মানিকগঞ্জ শহরজুড়ে এলপিজি গ্যাস সিলিন্ডারের বাজারে চরম অস্থিরতা বিরাজ করছে। সরকার নির্ধারিত মূল্যের চেয়ে প্রায় দেড় গুণ বেশি দামে সিলিন্ডারগুলো বিক্রি হচ্ছে। ভোক্তাদের অভিযোগ, সংকটটি স্বাভাবিক নয়; এটি পরিকল্পিত। কারণ চাহিদা আগের মতো থাকলেও সরবরাহ হঠাৎ করেই কমে গেছে। এ অবস্থায় জেলা প্রশাসন বা ভোক্তা অধিকার সংরক্ষণ অধিদপ্তরের কোনো কার্যকর তদারকি চোখে পড়েনি। নেই ভ্রাম্যমাণ আদালত কিংবা বাজার মনিটরিংয়ের ব্যবস্থা। ফলে এ সুযোগ নিয়ে আরও বেপরোয়া হয়ে উঠেছে ডিলার ও খুচরা বিক্রেতারা।
শনিবার (৩ জানুয়ারি) মানিকগঞ্জ শহরের দুধবাজার, গঙ্গাধরপট্টি, বনগ্রাম, বেউথা ও বাসস্ট্যান্ড এলাকা ঘুরে এমন চিত্র দেখা গেছে। অতিরিক্ত দামে সিলিন্ডার কিনতে বাধ্য হওয়ায় ক্ষুব্ধ ভোক্তারা অভিযোগ করছেন, সিন্ডিকেটের মাধ্যমে কৃত্রিম সংকট সৃষ্টি করে দাম বাড়ানো হচ্ছে।
বাংলাদেশ এনার্জি রেগুলেটরি কমিশন (বিইআরসি) গত বছরের ২ ডিসেম্বর জারি করা বিজ্ঞপ্তিতে ভোক্তা পর্যায়ে এলপিজি গ্যাসের দাম নির্ধারণ করে দেয়। সেখানে বলা হয়- ১২ কেজি সিলিন্ডার ১২৫৩ টাকা, সাড়ে ১২ কেজি ১৩০৫ টাকা, ১৫ কেজি ১৫৬৬ টাকা, ১৮ কেজি ১৮৮০ টাকা, ২২ কেজি ২২৯৮ টাকা এবং ৩০ কেজি ৩১৩৩ টাকা।
বিজ্ঞপ্তিতে স্পষ্টভাবে উল্লেখ করা হয়েছে, পরবর্তী নির্দেশ না দেওয়া পর্যন্ত নির্ধারিত দামের চেয়ে বেশি মূল্যে কোনো পর্যায়েই এলপিজি গ্যাস বিক্রি করা যাবে না। অথচ বাস্তবে মানিকগঞ্জে সেই নির্দেশনার কোনো প্রতিফলন নেই।
এদিকে শহরের বিভিন্ন বাজার ঘুরে দেখা গেছে, যেসব বেসরকারি প্রতিষ্ঠানের সিলিন্ডারের চাহিদা বাজারে বেশি, সেগুলো এক সপ্তাহ ধরে পাওয়া যাচ্ছে না। তুলনামূলক কম চাহিদার প্রতিষ্ঠানের সিলিন্ডার সীমিত পরিমাণে পাওয়া গেলেও, দাম চাওয়া হচ্ছে বেশি।
অপরদিকে, মানিকগঞ্জ শহরে তিতাসের গ্যাস সংযোগ থাকলেও গ্যাস পাওয়া যায় না। ফলে অধিকাংশ পরিবার এলপিজির ওপর নির্ভরশীল। এই সুযোগকে কাজে লাগিয়েই বাজারে কৃত্রিম সংকট তৈরি করে দাম বাড়ানো হচ্ছে বলে অভিযোগ স্থানীয়দের।
পশ্চিম দাশড়া এলাকার বাসিন্দা তোফাজ্জল হোসেন। পরিবারের রান্নার জন্য প্রতিমাসে ২২ কেজির এলপিজি কেনেন। গ্যাস শেষ হয়ে গেলে স্থানীয়ভাবে সরবরাহকারী প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে যোগাযোগ করেন। কিন্তু এবার তারা ২৩০০ টাকার সিলিন্ডারের দাম সাড়ে তিন হাজার টাকা চান। বাধ্য হয়ে তাকে বেশি দামে সিলিন্ডার কিনতে হয়। তিনি বলেন, ‘এমন হলে চলবে কীভাবে? সরকারের প্রতিনিধিরা ঠিকমতো ডিলার আর বাজার মনিটরিং না করার কারণে এমনটি হচ্ছে।’
বেউথা এলাকার গৃহিণী শবনম ইসলাম বলেন, ‘তিতাস গ্যাসের সরবরাহ থাকলেও গ্যাস পাওয়া যায় না। আগে সপ্তাহে দু-একদিন একটি নির্দিষ্ট সময়ে আসত। কিন্তু এখন মোটেও পাওয়া যায় না। বাধ্য হয়ে এলপিজি গ্যাস ব্যবহার করি। আজ বাজারে সিলিন্ডার কিনতে এসে দেখি ৫০০ টাকা অতিরিক্ত চাচ্ছে। কি আর করা, রান্না ছাড়া তো আর থাকা যাবে না।’
পূর্ব দাশড়ার আনোয়ার হোসেন বলেন, ‘ক্যাশমেমো চাইলে দেয় না। বলছে নিতে হলে নেন, না হলে রেখে দেন। আমরা সাধারণ মানুষ কোথায় যাব? বিক্রেতা আমায় বলল, কাল আরও বাড়তে পারে। প্রশাসনের নজরদারি না থাকায় আমাদের ভোগান্তি আরও বাড়বে।’
শহরের বিসমিল্লাহ ট্রেডার্সের খুচরা বিক্রেতা মো. সুজন বলেন, ‘প্রায় এক সপ্তাহ ধরে বেশি বিক্রি হওয়া সিলিন্ডারগুলো আসছে না। আমরা তো কোম্পানি থেকেই মাল পাচ্ছি না। যে গ্যাসগুলো পাওয়া যাচ্ছে, সেগুলোর সাপ্লাই কম। ডিলাররা আমাদের কিছু কিছু দিচ্ছে, তাও অনেক চড়া দামে। কোম্পানির লোকেরা পরিষ্কার তথ্য দিচ্ছে না, কবে থেকে দাম স্বাভাবিক হবে।’
এম বাবুল ট্রেডার্সের মালিক বাবুল হোসেন বলেন, ‘আগে প্রতিদিন যেখানে ২০টার মতো সিলিন্ডার বিক্রি করতাম, এখন সেখানে ১২/১৩টা বিক্রি করি। অনেকে দাম শুনে নিচ্ছেন না। যারা আমাদের এলপিজি দেন তারা বলছেন কোম্পানিতে লিকুইড গ্যাস নাই। ডিলারদের ফোন করলে অনেক সময় রিসিভ করেন না। আমরাও অসহায় অবস্থায় আছি।’
ক্যাশমেমো ছাড়া পণ্য বিক্রির সুযোগ নেই জানিয়ে জেলা ভোক্তা অধিকার সংরক্ষণ অধিদপ্তরের সহকারী পরিচালক (অতিরিক্ত দায়িত্ব) আসাদুজ্জামান রুমেল বলেন, ‘বিষয়টি খতিয়ে দেখা হবে। অতিরিক্ত দামে এলপিজি গ্যাস বিক্রির প্রমাণ পাওয়া গেলে আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হবে।’
এ বিষয়ে জেলা প্রশাসক নাজমুন আরা সুলতানা বলেন, সরকার নির্ধারিত মূল্যের চেয়ে বেশি দামে বিক্রি করার কোনো সুযোগ নাই। দ্রুতই ডিলার পয়েন্ট ও খুচরা বাজারে অভিযান করার কথা জানান তিনি।