ঈদের লম্বা ছুটি কাটিয়ে কর্মস্থলে ফিরতে শুরু করেছেন দক্ষিণবঙ্গের মানুষ। ছুটি শেষে কর্মজীবীদের বড় অংশ একসঙ্গে ফেরায় বরিশালের লঞ্চঘাট ও কেন্দ্রীয় বাসটার্মিনালে সৃষ্টি হয়েছে তীব্র চাপ। কেবিন, ডেক কিংবা বাস কোনোটিতেই সহজে মিলছে না টিকিট। সাধারণ যাত্রীদের কাছে একটি টিকিট এখন যেন ‘সোনার হরিণ’।
বরিশাল লঞ্চঘাটে গিয়ে দেখা যায়, ঢাকাগামী বিভিন্ন লঞ্চ নোঙর করেছে। দুপুরের আগেই বেশির ভাগ লঞ্চের ডেক যাত্রীতে পূর্ণ হয়ে গেছে। পরিবার-পরিজন নিয়ে আগেভাগে এসে যাত্রীরা বিছানা-চাদর বিছিয়ে জায়গা দখল করছেন। ফলে নতুন যাত্রীরা জায়গা না পেয়ে চরম ভোগান্তিতে পড়ছেন।
অনেকে ডেকে বসার জায়গা না পেয়ে ছাদ, সিঁড়ির পাশে, করিডোর বা খোলা জায়গায় অবস্থান করছেন। যাত্রীরা অভিযোগ করেছেন, নির্ধারিত আসনের বাইরে অতিরিক্ত জায়গা দখলে রেখে বিক্রি করা হচ্ছে। লঞ্চ কর্মচারীরা বাড়তি টাকা নিচ্ছেন।
এমভি মানামী লঞ্চের যাত্রী মো. আহসান উল্লাহ বলেন, ‘দুপুরে ঘাটে এসে দেখি ডেকের প্রায় পুরো অংশ দখল করা। পরে দুজনের জন্য ছয় ফুট জায়গা ৪০০ টাকায় নিতে হয়েছে।’ কীর্তনখোলা লঞ্চের যাত্রী মহিউদ্দিন আহমেদ বলেন, ‘ডেকে জায়গা না পেয়ে বাধ্য হয়ে ছাদে বসেছি।’ পারাবাত লঞ্চের মিন্টু সরদার জানান, ফ্যানের নিচের জায়গা আগে থেকেই দখল করা ছিল, ৩০০ টাকায় জায়গা নিতে হয়েছে। সুন্দরবন-১০ লঞ্চের যাত্রী সাওখাত হোসেন কেবিন-ডেক কোথাও জায়গা না পেয়ে সিঁড়ির নিচে বসেছেন।
অভিযোগের বিষয়ে এমভি পারাবাতের ব্যবস্থাপক সেলিম হোসেন বলেন, ‘যাত্রীরা নিজেরাই আগে এসে জায়গা দখল করছেন। কেউ অনিয়ম করলে ব্যবস্থা নেওয়া হবে।’ সুন্দরবন লঞ্চের কাউন্টার ব্যবস্থাপক জাকির হোসেন জানান, ঈদের পর যাত্রীর চাপ বেশি থাকে। কেবিনের টিকিট আগেই শেষ হয়ে গেছে। শুক্রবার ও শনিবার আরও বেশি চাপ থাকবে। কারণ অনেক কর্মজীবী অতিরিক্ত ছুটি নিয়ে ফিরছেন।
এদিকে নৌপরিবহন প্রতিমন্ত্রী রাজীব আহসান গত সোমবার রাতে বরিশাল নৌবন্দর পরিদর্শন করেন। তিনি যাত্রীদের সঙ্গে কথা বলে পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণ করেন এবং লঞ্চের বিভিন্ন সুবিধা-অসুবিধা সম্পর্কে খোঁজ নেন। পরে সাংবাদিকদের তিনি বলেন, ‘এবারের ঈদযাত্রায় তুলনামূলকভাবে কম দুর্ভোগের হয়েছে। অনেক ক্ষেত্রে ভাড়া কম নেওয়া হচ্ছে। লঞ্চে নির্ধারিত ১০ শতাংশ ভাড়া কমানোর নির্দেশ কার্যকর আছে কি না, যাচাই করা হচ্ছে।’
প্রতিমন্ত্রী আরও জানান, যাত্রী ডাকা বা টানাহেঁচড়া বন্ধে বিআইডব্লিউটিএ-কে নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে। কোনো লঞ্চে অতিরিক্ত যাত্রী নেওয়া বা জোরপূর্বক উঠানোর অভিযোগ পেলে ব্যবস্থা নেওয়া হবে। টার্মিনাল ব্যবস্থাপনা উন্নত করতেও নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে।
বরিশাল নদীবন্দর কর্মকর্তা সেলিম রেজা বলেন, ‘ঈদযাত্রা নিরাপদ করতে নৌপুলিশ, ফায়ার সার্ভিস, মেট্রোপলিটন পুলিশ ও ভ্রাম্যমাণ আদালত সমন্বিতভাবে কাজ করছে। অতিরিক্ত ভাড়া ও অনিয়ম রোধে লঞ্চ কর্তৃপক্ষকে সতর্ক করা হয়েছে। অভিযোগ পেলে ব্যবস্থা নেওয়া হবে।’
অন্যদিকে বরিশাল কেন্দ্রীয় বাসটার্মিনালেও একই চিত্র দেখা গেছে। বরিশাল বিভাগের বিভিন্ন জেলা থেকে প্রতিদিন গড়ে দুই হাজারের বেশি বাস ঢাকাসহ বিভিন্ন স্থানে ছেড়ে যায়। ঈদের পর কর্মস্থলে ফেরা যাত্রীদের চাপ বেড়ে যাওয়ায় বাসের টিকিট পাওয়া কঠিন হয়ে পড়েছে।
সকাল থেকেই বাস কাউন্টারগুলোতে ভিড় দেখা যায়। সকালেই টিকিট শেষ হয়ে যাচ্ছে। ফলে অনেকে দালাল ও কালোবাজারিদের কাছ থেকে বেশি দামে টিকিট কিনতে বাধ্য হচ্ছেন।
বাসযাত্রী শাজাহান মিয়া বলেন, ‘সকাল ৬টায় এসে কাউন্টার থেকে টিকিট পাইনি, পরে দালালের কাছ থেকে নিতে হয়েছে।’ আরেক যাত্রী সব্বির হোসেন জানান, কালোবাজার থেকে চারটি টিকিট সংগ্রহ করেছেন, প্রতিটিতে ২০০ টাকা বেশি দিতে হয়েছে।
বরিশাল বাস মালিক গ্রুপের সভাপতি মোশাররফ হোসেন বলেন, ‘অনলাইন টিকিটিংয়ের কারণে আগে থেকেই বেশির ভাগ টিকিট বুক হয়ে যায়। ফলে কাউন্টারে চলমান বাসের টিকিট পাওয়া যায় না। কালোবাজারি রোধে মালিক সমিতি ও আইনশৃঙ্খলা বাহিনী কাজ করছে।’