পটুয়াখালীর পর্যটনকেন্দ্র কুয়াকাটা সমুদ্রসৈকতের বিভিন্ন এলাকায় হঠাৎ করেই বিপুল পরিমাণ মৃত জেলিফিশ ভেসে আসতে দেখা গেছে। সৈকতের বিস্তীর্ণ বালুচরে ছড়িয়ে-ছিটিয়ে থাকা এসব জেলিফিশ স্থানীয়দের দৃষ্টি কাড়ার পাশাপাশি জেলেদের মাঝে উদ্বেগ তৈরি করেছে। বিশেষ করে সাগরে মাছ ধরতে গিয়ে জালে বারবার জেলিফিশ আটকা পড়ায় চরম ভোগান্তির মুখে পড়েছেন তারা। এতে মাছ ধরা ব্যাহত হওয়ায় তাদের আয় নিয়ে অনিশ্চয়তা দেখা দিয়েছে।
গতকাল শনিবার দুপুরে কুয়াকাটা সৈকতের অনেক জায়গায় ঢেউয়ের সঙ্গে ভেসে আসা একাধিক জেলিফিশ বালুচরে স্তূপ হয়ে জমে থাকতে দেখা গেছে। স্থানীয় জেলে ও বাসিন্দারা বলছেন, গত কয়েক দিনের জোয়ার-ভাটার স্রোতের সঙ্গে এসব জেলিফিশ উপকূলে এসে ভিড়ছে। ফলে সমুদ্রের কাছাকাছি এলাকায় মাছ ধরতে গিয়ে জাল ফেললেই প্রচুর জেলিফিশ উঠছে, যা জেলেদের জন্য বাড়তি ভোগান্তির কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে।
স্থানীয় জেলেদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, এর আগেও গত জানুয়ারির প্রথম সপ্তাহে কয়েক দিন ধরে কুয়াকাটার উপকূলে বিপুল পরিমাণ জেলিফিশ ভেসে এসেছিল। তবে এবার সংখ্যার দিক থেকে তা আরও বেশি বলে জানিয়েছেন তারা।
স্থানীয় জেলে ওসমান গনি বলেন, ‘জেলিফিশ এত পরিমাণে বেড়েছে যে জাল ফেললেই জেলিফিশ ওঠে। এতে জাল টানা যায় না। ফলে মাছও পাওয়া যাচ্ছে না। আমরা অর্থনৈতিকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছি। এগুলো ধরলে হাত-পা চুলকায়।’
পরিবেশ ও মৎস্য বিশেষজ্ঞদের ধারণা, গভীর সাগরে মাছ ধরার ট্রলার ও মা-চিংড়ি ধরার জাহাজের জালে আটকা পড়ে বিপুল পরিমাণ জেলিফিশ মারা যেতে পারে। মৃত্যুর পর জোয়ারের পানির সঙ্গে সেগুলো উপকূল ও সৈকতে ভেসে আসছে। এ ছাড়া সমুদ্রের পানির তাপমাত্রা বৃদ্ধি, লবণাক্ততার তারতম্য ও অক্সিজেনের ঘাটতিও জেলিফিশের মৃত্যুর অন্যতম কারণ হতে পারে বলে মনে করছেন বিশেষজ্ঞরা। তবে জেলেদের বক্তব্য ভিন্ন। তাদের মতে, সাগরের পানিতে লবণাক্ততা বেড়ে যাওয়ায় এবং বয়সের ভারে স্রোতের বিপরীতে চলতে না পেরে অনেক জেলিফিশ মারা যাচ্ছে।
বাংলাদেশ জীববৈচিত্র্য সংরক্ষণ ফেডারেশনের (বিবিসিএফ) কেন্দ্রীয় কার্যনির্বাহী কমিটির সহসাংগঠনিক সম্পাদক কে এম বাচ্চু বলেন, ‘অবৈধ জালের ব্যবহার এবং সামুদ্রিক বাস্তুতন্ত্রের ভারসাম্য নষ্ট হওয়ায় এমন পরিস্থিতি তৈরি হচ্ছে। দ্রুত প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা না নিলে সামুদ্রিক জীববৈচিত্র্যের ওপর এর নেতিবাচক প্রভাব পড়বে।’
বরিশাল থেকে ঘুরতে আসা পর্যটন রাজিব হাসান বলেন, ‘জেলিফিশ পড়ে থাকার কারণে সৈকতে দুর্গন্ধ ছড়াচ্ছে। এতে করে সৈকতে বেশিক্ষণ থাকা কষ্টকর হচ্ছে। এগুলো দ্রুত সরিয়ে ফেলা উচিত।’
কলাপাড়া উপজেলার সিনিয়র মৎস্য কর্মকর্তা অপু সাহা বলেন, ‘কয়েক দিন ধরে এসব জেলিফিশ উপকূলের কাছাকাছি এসে জেলেদের জালে আটকা পড়ছে। পরে জেলেরা এগুলো ফেলে দেওয়ায় মৃত জেলিফিশ কুয়াকাটা সৈকতে আসতে শুরু করেছে। জেলিফিশ সমুদ্রে বেড়ে যাওয়ায় সমুদ্র থেকে বর্তমানে জেলেরা জাল উঠিয়ে রাখছেন। প্রয়োজনে সমুদ্রে জরিপ চালিয়ে প্রকৃত কারণ অনুসন্ধান করা হবে।’
পটুয়াখালী বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের মৎস্যবিজ্ঞান অনুষদের সহযোগী অধ্যাপক ও সামুদ্রিক জীববিজ্ঞান গবেষক ড. মো. সাইফুল ইসলাম বলেন, জলবায়ু পরিবর্তন ও মানবসৃষ্ট নানা কর্মকাণ্ডের প্রভাবেই এ ধরনের অস্বাভাবিক ঘটনা ঘটতে পারে।