হাসপাতাল থেকে ব্যক্তিগত গাড়িতে করে স্বজনরা চাইলে তাদের রোগীদের নিয়ে যেতে পারবেন। তবে গাড়ি ভাড়া করে রোগী বা মরদেহ নিতে হলে স্বজনদের চট্টগ্রাম অ্যাম্বুলেন্স মালিক সমবায় সমিতির কাছ থেকেই নিতে হবে। এ ক্ষেত্রে অন্য এলাকা থেকে রোগী নিয়ে আসা অ্যাম্বুলেন্স ডাউনট্রিপ বা নতুন কোনো রোগী বা মরদেহ নিয়ে যেতে পারবে না। চট্টগ্রামের অ্যাম্বুলেন্সচালকরা হাসপাতালে রোগী নিয়ে আসার ক্ষেত্রে যাওয়া ও আসা দুই ট্রিপের ভাড়া নেবেন। আবার মরদেহ নিয়ে যাওয়ার ক্ষেত্রেও একই নিয়মে ভাড়া আদায় করবেন। এমন সব মনগড়া নিয়ম দিয়ে নিজ মুল্লুক গড়ে তুলে চলেছে চট্টগ্রাম অ্যাম্বুলেন্স মালিক সমবায় সমিতি। আর এসব কারণে তাদের হাতে জিম্মি হয়ে পড়েছেন চট্টগ্রামের বিভিন্ন হাসপাতালে সেবা নিতে আসা রোগী ও তাদের স্বজনরা। ফলে মানুষের বিপদের বন্ধু হিসেবে পরিচিত অ্যাম্বুলেন্স সেবা এখন চরম দুর্ভোগে রূপ নিয়েছে।
এদিকে চট্টগ্রাম সিটি করপোরেশনের বাইরের এলাকা থেকে রোগী নিয়ে আসা অ্যাম্বুলেন্সগুলো ডাউনট্রিপ নিতে না পেরে রোগীর স্বজনদের কাছ থেকে সেই টাকাসহ ভাড়া আদায় করছেন বলে অভিযোগ উঠেছে।
অন্যদিকে চট্টগ্রামে গত বছরের ডিসেম্বরে অ্যাম্বুলেন্সের ভাড়া ১০ শতাংশ বাড়ানো হয়েছিল। সম্প্রতি চলতি জুন মাসে অ্যাম্বুলেন্সের ভাড়া নতুন করে আরও ৩০ শতাংশ বাড়ানো হয়, যা নিয়ে তুমুল সমালোচনা চলছে।
অন্যদিকে চমেক হাসপাতাল এলাকায় অ্যাম্বুলেন্স সিন্ডিকেটের বিরুদ্ধে ওঠা অভিযোগ তদন্ত করে আইনগত ব্যবস্থা গ্রহণ এবং শৃঙ্খলা ফেরানোর নির্দেশ দিয়েছেন চট্টগ্রাম চিফ মেট্রোপলিটন ম্যাজিস্ট্রেট আদালত। গত ৮ জুন সিএমএম আদালতের ম্যাজিস্ট্রেট এজিএম মনিরুল হাসান সরকার এ নির্দেশ দেন। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ও গণমাধ্যমে প্রকাশিত প্রতিবেদনের ভিত্তিতে তিনি এ নির্দেশনা দেন। নগর পুলিশের উত্তর বিভাগের অতিরিক্ত উপপুলিশ কমিশনারকে (এডিসি) ঘটনাটি সরেজমিনে তদন্তের নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।
নির্দেশে বলা হয়, বাইরে থেকে আসা বৈধ অ্যাম্বুলেন্স কিংবা স্বজনদের নিজস্ব গাড়ি দিয়ে রোগী বা মরদেহ পরিবহনে বাধা দেওয়া হচ্ছে। এ কাজে জড়িত ব্যক্তিরা গাড়িচালকদের হুমকি, মারধর ও হেনস্তাও করছেন। এসব অভিযোগের সত্যতা পাওয়া গেলে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে দণ্ডবিধির চাঁদাবাজি, প্রতারণা, ভয়ভীতি প্রদর্শন ও বেআইনি বাধা দেওয়াসহ বিভিন্ন ধারায় এবং সড়ক পরিবহন আইন অনুযায়ী মামলা করার ব্যবস্থা নিতে হবে। রোগী ও মৃত ব্যক্তির স্বজনরা নিজেদের পছন্দমতো অ্যাম্বুলেন্স, ফ্রিজিং ভ্যান বা অন্য কোনো যানবাহন ব্যবহার করে পরিবহনসেবা নিতে পারবেন।
খোঁজ নিয়ে এবং বিভিন্ন ভুক্তভোগীর সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, কোনো উপজেলা থেকে চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ (চমেক) হাসপাতাল কিংবা আগ্রাবাদ মা ও শিশু হাসপাতালে কোনো অ্যাম্বুলেন্স রোগী নিয়ে গেলে ওই অ্যাম্বুলেন্সকে খালি ফিরতে হয়। রোগী পেলেও তাদের ভাড়া নেওয়ার সুযোগ নেই। কারণ হাসপাতালকেন্দ্রিক গড়ে ওঠা সমিতির কাছ থেকে অ্যাম্বুলেন্স ভাড়া নেওয়া বাধ্যতামূলক। কেউ যদি বাইরের অ্যাম্বুলেন্সে করে রোগী নিয়ে যেতে চান, তাহলেও তাকে সমিতি থেকে গাড়ি না নিয়েও ভাড়া পরিশোধ করতে হয়। তা না হলে সমিতির লোকজন ওই অ্যাম্বুলেন্স আটকে দেন।
গত ২৯ মে ফেনীর সদর হাসপাতাল থেকে ৪ হাজার ৭০০ টাকা অ্যাম্বুলেন্স ভাড়া দিয়ে এক রোগীকে চমেক হাসপাতালে আনা হয়। পরে ওই রোগীর মৃত্যু হলে তাকে নেওয়ার সময় হাসপাতাল এলাকার অ্যাম্বুলেন্সকে ভাড়া দিতে হয় ৭ হাজার ৫০০ টাকা। অর্থাৎ অসুস্থ ব্যক্তি লাশ হওয়ার পর ভাড়া বেড়ে গেছে। এ ধরনের অনেক অভিযোগ রয়েছে অ্যাম্বুলেন্স মালিক সমিতির বিরুদ্ধে।
সর্বশেষ গত ৭ জনু এনসিপির চট্টগ্রামের কর্মীদের সঙ্গে অ্যাম্বুলেন্স মালিকদের মারামারির ঘটনা ঘটেছে। অভিযোগ একটাই জিম্মিদশা এবং বাড়তি ভাড়া আদায়। এই মারামারির সূত্র ধরে চমেক হাসপাতাল ব্যবস্থাপনা কমিটি চট্টগ্রামে অ্যাম্বুলেন্সের ভাড়া ৩০ শতাংশ বাড়িয়ে দিয়েছে, যা নিয়ে তুমুল সমালোচনা চলছে।
সাধারণ রোগী ও তাদের স্বজনদের অভিযোগ, অ্যাম্বুলেন্স নিয়ে গড়ে ওঠা সিন্ডিকেট না ভেঙে তাদের ভাড়া বাড়িয়ে দেওয়া হয়েছে, যা অনভিপ্রেত। গ্যাসচালিত অ্যাম্বুলেন্সের ভাড়া সমহারে বাড়ানো হয়েছে। অথচ গত বছরের ডিসেম্বরে ভাড়া একবার ১০ শতাংশ বাড়ানো হয়েছিল। ছয় মাসের মাথায় আবারও বাড়ল ৩০ শতাংশ। এ যেন মড়ার উপর খাঁড়ার ঘা।
এ বিষয়ে কনজুমার অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশ (ক্যাব) কেন্দ্রীয় সহসভাপতি এস এম নাজের হোসাইন খবরের কাগজকে বলেন, চট্টগ্রামে বেসরকারি অ্যাম্বুলেন্সের ভাড়া একলাফে ৩০ শতাংশ বাড়ানো কোনোভাবেই উচিত হয়নি। কারণ ভাড়া বাড়ানোর ক্ষেত্রে যেসব যুক্তি দেখানো হয়েছে, তাতে ভাড়া কোনোভাবেই ৩০ শতাংশ বাড়ানো যায় না। তাই জ্বালানি তেল বা অন্য যেকোনো অজুহাতে দাম বাড়ানোর কোনো যৌক্তিক কারণ নেই। অ্যাম্বুলেন্স মালিকদের ভাড়া বাড়ানোর অনুমোদন দিয়ে চমেক হাসপাতাল ব্যবস্থাপনা কমিটি সাধারণ রোগীদের স্বার্থকে উপেক্ষা করেছে। এই ভাড়া বাড়ানোর আগে সাধারণ রোগীদের সঙ্গে আলাপ ও যাচাই-বাছাই করা জরুরি ছিল।
তিনি আরও বলেন, অ্যাম্বুলেন্স মালিকরা জিম্মি করে ভাড়া আদায় করছেন। হাসপাতালে অন্য অ্যাম্বুলেন্স এসে ভাড়া নেওয়ার সুযোগ থাকতে হবে। নির্ধারিত ভাড়ার বেশি কেউ নিলে সে ক্ষেত্রে মালিক সমিতি ও হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ পদক্ষেপ নিতে পারে।
তিনি বলেন, মানুষ যখন সবচেয়ে বেশি বিপদে পড়েন তখন অ্যাম্বুলেন্সের দরকার। তারা সেই বিপদের সময় মানুষকে জিম্মি করেছেন। এটা সারা দেশের চিত্র। অথচ সে সময় মানবিক সহযোগিতা পাওয়ার কথা। এখন দেখা যায়, উপজেলা থেকে কোনো রোগী অ্যাম্বুলেন্স ভাড়া করলে তাকে আসা-যাওয়ার ভাড়া গুনতে হয়। কারণ চালক জানেন ফেরার সময় তাদের ভাড়া নেওয়ার সুযোগ নেই। অথচ যদি ফিরতি ভাড়া বা ডাউনট্রিপ নেওয়ার সুযোগ থাকলে আসার সময় রোগী কম ভাড়ায় আসতে পারতেন। আবার যাওয়ার সময় অন্য কোনো রোগী নিয়ে কম ভাড়ায় চলে যেতে পারতেন। দেশব্যাপী শক্ত সিন্ডিকেটের কারণে এই ভোগান্তি রয়ে গেছে। স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় এবং প্রশাসনের উচিত এই সমস্যার দ্রুত সমাধান করা।
এ বিষয়ে চট্টগ্রাম সিটি করপোরেশনের মেয়র ও চমেক হাসপাতাল ব্যবস্থাপনা কমিটির সভাপতি ডা. শাহাদাত হোসেন বলেন, চমেক হাসপাতালের ইতিহাসে এই প্রথমবারের মতো অ্যাম্বুলেন্সগুলোর ফিটনেস পরীক্ষা করা হচ্ছে। রোগী ও স্বজনদের নিরাপদ ও মানসম্মত সেবা নিশ্চিত করতে অ্যাম্বুলেন্স সেবাকে একটি সুশৃঙ্খল ব্যবস্থাপনার আওতায় আনা হচ্ছে। ফিটনেস পরীক্ষায় উত্তীর্ণ স্টিকারধারী অ্যাম্বুলেন্সগুলোই কেবল চমেক হাসপাতাল এলাকায় সেবা দিতে পারবে।
অ্যাম্বুলেন্স ভাড়া পুনর্নির্ধারণ প্রসঙ্গে মেয়র বলেন, জ্বালানি তেল, টায়ার ও অন্যান্য পরিচালন ব্যয় বৃদ্ধির বাস্তবতা বিবেচনায় ভাড়া সমন্বয়ের সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। মালিকপক্ষ ৫০ শতাংশ ভাড়া বৃদ্ধির প্রস্তাব দিলেও আলোচনা ও সমঝোতার মাধ্যমে তা ৩০ শতাংশে সীমিত রাখা হয়েছে। একটি অ্যাম্বুলেন্স রোগী বা মরদেহ গন্তব্যে পৌঁছে দেওয়ার পর ফেরার পথে খালি অবস্থায় ফিরে আসে। তাই ভাড়া নির্ধারণে যাওয়া-আসা উভয় দিকের ব্যয় বিবেচনায় নিতে হয়। নির্ধারিত ভাড়া কার্যকর হলে অতিরিক্ত ভাড়া আদায়, রোগীর স্বজনদের সঙ্গে বিরোধ এবং অনাকাঙ্ক্ষিত পরিস্থিতি হ্রাস পাবে। কোনো ব্যক্তি নিজস্ব অ্যাম্বুলেন্স ব্যবহার করলে কিংবা আঞ্জুমান মফিদুল ইসলামসহ বিভিন্ন স্বেচ্ছাসেবী সংগঠন বিনামূল্যে বা স্বল্প খরচে সেবা প্রদান করলে তাদের কাজে কোনো ধরনের বাধা দেওয়া যাবে না। একই সঙ্গে দরিদ্র ও অসহায় রোগীদের প্রতি মানবিক আচরণ এবং প্রয়োজনে বিশেষ ছাড় বা বিনামূল্যে সেবা দেবেন অ্যাম্বুলেন্স মালিকরা। নির্ধারিত অ্যাম্বুলেন্স ভাড়ার তালিকা নিয়ে গণমাধ্যম ও সচেতন নাগরিকদের মতামতকে গুরুত্ব দেওয়া হবে। কোথাও অস্বাভাবিক বা অযৌক্তিক ভাড়া নির্ধারণ হয়ে থাকলে তা সংশোধন করা হবে।
এসব বিষয়ে চট্টগ্রাম অ্যাম্বুলেন্স মালিক সমবায় সমিতির সাধারণ সম্পাদক আমান উল্লাহ চৌধুরী খবরের কাগজকে বলেন, দেশের প্রতিটি এলাকার হাসপাতালে এ রকম সমিতি বা সংগঠন আছে। রোগীর স্বজনরা নিজের ব্যক্তিগত গাড়িতে করে রোগী নিয়ে যেতে পারবেন। কিন্তু ভাড়া নিতে হলে সমিতির কাছ থেকেই নিতে হবে। অন্য এলাকা থেকে রোগী নিয়ে আসা অ্যাম্বুলেন্সের ডাউনট্রিপ মারার সুযোগ নেই। এটা কেউ করতে দেয় না।
সারা দেশে একই নিয়ম দাবি করে তিনি বলেন, যদি কারও কাছে টাকা না থাকে সমিতি থেকে প্রয়োজনে ফ্রি সার্ভিস দেওয়া হয়। তবু ডাউনট্রিপের সুযোগ নেই। এটা শুধু চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে নয়। আপনি যদি আগ্রাবাদ মা ও শিশু হাসপাতালে যান। সেখানেও একই চিত্র। এমনকি ঢাকার সব হাসপাতালেও একই চিত্র দেখা যাবে।
ভাড়া ৩০ শতাংশ বাড়লেও তেলের দাম সে পরিমাণ বাড়েনি এবং কিছু অ্যাম্বুলেন্স গ্যাসে চলে। গ্যাসচালিত অ্যাম্বুলেন্সগুলোও বর্ধিত ভাড়া নেবে কি না জানতে চাইলে তিনি বলেন, এ বিষয়ে সিদ্ধান্ত হয়নি। পরোক্ষণে তিনি বলেন, গ্যাসচালিত গাড়ি ১০ শতাংশের বেশি হবে না। বাকিগুলো ডিজেলচালিত।