চট্টগ্রামের আনোয়ারা উপজেলায় বেসরকারি হাসপাতাল ও ক্লিনিকগুলোর অব্যবস্থাপনা ও উদাসীনতার কারণে চাতরী ইউনিয়নের কান্দুরিয়া খাল আজ চরম বিপর্যয়ের মুখে পড়েছে। স্বাস্থ্যবিধি, পরিবেশ আইন ও হাসপাতাল ব্যবস্থাপনার ন্যূনতম মানদণ্ডকে উপেক্ষা করে মাসের পর মাস ধরে খালে নির্বিচারে ফেলা হচ্ছে চিকিৎসাবর্জ্য। এর ফলে খালটি এখন পরিণত হয়েছে বিপজ্জনক মেডিকেল বর্জ্যের স্তূপে, যা স্থানীয়দের জীবন-জীবিকার ওপর গুরুতর হুমকি সৃষ্টি করেছে।
স্থানীয়দের অভিযোগ, রাত গভীর হলে এলাকার বিভিন্ন ক্লিনিক, ল্যাব ও হাসপাতালের লোকজন ট্রলি বা বড় বস্তায় ভরে বর্জ্য এনে খালে ফেলে যায়। একাধিকবার প্রতিবাদ, অভিযোগ, অনুরোধ, কিছুই কাজে আসেনি। বরং প্রতিদিনই বাড়ছে বর্জ্যের পরিমাণ, বাড়ছে রোগবিস্তার ও পরিবেশদূষণের আশঙ্কা। খালের পচা-গলা বর্জ্য বর্ষার পানিতে ভেসে আশপাশের কৃষিজমি ও জলাশয়ে ছড়িয়ে পড়ছে। এতে শাকসবজি, মাছ, গবাদিপশুসহ সবকিছুই ঝুঁকির মুখে পড়েছে।
ঘটনাস্থলে সরেজমিনে গিয়ে দেখা যায়, খালের পানিতে রক্তমাখা ব্যান্ডেজ, ব্যবহৃত সিরিঞ্জ, ভাঙা কাচের বোতল, প্যাথলজির নমুনা ও মেয়াদোত্তীর্ণ ওষুধ ভাসছে। খালের দুই তীরজুড়ে স্তূপ হয়ে আছে পচা-গলা বর্জ্য। দুর্গন্ধে এলাকায় দাঁড়ানোই কঠিন হয়ে পড়েছে। সবচেয়ে ভয়াবহ হলো, এ বর্জ্যের অনেকটাই সংক্রামক এবং সরাসরি মানুষের স্বাস্থ্যের জন্য ঝুঁকিপূর্ণ।
স্থানীয়রা জানান, কর্তৃপক্ষের কাছে অভিযোগ দিতে দিতে তারা ক্লান্ত। কিন্তু প্রশাসন কঠোর নজরদারি না করায় হাসপাতালের লোকেরা রাতের আঁধারে এসে বর্জ্য ফেলে যায়। এখন খালের পানি ব্যবহারের অনুপযোগী। এর ফলে এলাকার শিশু থেকে বৃদ্ধ সবাই নানা রোগে ভুগছে।
চাতরী ইউনিয়ন পরিষদ সদস্য আবুল মনসুর বলেন, ‘খালটি এখন মরা খালের মতো। শুধু হাসপাতালের নয়, কারখানার বর্জ্যও এখানে ফেলা হচ্ছে। খাল রক্ষায় গত বছর খননের আবেদন করেছি।’
স্থানীয় কৃষক পুলক দাশ জানান, এক সময় এই খাল কৃষিকাজের পানির প্রধান ভরসা ছিল। এখন ভয়ংকর দুর্গন্ধ আর হাসপাতালে বর্জ্যের কারণে পানি ব্যবহারই অসম্ভব।
আনোয়ারা উপজেলা সহকারী কমিশনার (ভূমি) দীপক ত্রিপুরা বলেন, ‘চিকিৎসাবর্জ্য খালে ফেলা শুধু অনিয়ম নয়, এটি ভয়ংকর স্বাস্থ্যঝুঁকি ও পরিবেশ ধ্বংসের শামিল। এটি দণ্ডনীয় অপরাধ। দায়ীদের বিরুদ্ধে দ্রুত আইনগত ব্যবস্থা নিতে কাজ চলছে।’
অভিযোগের বিষয়টি অস্বীকার করে আনোয়ারা হলি হেলথ ক্লিনিক অ্যান্ড ডায়াগনস্টিক লিমিটেডের ব্যবস্থাপনা পরিচালক এম জামিল উদ্দিন চৌধুরী খবরের কাগজকে বলেন, ‘প্রশাসন ও থানা থেকে সতর্ক করার পর আমরা বর্জ্য পুড়িয়ে ফেলছি। চাইলে সরেজমিনে গিয়ে দেখে আসতে পারেন।’
তবে এলাকাবাসী বলছে, প্রশাসনের পদক্ষেপ শুরু হতেই যারা এতদিন বর্জ্য খালে ফেলতেন, তারা এখন নিজেদের দায়িত্বশীল দেখাতে চাইছেন। কিন্তু বাস্তব চিত্র খালেই স্পষ্ট। উপজেলার পরিবার-পরিকল্পনা কর্মকর্তা ডা. মাহতাব উদ্দিন চৌধুরী খবরের কাগজকে বলেন, ‘এটি অত্যন্ত বিপজ্জনক এবং পরিবেশ ও জনস্বাস্থ্যের জন্য ক্ষতিকারক। বিষয়টি আগে জানতে পারিনি। এখন যেহেতু অবগত হয়েছি, দ্রুত পর্যবেক্ষণ করে ব্যবস্থা নেব।’
এ বিষয়ে আনোয়ারা উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) ও চাতরী ইউনিয়নের প্রশাসক তাহমিনা আক্তার খবরের কাগজকে বলেন, ‘হাসপাতালের চিকিৎসাবর্জ্য খালে ফেলা মারাত্মক অপরাধ এবং পরিবেশের ওপর বিরূপ প্রভাব ফেলে। খুব দ্রুত অভিযানে নামার প্রস্তুতি নেওয়া হচ্ছে। দায়ীদের ছাড় দেওয়া হবে না।’
স্থানীয় সচেতন মহল মনে করেন, দীর্ঘদিন ধরে প্রশাসনের কার্যকর উদ্যোগ না থাকায় হাসপাতালগুলো বেআইনি কাজ চালিয়ে যেতে সাহস পেয়েছে। এখন যদি কঠোর ব্যবস্থা না নেওয়া হয়, তবে কান্দুরিয়া খালের অস্তিত্বই সংকটে পড়বে।
স্থানীয়দের আশা, প্রশাসনের এবারের উদ্যোগ শুধু আশ্বাসেই সীমাবদ্ধ না থেকে বাস্তব পদক্ষেপে রূপ নেবে এবং কান্দুরিয়া খালের পরিবেশ দ্রুত পুনরুদ্ধার হবে। বহু বছরের এই অনিয়ম বন্ধ না হলে ভবিষ্যতে এলাকাজুড়ে যে বড় ধরনের স্বাস্থ্যঝুঁকি তৈরি হবে, এর দায় কে নেবে— সেই প্রশ্নও উঠছে স্থানীয়দের মধ্যে।