কক্সবাজারের পেকুয়া উপজেলায় এলপিজি গ্যাসের বাজার এখন পুরোপুরি অসাধু সিন্ডিকেটের নিয়ন্ত্রণে। সরকার নির্ধারিত মূল্যের তোয়াক্কা না করে ডিলার ও খুচরা বিক্রেতারা সাধারণ মানুষকে জিম্মি করে কোটি কোটি টাকা হাতিয়ে নিচ্ছে। উপজেলার কোথাও গ্যাস মিলছে না, আবার কোথাও মিললেও সিলিন্ডার প্রতি দিতে হচ্ছে ১৬৫০ থেকে ১৭০০ টাকা, যা সরকার নির্ধারিত ১৩৫৫ টাকার চেয়ে অন্তত ২৯৫ থেকে ৩৪৫ টাকা বেশি।
অনুসন্ধানে দেখা গেছে, কৃত্রিম সংকট তৈরি করে এই বিশাল অঙ্কের টাকা সাধারণ মানুষের পকেট থেকে কেটে নেওয়া হচ্ছে।
মাঠপর্যায়ের ভয়াবহ চিত্র:
সরেজমিনে পেকুয়া উপজেলার বিভিন্ন ইউনিয়নের বাজার ঘুরে দেখা গেছে, অধিকাংশ খুচরা দোকানে ‘গ্যাস নেই’ লেখা থাকলেও বিক্রেতারা বলছেন আগে থেকে জানিয়েছেন। সাধারণ ক্রেতারা এক সিলিন্ডার গ্যাসের জন্য হন্যে হয়ে ঘুরছেন। কোনো কোনো দোকানে মজুত দেখা গেলেও বিক্রেতারা জানাচ্ছেন, ‘এগুলো আগে অর্ডার দেওয়া গ্রাহকদের জন্য।’ তবে অভিযোগ রয়েছে, পরিচিত লোক বা বাড়তি টাকা দিলে ভেতর থেকে সিলিন্ডার বের করা হয়। বর্তমানে উপজেলার প্রায় ৯৫ শতাংশ মানুষ গ্যাসের ওপর নির্ভরশীল, যার কারণে এই কৃত্রিম সংকটে জনজীবন বিপর্যস্ত হয়ে পড়েছে।
ডিলারদের লুকোচুরি ও অসংলগ্ন বক্তব্য:
পেকুয়ায় ৪-৫ জন ডিলার পুরো গ্যাস ব্যবসা নিয়ন্ত্রণ করছেন। বারবাকিয়া বাজারের ‘ভাই ভাই গ্যাস’ ডিলারের গোডাউনে বিএম, ওমেরা ও পেট্রোম্যাক্সের শত শত সিলিন্ডার মজুত থাকলেও ডিলার মো. ইসহাক স্বীকার করেন, তিনি ১৪০০ থেকে ১৫০০ টাকায় গ্যাস বিক্রি করছেন। বাড়তি দামের জন্য তিনি এলসি জটিলতা ও পরিবহন খরচের অজুহাত দিলেও বিপুল মজুত থাকা সত্ত্বেও ক্রেতাদের ফিরিয়ে দেওয়ার কোনো সদুত্তর দিতে পারেননি।
ইসহাক আরও বলেন, ‘সিলিন্ডারের জন্য গাড়ি গেলে দুই-তিন দিন বা একদিন বসে থাকতে হয় গ্যাস না পাওয়ার কারণে, যার ফলে গাড়ি ভাড়া একটু বাড়তি লাগে।’
অন্যদিকে, পেকুয়া চৌমুহনীর ‘মাম্মি এন্টারপ্রাইজ’-এর দোকানে গিয়ে দেখা যায় রহস্যজনক পরিস্থিতি। অফিসের ভেতর লোক থাকলেও গেট ভেতর থেকে তালাবদ্ধ। দীর্ঘক্ষণ ডাকার পরও তারা দরজা খোলেননি। দোকানের সামনে দাঁড়ানো পিকআপ গাড়ির ড্রাইভার থেকে তবারকের নাম্বার নিয়ে ফোন করা হলে তিনি বলেন, ‘আমি বিশ্রামে আছি।’ পরের দিন সকালে আবার কল করলে তিনি জানান, তারা সরকারি দামেই গ্যাস বিক্রি করছেন। খুচরা বিক্রেতাদের অভিযোগের দায় নিতে নারাজ এই ডিলার প্রতিষ্ঠান।
কোম্পানি কর্মকর্তাদের এড়িয়ে যাওয়ার প্রবণতা:
পেট্রোম্যাক্স ও ওমেরার (আই গ্যাস) মার্কেটিং কর্মকর্তাদের সঙ্গে যোগাযোগ করা হলে তারা ডিলারদের সরকারি দামেই গ্যাস দেওয়ার দাবি করেন। তবে অতিরিক্ত দামের বিষয়ে বিস্তারিত কথা বলতে রাজি হননি। অফিসের নাকি নিষেধ আছে গণমাধ্যমের সঙ্গে কথা বলতে।
উপজেলা প্রতিনিধি হিসেবে আমার কার্যপরিধি সীমিত। তবে পেট্রোম্যাক্সের মার্কেটিং অফিসার আমাকে ঢাকা অফিসের সঙ্গে যোগাযোগ করার পরামর্শ দিয়েছেন। কিছুটা দ্বিধা ও ভয় থাকা সত্ত্বেও অধিকতর তদন্তের জন্য পেট্রোম্যাক্স এলপিজির পরিচালক (আইন ও কমপ্লায়েন্স) আমিরুল ইসলামকে কল করা হলে তিনি মিটিংয়ে আছেন জানিয়ে ১০ মিনিট পর কথা বলবেন বলে জানান। পরবর্তীতে বারবার চেষ্টা করা হলেও তিনি আর সাড়া দেননি। পরে তিনি যোহরের পরে ফোন করে বলেন, ‘বর্তমানে অনেক কোম্পানি এলসি করছেন না। তবে আমরা গ্রাহকদের ভোগান্তি কমাতে আগের তুলনায় সিলিন্ডার সরবরাহ বাড়িয়েছি। সরকার নির্ধারিত সঠিক দামেই বিক্রি করছি। সরবরাহে কোনো ঘাটতি নেই; বরং ডিস্ট্রিবিউশন পর্যায়ে কেউ হয়তো কৃত্রিম সংকট তৈরি করে কারসাজি করছে।’
সিন্ডিকেট ও সাধারণ মানুষের ক্ষোভ:
কোম্পানি কর্মকর্তাদের এমন এড়িয়ে যাওয়ার প্রবণতা সিন্ডিকেটের সঙ্গে তাদের যোগসাজশের সন্দেহকে আরও প্রবল করেছে। পেকুয়ায় গ্যাসের এই অরাজকতা নিয়ে সাধারণ মানুষের মধ্যে তীব্র ক্ষোভ বিরাজ করছে। এই সিন্ডিকেট ভাঙতে প্রশাসনের কঠোর হস্তক্ষেপ এখন সময়ের দাবি।
পেকুয়া উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) মাহাবুর রহমান মাহবুব বলেন, ‘গ্যাসের এই অস্থিরতা ও সিন্ডিকেটের বিষয়ে আমরা নিয়মিত নজর রাখছি। সাধারণ মানুষকে জিম্মি করে ব্যবসা করার সুযোগ নেই। বড় ধরনের বিশেষ অভিযান বা মোবাইল কোর্ট পরিচালনার প্রস্তুতি নিচ্ছি। সিন্ডিকেট ভাঙতে কোনো ছাড় দেওয়া হবে না।’
কক্সবাজার জেলা ভোক্তা অধিকার সংরক্ষণ অধিদপ্তরের সহকারী পরিচালক মো. হাসান-আল-মারুফ বলেন, ‘মাম্মি এন্টারপ্রাইজকে আমরা একাধিকবার জরিমানা করেছি। মাঝেমধ্যে তারা সরকার নির্ধারিত দামের চেয়ে বেশি দামে গ্যাস সিলিন্ডার বিক্রি করার চেষ্টা করেছে, তবে ভাউচার বা বৈধ কাগজপত্র দেখাতে চায় না। বিষয়টি আমরা গুরুত্বের সঙ্গে দেখছি এবং শিগগিরই আবার অভিযান পরিচালনা করব।’
অন্যদিকে পেকুয়ার এক গৃহিণী, মহিমিনা ফারেসা বলেন, ‘সরকার গ্যাস সিলিন্ডারের নির্ধারিত মূল্য ঘোষণা করলেও অনেক দোকানদার তা মানছেন না। ফলে আমাদের ১,৭০০ টাকা পর্যন্ত দিয়ে গ্যাস কিনতে হচ্ছে। এতে সাধারণ মানুষ চরম ভোগান্তিতে পড়ছেন।’
রকিবুল/রিফাত/