খাগড়াছড়িতে হঠাৎ করেই থমকে গেছে শত কোটি টাকার সরকারি উন্নয়ন কাজ। পার্বত্য জেলা পরিষদ, পার্বত্য চট্টগ্রাম উন্নয়ন বোর্ড, স্থানীয় সরকার প্রকৌশল অধিদপ্তর, জনস্বাস্থ্য প্রকৌশল অধিদপ্তর, গণপূর্ত বিভাগসহ প্রায় সব সেক্টরের কাজই এখন বন্ধ। স্কুল, কলেজ, মসজিদ, মন্দির, বিহার, গির্জা, ব্রিজ ও কালভার্ট থেকে শুরু করে অসংখ্য স্থাপনাসহ গ্রামীণ ও আঞ্চলিক সড়কের নির্মাণকাজ থেমে গেছে মাঝপথেই। কারণ জেলায় ইটের তীব্র সংকট দেখা দিয়েছে। ভাটা মালিকরা এ বছর পুরো জেলার কোথাও কোনো ইটভাটা চালু করতে পারেননি।
জেলার ২৬টি ইটভাটার কোনোটিরই পরিবেশ অধিদপ্তরের ছাড়পত্র নেই। তাই তাদের লাইসেন্সও নেই। লাইসেন্স না থাকায় এ বছর ইটভাটা সচল করার বিষয়ে কঠোর অবস্থানে গেছে পরিবেশ মন্ত্রণালয়। মন্ত্রণালয়ের নির্দেশনা অনুযায়ী স্থানীয় প্রশাসনও ইটভাটা বন্ধে তৎপর রয়েছে। ফলে বেকার হয়ে পড়েছেন জেলার কয়েক হাজার শ্রমিক, দিনমজুর, ট্রাক্টরচালক, হেলপার এবং রাজমিস্ত্রি। শীত মৌসুমে সাধারণত পাহাড়ে নির্মাণকাজ দ্রুত এগোয়। কিন্তু এ মৌসুমে ইটভাটা চালু করতে না পারায় বেকায়দায় পড়েছেন ঠিকাদার ও ইটভাটা মালিকরা। পুরো উন্নয়ন খাত পড়েছে গভীর অনিশ্চয়তায়।
পার্বত্য চট্টগ্রাম উন্নয়ন বোর্ডের খাগড়াছড়ি কার্যালয়ের নির্বাহী প্রকৌশলী মুজিবুল আলম বলেন, ‘গ্রামীণ ব্রিজ-কালভার্ট থেকে শুরু করে অসংখ্য উন্নয়ন স্থাপনার নির্মাণ থমকে আছে। এখানে এখনো ইটের কোনো বিকল্পও তৈরি হয়নি। ফলে ঠিকাদারদের কাজ চালু রাখতে হলে চট্টগ্রাম বা ফেনী থেকে ইট এনে কাজ চালাতে হবে। তা ব্যয়বহুল হওয়ায় তারা কাজ বন্ধ করে রেখেছেন। ফলে খাগড়াছড়িতে উন্নয়ন বোর্ডের অধীনেই চলমান প্রায় ৩০ কোটি টাকার কাজ বন্ধ হয়ে আছে। সব দপ্তর মিলিয়ে এমন অন্তত শত কোটি টাকার উন্নয়ন কাজ অনিশ্চয়তার মুখে পড়েছে।’
ইটভাটা বন্ধ হয়ে যাওয়ায় সবচেয়ে বিপাকে পড়েছেন শ্রমিকরা। জেলার দীঘিনালা উপজেলার মনিরুল হক গত ১৫ বছর ধরে ভাটায় শ্রমিকের কাজ করে আসছেন। তিনি বলেন, ‘প্রতি মৌসুমে চার-পাঁচ মাস কাজ করে আমরা সারা বছর সংসার চালাই। এবার তো শুরুই হলো না। হাতে কোনো কাজ নেই। ধারদেনা করে খুব কষ্টে চলছি।’
ইট বহনকারী ট্রাক্টরচালক রবিউল আলম বলেন, ‘এখন আমাদের আয়ের প্রধান মৌসুম। অথচ গত এক মাসে এক দিনও ট্রাক্টর বের করতে পারিনি। এভাবে চলতে থাকলে কয়েকদিন পর ভিক্ষা করতে নামতে হবে। এ ছাড়া আর কোনো উপায় দেখছি না।’
খাগড়াছড়ি রাজমিস্ত্রি সমবায় সমিতির সাধারণ সম্পাদক আবদুল জলিল বলেন, ‘পুরো জেলায় অন্তত ৫ হাজার রাজমিস্ত্রি রয়েছেন। উন্নয়ন কাজ বন্ধ থাকায় তাদের সবাই বেকার হয়ে পড়েছেন। এতে একদিকে শ্রমিকরা যেমন অভাবে পড়েছেন, অন্যদিকে এলাকায় চুরির প্রবণতাও বাড়ছে।’
খাগড়াছড়ির উপজাতীয় ঠিকাদার কল্যাণ সমিতির সভাপতি রিপরিপ চাকমা বলেন, ‘সরকারি কাজ সমাপ্ত করার জন্য নির্ধারিত সময়সীমা বেঁধে দেওয়া থাকে। অথচ ইটের সংকটের কারণে কাজ বন্ধ রাখতে হচ্ছে। ফলে প্রকল্প বাস্তবায়নের সময়সীমা নিয়ে আমরা চরম ঝুঁকিতে পড়েছি। এ ছাড়া সরকারিভাবে ইটের যে মূল্য নির্ধারণ করা হয়েছে তাতে সমতলের জেলা থেকে বাড়তি খরচে ইট এনে এখানে কাজ শেষ করা সম্ভব না। এতে লাভের পরিবর্তে তিন গুণ লোকসান গুনতে হবে।’
এদিকে ইটভাটা মালিকরা বলছেন, নিয়ম মেনে তারা পরিবেশবান্ধব ইটভাটা পরিচালনা করতে প্রস্তুত। খাগড়াছড়ি ইটভাটা মালিক সমিতির সাধারণ সম্পাদক হারুনুর রশিদ বলেন, ‘আমরা পরিবেশবান্ধব প্রযুক্তিতেই ভাটা সচল রাখতে চাই। কিন্তু প্রয়োজনীয় লাইসেন্স দেওয়া হচ্ছে না। অথচ সরকার লাইসেন্স না দিলেও রাজস্ব, ভ্যাট, আয়কর সবই নিচ্ছে।’
খাগড়াছড়ি পরিবেশ অধিদপ্তরের সহকারী পরিচালক হাসান আহাম্মদ বলেন, ‘পাহাড়ের পরিবেশের ওপর ইটভাটার প্রভাব গুরুতর। পরিবেশ অধিদপ্তরের ছাড়পত্র ছাড়া ভাটা পরিচালনার সুযোগ নেই। উচ্চ আদালতের আদেশ মোতাবেক পার্বত্য চট্টগ্রামের তিন জেলায় ইটভাটার লাইসেন্স দেওয়া সম্ভব নয়।’
খাগড়াছড়ির জেলা প্রশাসক আনোয়ার সাদাত বলেন, ‘পরিবেশ মন্ত্রণালয় এবং উচ্চ আদালতের নির্দেশনা মেনে ইট ভাটাগুলো বন্ধ রাখতে গণবিজ্ঞপ্তি জারি করা হয়েছে।’