কুমিল্লার মানুষের জন্য সরকারি স্বাস্থ্য সেবা প্রদানের অন্যতম প্রতিষ্ঠান কুমিল্লা জেনারেল হাসপাতাল। নামমাত্র খরচে বিশেষজ্ঞ চিকিৎসক দেখানোর সুযোগ, বিনামূল্যে অপারেশন ও ওষুধ সরবরাহের মতো গুরুত্বপূর্ণ সুবিধাগুলো এই হাসপাতাল থেকে পাওয়া যায়। কিন্তু অবকাঠামোর সংকট এসব অর্জনকে ফিকে করে দিচ্ছে। ৪৯জন চিকিৎসকের জন্য এখানে কক্ষ রয়েছে মাত্র ১৯টি। এর মধ্যে দুটি কক্ষে ৯ চিকিৎসককে রোগী দেখতে হয়। এসব রুমে আবার নার্সদেরও জায়গা দিতে হয়। রোগীদের অপেক্ষার লাইন চলে যায় খোলা আকাশের নিচে। রোদে পুড়ে বৃষ্টিতে ভিজে তাদের অনেকে আরও অসুস্থ হয়ে পড়েন। সংশ্লিষ্টরা বলছেন, হাসপাতালটি ২৫০ শয্যায় উন্নীত করতে এরই মধ্যে আবেদন করা হয়েছে। এটি হলে এসব সংকটের সমাধান হয়ে যাবে।
কুমিল্লা জেনারেল হাসপাতালের তত্ত্বাবধায়কের কার্যালয় সূত্রে জানা গেছে, ১৮৪৫ সালে প্রতিষ্ঠিত হয় ‘কুমিল্লা চ্যারিটেবল ডিসপেনসারি বাই ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানি’। ১৮৭১ সালের দিকে কুমিল্লা দাতব্য চিকিৎসালয় নামে প্রতিষ্ঠানটি হাসপাতালের কার্যক্রম শুরু করে। তখন থেকে রোগী ভর্তি শুরু হয়। ১৯৭১ সালে মুক্তিযুদ্ধের পর এটি ৫০ শয্যা হাসপাতালে পরিণত হয়, যা বর্তমানে কুমিল্লা জেনারেল হাসপাতাল বা সদর হাসপাতাল নামে পরিচিত। কুমিল্লা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের পর এই হাসপাতালের বহির্বিভাগেই সবচেয়ে বেশি রোগী আসে।
জানা গেছে, ২০২৩ সালে কুমিল্লা জেনারেল হাসপাতালের বহির্বিভাগে চিকিৎসা নেয় ৩ লাখ ৩৯ হাজার মানুষ, ২০২৪ সালে তা বেড়ে দাঁড়ায় সাড়ে ৩ লাখ। চলতি বছরের প্রথম সাত মাসে এই হাসপাতালের বহির্বিভাগ থেকে চিকিৎসা নিয়েছেন ২ লাখ ৩০ হাজার মানুষ।
প্রতিবছর ধারাবাহিকভাবে বহির্বিভাগে চিকিৎসা নিতে আসা রোগীর প্রয়োজনে চিকিৎসক সংখ্যা বাড়ানো হয়। কিন্তু চিকিৎসা দেওয়ার জন্য পর্যাপ্ত কক্ষ বাড়ানো হয়নি। ৪৯ জন চিকিৎসকের জন্য রয়েছে মাত্র ১৯টি কক্ষ। ওষুধ বিতরণের জন্য দুটি কক্ষ আর বিশ্রামের জন্য কংক্রিটের আসন করা টিনশেড রয়েছে। সেখানেই দুটি কাউন্টার থেকে লাইনে দাঁড়িয়ে টিকিট কেনা হয়।
সম্প্রতি সরেজমিনে গিয়ে দেখা গেছে, হাসপাতালের পেছনের দিকে টিনশেড ভবনে মেডিসিন বিভাগের দুটি কক্ষে ৯ জন বিশেষজ্ঞ চিকিৎসক সেবা দিচ্ছেন। সেখানে রোগী বসার জায়গা পর্যন্ত নেই। বাইরে রোগীর লম্বা লাইন টিনের ছাউনি পেড়িয়ে গেছে। রোদ বৃষ্টি উপেক্ষা করে খোলা আকাশের নিচে রোগীদের অপেক্ষা করতে হচ্ছে।
এ ছাড়া পুরোনো ভবনের চিকিৎসকদের কোনো কোনো কক্ষে রোগীর জন্য শয্যা নেই। চেয়ার টেবিলগুলোও যেন বয়সের ভারে রঙচটা হয়ে গেছে। পুরোনো স্যাতসেঁতে ভবনের কক্ষগুলোতে আলোর অভাব। প্রাথমিক চিকিৎসার জন্য নেই উন্নত সরঞ্জাম। বিশ্রামের জায়গা না থাকায়, গাছের নিচে, পুকুর পাড়ে রোগী ও স্বজনদের অপেক্ষা করতে হয়। বেশি অসুস্থদের মেঝেতে বসে অপেক্ষা করতে হয়। সবচেয়ে বেশি অসুবিধায় পড়েন বৃদ্ধ ও শিশুরা। বৃষ্টি, রোদে ঘণ্টার পর ঘণ্টা অপেক্ষা করে অনেকে আরও অসুস্থ হয়ে পড়েন।
মেডিসিন বিভাগের চিকিৎসক আল মামুন বলেন, ‘কিছুই করার নেই। আমরা দুই রুমে ৯ জন চিকিৎসক বসি। এই রুমগুলোতে মানুষ দাঁড়ানোরও জায়গা নেই। তার ওপর এখানে নার্সদেরও বসার জায়গা দিতে হচ্ছে। এটা সেবা দেওয়ার কোনো পরিবেশ না। মনোযোগ দিয়ে রোগী দেখা কষ্টকর।’
ইমার্জেন্সি মেডিকেল অফিসার ডা. রাসেল খান বলেন, ‘প্রতিদিন রোগীর সংখ্যা বাড়ছে। সরকারি খরচে মানুষ বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকের কাছ থেকে সেবা নিতে পারছে। বিনামূল্যে অপারেশন হচ্ছে, বিনামূল্যে ওষুধ দেওয়া যাচ্ছে। শুধুমাত্র অবকাঠামগত উন্নয়ন করা হলে, আরও বেশি চিকিৎসক ও বিভিন্ন রোগের আলাদা আলাদা বিভাগ প্রতিষ্ঠা করা সম্ভব।’
হাসপাতালের আবাসিক মেডিকেল অফিসার আবদুল করিম খন্দকার বলেন, ‘রোগীর সংখ্যা বাড়ছে মানে সেবার মান বাড়ছে। হাসপাতালটির স্থাপনা খুবই দুর্বল। চাইলেও আমরা বেশি ডাক্তার দিতে পারছি না। যে জায়গায় একজন চিকিৎসকের সেবা দেওয়ার কথা সেখানে দুই থেকে তিনজন বসেন। এমন পরিস্থিতি শুধু স্থাপনার কারণে। যখন হাসপাতালটি ২৫০ শয্যায় উন্নীত হবে তখন এসব সমস্যা কমে আসবে।’
কুমিল্লার সিভিল সার্জন আলী নূর মো. বশির আহমেদ বলেন, ‘জেনারেল হাসপাতালকে ২৫০ শয্যায় উন্নীত করতে একটি আবেদন মন্ত্রণালয়ে পাঠানো হয়েছে। দ্রুত সময়ের মধ্যে শয্যা সংখ্যা বাড়ানোর অনুমতি ও বরাদ্দ পেলে ভবন ও জনবল কাঠামো রূপান্তর হবে। আমরা আশা করছি স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় এই হাসপাতালের দিকে সুনজর দেবে।’