গ্রাম থেকে বের হতে বিশাল পাহাড়ি ছড়া। সেই ছড়া পার হতে ১০ ফুটেরও বেশি উচ্চতা থেকে লাফ দিতে হয় স্কুল–কলেজগামী শিক্ষার্থীদের। এতে কখনো গায়ে আঘাত লাগে, অঅবার কখনো নষ্ট হয় পোষাক। এরপরও এমন দূর্ভোগ নিয়ে প্রতিদিন যাতায়াত করতে হয় হবিগঞ্জের মাধবপুর উপজেলার তেলিয়াপাড়া–সুরমা এলাকার কয়েকটি গ্রামের মানুষকে। অথচ ছড়ার ওপর ৫ বছর ধরে চলছে ব্রিজের নির্মাণকাজ। কিন্তু কাজ শেষ না হওয়ায় বাড়ছে ক্ষোভ।
উপজেলার সুরমা চা বাগানের ২০ নম্বর বস্তি ও আশপাশের অন্তত কয়েকটি গ্রামের প্রধান যোগাযোগপথ তেলিয়াপাড়া-শাহপুর সড়ক। এই পথে যাতায়াতে সাতছড়ি জাতীয় উদ্যান থেকে সুরমা চা বাগানে বয়ে যাওয়া ছড়াটি স্থানীয়দের গলার কাটা। গ্রাম থেকে বের হতে বিশাল এই ছড়া পার হতে প্রতিদিন ভোগান্তি পোহাতে হয় তাদের। বিকল্প একটি সড়ক থাকলেও সেখানে ঘুরতে হয় অন্তত ৩ কিলোমিটারের বেশি। তাই সহজপথ হিসেবে এটিই ব্যবহার করেন সহস্রাধিক মানুষ।
স্থানীয় সরকার প্রকৌশল অধিদপ্তর (এলজিইডি) ২০২০ সালের মাঝামাঝিতে প্রায় ৩ কোটি টাকা ব্যয়ে তেলিয়াপাড়া–শাহপুর সড়কে ছড়ার উপর ৪৫ মিটার ব্রিজের নির্মাণ কাজ শুরু হয়। ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান মেসার্স হাসান এন্টারপ্রাইজ কাজটি হাতে নেয়। সরকারি নথি অনুযায়ী, প্রকল্পের কাজের শেষ সময়কাল ধরা হয়েছিল ২০২২ সালের নভেম্বর পর্যন্ত। কিন্তু নির্ধারিত সময়ের তিন বছর পেরিয়ে গেলেও সংযোগ সড়ক ও নিরাপত্তা প্রটেকশনের কাজ বাকি থাকায় ব্রিজটি জনসাধারণের জন্য আনুষ্ঠানিকভাবে উন্মুক্ত করা যায়নি। তবে সংশ্লিষ্ট ঠিকাদারী প্রতিষ্ঠান ইতোমধ্যে উত্তোলন করেছে ২ কোটি ৪২ লাখ টাকা।
সরেজমিনে দেখা যায়, মূল ব্রিজের কাজ শেষ হলেও শুরু হয়নি অ্যাপ্রোচ নির্মাণ। সেই সঙ্গে ব্রিজের দক্ষিণ পাশের সংযোগ সড়কে বিশাল পাহাড়ি ধসের দেখা দিয়েছে। ফলে তৈরি হয়েছে নতুন দূর্ভোগ। আগে পায়ে হেটে ব্রিজ পারাপার হতে পারলেও, এখন ব্রিজের উপর উঠতে না পারায় পাহাড়ি ছড়া বেয়েই উঠা-নামা করতে করছে। এতে সবচেয়ে বেশি ভোগান্তিতে পড়ছে নারী, বৃদ্ধ ও স্কুলগামী শিশুরা। সেই সঙ্গে চা বাগানের শ্রমিকদেরও প্রতিদিন পাতা নিয়ে একইভাবে ছড়া পার হতে হচ্ছে।
চা বাগানের শিক্ষার্থী সুশেস তাঁতী বলেন, ‘প্রতিদিন স্কুলে যেতে হলে ওই ছড়ার পাশে দাঁড়িয়ে ভয় লাগে। প্রায় ১০ ফুট উঁচু জায়গা থেকে লাফ দিয়ে নিচে নামতে হয়। আবার উপরে ওঠার কষ্টতো আরও বেশি। এমন কোনো দিন নেই, যে কেউ না কেউ এখানে ব্যাথা পয়নি এবং পোষাক নষ্ট হয়নি। একবার আমিও পা পিছলে পড়ে গিয়ে পায়ে আঘাত পেয়েছি। তারপরও যেতে হয়, না গেলে ক্লাস মিস হয়। ব্রিজটা শেষ হলে আমাদের এই কষ্ট হতো না।’
চা শ্রমিক প্রিয়া মোন্ডা বলেন, ‘আমরা প্রতিদিন বাগান থেকে পাতা নিয়ে যাই। ওই ছড়া পার হওয়া আমাদের জন্য রোজকার ঝুঁকি। ভারী বোঝা নিয়ে টিলা বেয়ে উঠতে গিয়ে পড়ে যাই অনেক সময়। বৃষ্টি হলে ছড়ায় স্রোত আসে, তখন ওইদিকে ৩ কিলোমিটার ঘুরে যাওয়া লাগে।’
তিনি বলেন, ‘আমরা নিরীহ চা শ্রমিক মানুষ। তাই আমাদের ব্রিজের কাজটা করে দিচ্ছে না কেউ। আমরা প্রতিবাদ করার সাহসও পাই না। সব নিরবে সহ্য করে যাই।’
স্থানীয় চা শ্রমিক বাসিন্দা সন্তোষ মুন্ডা বলেন, ‘আমাদের এলাকার মানুষদের যেন বাইরের দুনিয়া থেকে আলাদা করে দিয়েছে এই অসম্পূর্ণ ব্রিজটা। রোগী নিয়ে যেতে পারি না। কোনো গাড়ি ঢোকার উপায়তো নাই-ই, পায়ে হেটেই চলা যায় না। কোনো মালামাল আনা–নেওয়া করা যায় না। পাঁচ বছর ধরে শুধু প্রতিশ্রুতি শুনছি, এ মাসে-না ওইমাসে কাজ শেষ হবে। কিন্তু কাজ আর শেষ হয় না। এখন মানুষের ধৈর্য শেষ হয়ে গেছে।’
ঠিকাদার নাসির মিয়া বলেন, ‘ব্রিজের মূল কাঠামো প্রায় শেষ এখন সংযোগ সড়ক, গার্ড ওয়াল ও প্রটেকশন সংক্রান্ত কাজ বাকি রয়েছে। আবহাওয়াগত কারণে কাজ পিছিয়েছিল। তবে চলতি মাসের মধ্যে সব শেষ করব আমরা।’
তিনি বলেন, ‘আমি এই কাজটি নিয়ে পাপ করেছি। এই কাজটি দ্রুত শেষ করে পাপমুক্ত হতে চাই।’
এলজিইডি হবিগঞ্জের নির্বাহী প্রকৌশলী ফরিদুর রহমান বলেন, ‘কাজ অনেকটাই সম্পন্ন। মূল ব্রিজের কাজ শেষ হয়েছে অনেক আগেই। শুধুমাত্র অ্যাপ্রোচের কাজ সম্পন্ন না হওয়ায় ব্রিজটি স্থানীয়রা ব্যবহার করতে পারছেন না। আমি সরেজমিন পরিদর্শন করেছি। যেহেতু এটি পাহাড়ি ছড়ার উপর নির্মিত, তাই সংযোগ সড়কে ভাঙন দেখা দিয়েছে।’
তিনি বলেন,‘চলতি মাসের মধ্যে কাজ সম্পন্ন করতে ঠিকাদারকে তাগিদা দেওয়া হয়েছে। যদি এ মাসের মধ্যে কাজ শেষ করতে না পারে, তাহলে চুক্তি বাতিলসহ ঠিকাদারী প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া হবে।’
কাজল/মেহেদী/