নদীমাতৃক বরিশাল বিভাগের মানুষের যাতায়াতের প্রধান ভরসা নৌপথ। অথচ সেই নৌপথেই প্রতিবছর বিভিন্ন দুর্ঘটনায় ঝরে যাচ্ছে প্রাণ। বরিশাল-ঢাকা নৌরুটে চলাচলকারী অধিকাংশ নৌযানে নেই আধুনিক রাডার, ফগ লাইট বা উন্নত নেভিগেশন ব্যবস্থা। এ ছাড়া দুর্ঘটনার সময় যাত্রীদের জীবন রক্ষায় প্রয়োজনীয় উপকরণের ঘাটতির পাশাপাশি আধুনিক নেভিগেশন যন্ত্র ব্যবহারে চালকদের দক্ষতারও অভাব রয়েছে। ফলে এই রুটে হাজারও যাত্রী মারাত্মক ঝুঁকি নিয়েই যাতায়াত করছেন।
বাংলাদেশ অভ্যন্তরীণ নৌপরিবহন কর্তৃপক্ষের (বিআইডব্লিউটিএ) তথ্যমতে, গত পাঁচ বছরে বরিশাল বিভাগের নদীগুলোতে তিন শতাধিক নৌ-দুর্ঘটনা ঘটেছে। এসব দুর্ঘটনায় প্রাণ হারিয়েছেন প্রায় ৪০০ মানুষ। পরিসংখ্যান অনুযায়ী, ২০২১ সালে ৬৫টি দুর্ঘটনায় ১১০ জন, ২০২২ সালে ৬৪টি দুর্ঘটনায় ৬৮ জন, ২০২৩ সালে ৬২টি দুর্ঘটনায় ৬২ জন, ২০২৪ সালে ৫৫টি দুর্ঘটনায় ৬৩ জন এবং ২০২৫ সালে ৪৭টি দুর্ঘটনায় ৬৩ জন নিহত হয়েছেন।
নৌযানের চালক ও কর্মীরা জানান, অভ্যন্তরীণ নৌরুটের বড় একটি অংশ এখনো চলছে পুরোনো ও ঝুঁকিপূর্ণ প্রযুক্তিতে। অধিকাংশ নৌযানে নেই আধুনিক রাডার, ফগ লাইট বা উন্নত নেভিগেশন ব্যবস্থা। ফলে কুয়াশায় দিক নির্ণয় কঠিন হয়ে পড়ে।
তারা বলেন, পদ্মা সেতু চালুর পর নৌপথে যাত্রীর সংখ্যা কমে যাওয়ায় লঞ্চ মালিকরা অনেক ক্ষেত্রে উন্নত প্রযুক্তি সংযোজনে আগ্রহ দেখাচ্ছেন না। তাই বর্ষা ও শীত মৌসুমে যাত্রীচাপ বাড়লেও ঝুঁকি নিয়ে লঞ্চ চলাচল করতে হচ্ছে।
এমভি সুন্দরবন লঞ্চের মাস্টার মিজানুর রহমান বলেন, ‘রাতের নদীপথে সবচেয়ে বড় হুমকি বালু বোঝাই অবৈধ বাল্কহেড। শীত মৌসুমে নাব্যতা কমে যাওয়ার সঙ্গে ঘন কুয়াশা যোগ হলে পরিস্থিতি আরও ভয়াবহ হয়ে ওঠে। অনেক জায়গায় নৌপথ নির্দেশনার বয়া অকেজো হয়ে আছে।’
লঞ্চের সুকানী আল-আমিন বলেন, ‘দক্ষ চালকের অভাব নৌপথের অন্যতম বড় সমস্যা। অনেক চালক নিয়মমাফিক প্রশিক্ষণ ছাড়াই ভিন্ন উপায়ে লাইসেন্স সংগ্রহ করেন। দ্রুত গন্তব্যে পৌঁছানোর অসুস্থ প্রতিযোগিতাও দুর্ঘটনার ঝুঁকি বাড়িয়ে দিচ্ছে।’
বরিশাল নদীবন্দরের নৌ-নিরাপত্তা ও ট্রাফিক ব্যবস্থাপনা বিভাগের সহকারী পরিচালক মোহাম্মদ সলেমান বলেন, ‘লঞ্চের ফিটনেস, নিরাপত্তা সরঞ্জাম ও চালকদের দক্ষতা যাচাই করেই চলাচলের অনুমতি দেওয়া হয়। নিয়ম ভাঙার ঘটনা রোধে নিয়মিত অভিযান চালানো হচ্ছে।’
নৌ-পুলিশ বরিশাল জোনের অতিরিক্ত পুলিশ সুপার মো. মোস্তফা কামাল বলেন, ‘সীমিত জনবল ও সরঞ্জাম নিয়ে কাজ করলেও নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে সর্বোচ্চ চেষ্টা চলছে। তবে চালক ও মালিকপক্ষের সচেতনতা এবং আধুনিক প্রযুক্তির ব্যবহার ছাড়া এই সংকট কাটানো কঠিন।’
গত ২৫ ডিসেম্বর মেঘনা ও বুড়িগঙ্গা নদীতে ঘটে যাওয়া দুটি লঞ্চ দুর্ঘটনার পর নৌ-পরিবহন মন্ত্রণালয়ের উপদেষ্টা ব্রিগেডিয়ার জেনারেল (অব.) ড. এম সাখাওয়াত হোসেন বলেন, ‘চালকদের দক্ষতা নিয়ে প্রশ্ন রয়েছে। সব লঞ্চকে ট্র্যাকিং ব্যবস্থার আওতায় আনা হবে এবং প্রয়োজনে আইন সংশোধন করা হবে।’