ব্রহ্মপুত্র নদ আর যমুনা নদীর ভাঙনে জামালপুরের কয়েকটি চরের বিপুলসংখ্যক বাড়িঘর বিলীন হয়েছে। আবাদি জমি আর সরকারি-বেসরকারি অনেক স্থাপনাও চলে গেছে নদীগর্ভে। হুমকির মুখে আরও বহু বাড়িঘর, কয়েকটি ধর্মীয় প্রতিষ্ঠান, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, আবাদি জমি আর সরকারি-বেসরকারি অনেক স্থাপনা।
পানি উন্নয়ন বোর্ডের নির্বাহী প্রকৌশলী মো. নকিবুজ্জামান জানান, জামালপুরের দেওয়ানগঞ্জ, ইসলামপুর ও মাদারগঞ্জ উপজেলায় ব্রহ্মপুত্র নদ ও যমুনা নদীর ৯৩ কিলোমিটার তীরের মধ্যে প্রায় ৩০ কিলোমিটার এলাকাজুড়ে চলছে ভাঙন। এ ছাড়া মুন্নিয়ার চর, প্রজাপতির চর ও চরকাছারি দুয়া, খোরাবাড়ি ও কাছের দহসহ অনেক চরে ভাঙন ধরেছে। ফলে ভাঙনে শুধু এ বছরই নদ-নদীতে বিলীন অনেক বাড়িঘর আর আবাদি জমি। স্থানীয় গণমাধ্যমকর্মীরা জানান, তাদের কাছে যে খসড়া হিসাব রয়েছে তাতে দেখা যায়, গত ৩০ বছরে জামালপুরে বাস্তুচ্যুত হয়েছে কমপক্ষে ৬ লাখ মানুষ
কত এলাকাজুড়ে ভাঙন ভায়াবহ আকার ধারণ করেছে- এ প্রশ্নের জবাবে মো. নকিবুজ্জামান বলেন, ৩০ কিলোমিটারের মধ্যে ভাঙন ভয়াবহ আকার ধারণ করেছে ২০ কিলোমিটার এলাকায়। অরক্ষিত ১০ কিলোমিটারেও বিভিন্ন স্থানে নদ-নদীর ভাঙন আছে, তা তীব্র নয়। পানি উন্নয়ন বোর্ড কর্মকর্তারা জানান, খোলাবাড়ি চরের উজানের পাশাপাশি সানন্দবাড়ি থেকে মৌলভীবাজার পর্যন্ত এলাকায় ভাঙন তীব্র আকার ধারন করেছে। ভাঙনরোধে স্থায়ী কোনো ব্যবস্থা নেওয়ার উদ্যোগ আছে কি না- এ প্রশ্নের জবাবে নির্বাহী প্রকৌশলী মো. নকিবুজ্জমান বলেন, ব্রহ্মপুত্র নদ ও জিঞ্জিরাম নদীর ১৩ কিলোমিটার তীর স্থায়ীভাবে রক্ষায় প্রায় ৫৫৮ কোটি টাকার একটি প্রকল্প অনুমোদনের অপেক্ষায় আছে। এ ছাড়া ১৫ কিলোমিটার নদীতীর স্থায়ীভাবে রক্ষায় আরও ১ হাজার কোটি টাকার প্রকল্প প্রণয়নের কাজ চলছে।
গত এক বছরে কত জমি এবং বাড়িঘর নদ-নদীতে বিলীন হয়েছে, এ-সংক্রান্ত সঠিক কোনো তথ্য সরকারি দপ্তরগুলোতে পাওয়া যায়নি। তবে শুধু ইসলামপুর উপজেলাতেই বাড়িঘর হারিয়েছে অন্তত ৩০০ পরিবার; এ দাবি এলাকার মানুষের। বাড়িঘর সরিয়ে রাস্তাসহ বিভিন্ন স্থানে বসবাস করছেন কমপক্ষে দেড় হাজার মানুষ। পানি উন্নয়ন বোর্ড বিগত বছরগুলোতে নদ-নদীর ভাঙনরোধে তেমন কোনো কার্যকর উদ্যোগ না নেওয়ায় মুন্নিয়ার চরের মানুষ নিজেরাই চাঁদা তুলে ভাঙনরোধে কাজ শুরু করেছেন।
মো. রুবেল রানা থাকেন ইসলামপুর উপজেলার মুন্নিয়ার চরে। তিনি বলেন, নদীভাঙন রোধ করতে এলাকার মানুষ জনপ্রতিনিধি, প্রশাসন ও পানি উন্নয়ন বোর্ড কর্মকর্তাদের কাছে বহুবার গেছেন। কিন্তু কোনো কাজ হয়নি। এ অবস্থায় স্থানীয় যুবকরা ‘মুন্নিয়া যুব সংগঠন’ নামে সামাজিক একটি সংগঠনের সদস্যরা চাঁদা তুলে নদীভাঙন রোধে কাজ শুরু করেছেন। এলাকার মানুষ বাড়িপ্রতি ১ হাজার টাকা করে দিয়েছে আর যারা প্রবাসী তারা তাদের এক মাসের বেতন দিয়েছে নদীভাঙন রোধে। নদীভাঙনের ভয়াবহতা সম্পর্কে জানাতে গিয়ে মো. রুবেল রানা বলেন, ৩-৪ মাস আগে বন্যার সময় ভাঙনে বাড়িঘর হারিয়েছে অন্তত ৫০০ পরিবার। অন্তত ৩ বিঘা জমি গেছে নদীতে আর কয়েকটি এলাকায় গেছে সরকারি-বেসরকারি অনেক অবকাঠামো।
মো. জুয়েল থাকেন ইসলামপুর উপজেলার প্রজাপতির চরে। বড় বড় দুটি নৌকা আছে, নানা ধরনের পণ্য নিয়ে যান ব্রহ্মপুত্র এবং যমুনার বিভিন্ন চরে। চলাচলের পথে বিভিন্ন এলাকায় নদীভাঙনের দৃশ্য দেখেছেন বহুবার। জুয়েল বলেন, গত দুই বছরে তাদের চরে অনেক মানুষ গৃহহীন হয়েছেন। আবাদি জমিও নদীতে গেছে অনেক। নদীভাঙনে কত জমি গেছে আপনার- এ প্রশ্নের জবাবে জুয়েল বলেন, আমার পরিবারের জমি গেছে ২০ বিঘা। ধান, মরিচ ও ভুট্টাসহ নানা ধরনের ফসল হতো ওইসব জমিতে। এখন জমির ওপর পানি। জুয়েল জানান, তার কাছে যে তালিকা রয়েছে তাতে প্রজাপতির চরের মাত্র ২৫ জনেরই জমি গেছে ৪ বিঘার ওপর।
স্থানীয় জনসাধারণ জানান, নদীভাঙনের কারণে ৫-৬টি সরকারি প্রতিষ্ঠান, ৭টি মহিলা মাদ্রাসা, ১২-১৩টি মসজিদ বিলীন হয়েছে জামালপুরের বিভিন্ন এলাকায়। বিভিন্ন স্থানে হুমকির মুখে পড়েছে সরকারি-বেসরকারি অনেক স্থাপনা।
পানি উন্নয়ন বোর্ড কর্মকর্তারা জানান, ব্রহ্মপুত্র ও যমুনার অনেক এলাকাতেই স্থায়ীভাবে ভাঙন ঠেকাতে তীর সংরক্ষণ জরুরি। এ বিষয়ে প্রকল্প হাতে নিলে হয়তো ইসলামপুর, মাদারগঞ্জ ও দেওয়ানগঞ্জ উপজেলার ভাঙনকবলিত এলাকাগুলো রক্ষা করা সম্ভব হবে। পানি উন্নয়ন বোর্ড কর্মকর্তারা বলছেন, নদ-নদীতে পানি কমে যাওয়ায় অনেক এলাকাতেই ভাঙন বেড়েছে। তবে এটি নিয়ন্ত্রণের কাজও চলছে।