেন, ‘আগে ট্রাক তেমন ওভারস্পিডে চলত না। এখন বাস, মোটরবাইক ও থ্রি-হুইলারের মতোই বেপরোয়া ট্রাকচালকরাও দুর্ঘটনার অন্যতম কারণ। দ্রুতগতির বাইক চালকরা নিয়ন্ত্রণ হারাচ্ছেন, ফলে প্রাণহানির ঘটনা ঘটছে।’
মোটরবাইক দুর্ঘটনা কমানোর জন্য শহিদ উল্লাহ বলেছেন, ‘চালকদের দক্ষতা বাড়াতে প্রশিক্ষণ দেওয়া জরুরি। বাইকের গতি নিয়ন্ত্রণে না থাকলে দুর্ঘটনা কমানো সম্ভব হবে না।’
উত্তরাঞ্চলের মহাসড়কগুলো এখন আগের চেয়ে অনেক বেশি প্রশস্ত ও ভালো হওয়ায় ৬০-৮০ কিমি/ঘণ্টার স্থানে যানবাহন চালকরা ১০০-১১০ কিমি/ঘণ্টার বেগে চলাচল করছেন। তিনি জানান, কয়েকদিন আগে মহাসড়কে ১২০ কিলোমিটার গতিতে এক সঙ্গে বেশ কয়েকজনকে মোটরবাইক চালানোর বিষয়টি তিনি নিজেই দেখতে পেয়েছেন।
বগুড়ায় নন্দীগ্রাম উপজেলার কুন্দারহাট হাইওয়ে পুলিশ ফাঁড়ির পাশেই থাকেন মো. আতউর রহমান। কৃষিকাজ তার পেশা। আতাউর রহমান জানান, সেপ্টেম্বর মাসের প্রথম সপ্তাহ পর্যন্ত ওই ফাঁড়ির এক কিলোমিটার এলাকায় এক মাসে পাঁচজন মারা গেছেন, আহত হয়েছেন তিনজন। স্থানীয় জনগণ অভিযোগ করেছেন, যানবাহন চালকদের অদক্ষতা, বেপরোয়া গতি এবং ভটভটির মতো অবৈজ্ঞানিক যানবাহন দুর্ঘটনার কারণ।
কুন্দারহাট ফাঁড়ির কাছের বাসস্ট্যান্ড এলাকায় থাকেন সাইফুল ইসলাম তোতা। তিনি জানিয়েছেন, স্থানীয় প্রযুক্তিতে তৈরি ভটভটির মতো যানবাহন মহাসড়কে বিপদ সৃষ্টি করছে। যানবাহন চালকরা নিজের নিরাপত্তা এবং পথচারী ও যানবাহনের প্রতি উদাসীন।
পুলিশের তথ্যে বলা হয়েছে, মহাসড়কে থ্রি-হুইলার চালকদের ৯৬ শতাংশের ড্রাইভিং লাইসেন্স নেই, মোটরবাইক চালকের ৫০ শতাংশ বেপরোয়া। বাস, ট্রাক ও থ্রি-হুইলার চালকরা অধিকাংশই সড়ক আইন মানতে চায় না, বিশেষ করে টার্মিনাল এলাকায়। ড্রাইভিং লাইসেন্স না থাকার কারণে বগুড়া ও রংপুর রিজিয়নে গত এক বছরে মামলা হয়েছে ২ হাজার ২৫৫টি। এর মধ্যে বগুড়া রিজিয়নে ১ হাজার ৩৫৭টি। ওভারলোডিংয়ের কারণে মামলা হয়েছে ১ হাজার ৪৭০টি। অতিরিক্ত গতিতে যানবাহন চলানোর অপরাধে মামলা হয়েছে ১২ হাজার ৮০৩টি। অনুপযোগী ৯ হাজার ৭৮৪টি যানবাহনের বিরুদ্ধে আইনানুগ ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে।