গাইবান্ধা সদর উপজেলা সীমান্ত এলাকায় চিকিৎসার জন্য গড়ে তোলা হয় ১০ শয্যা বিশিষ্ট হাসপাতাল। মানুষের কাছে এটি ‘বালুয়া হাসপাতাল’ নামেই পরিচিত। একসময় দুই উপজেলার হাজারও মানুষ এখানে চিকিৎসা নিতেন। কিন্তু সঠিক তদারকি ও অযত্নে জরাজীর্ণ হয়ে পড়েছে পল্লী স্বাস্থ্যকেন্দ্রটি। বর্তমানে চিকিৎসকের অভাবে এখানে সেবা বলতে কেবল জ্বর আর গ্যাসের বড়িই মেলে। ফলে হাতের কাছে হাসপাতাল থাকলেও চিকিৎসার জন্য স্থানীয়দের ছুটতে হচ্ছে ২০ কিলোমিটার দূরে।
হাসপাতালটি গাইবান্ধা শহর থেকে প্রায় ৮ কিলোমিটার দূরে, রামচন্দ্রপুর ইউনিয়নে অবস্থিত। পাশেই পলাশবাড়ী উপজেলার মনোহরপুর ইউনিয়ন। আশপাশে আর কোনো সরকারি স্বাস্থ্য সেবাকেন্দ্র নেই। ফলে রোগীদের ৮ থেকে ২০ কিলোমিটার দূরের উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্স বা জেলা শহরে যেতে হয়।
সরেজমিনে দেখা গেছে, হাসপাতালের অবকাঠামো অত্যন্ত জরাজীর্ণ। ভবনের দেয়ালে ফাটল ধরেছে। স্যাঁতস্যাঁতে দেয়াল থেকে পলেস্তারা খসে পড়ছে। আবাসিক ভবনগুলোর অবস্থাও একই রকম। রোগীদের ব্যবহারের বেডগুলো এলোমেলোভাবে পড়ে আছে। শৌচাগার ব্যবহারের অযোগ্য। হাসপাতাল চত্বরে পড়ে আছে মূল্যবান গাছের গুঁড়ি। নিরাপত্তার অভাবে সেখানে গবাদিপশু ঘোরাফেরা করছে। স্থানীয়দের অভিযোগ, রাতে সেখানে মাদকসেবীদের আড্ডা বসে।
চিকিৎসাব্যবস্থাও সীমিত হয়ে পড়েছে। হাসপাতালে কোনো চিকিৎসক নেই। দুটি কক্ষে তিনজন নার্স রোগীদের ওষুধ দিচ্ছেন। পাশের একটি কক্ষে একজন উপসহকারী কমিউনিটি মেডিকেল অফিসার রোগী দেখছেন। তবে এখানে শুধু সাধারণ ওষুধ, যেমন গ্যাস বা জ্বরের চিকিৎসাই পাওয়া যায়।
সিভিল সার্জন অফিস সূত্রে জানা গেছে, ১৯৬২ সালে ৫ একর জমির ওপর হাসপাতালটি নির্মাণ করা হয়। এটি ছিল ১০ শয্যার হাসপাতাল। পরে রাজস্বসংক্রান্ত জটিলতায় ২০০৮ সালে ইনডোর সেবা বন্ধ হয়ে যায়। পরে এটি পল্লী স্বাস্থ্যকেন্দ্র হিসেবে আউটডোরে রোগী দেখা শুরু হয়।
বর্তমানে দুজন চিকিৎসকের পদ থাকলেও দুটিই শূন্য। অনুমোদিত জনবলের মধ্যে রয়েছে চারজন নার্স, দুইজন সহকারী নার্স, চারজন অফিস সহায়ক, দুইজন ওয়ার্ডবয়, একজন বাবুর্চি, একজন এমটি ল্যাব টেকনিশিয়ান ও একজন ফার্মাসিস্ট। মোট ১৭ জন জনবল থাকলেও নিয়মিত কাজ করেন মাত্র ১০ জন। বাকিরা গাইবান্ধা জেনারেল হাসপাতালসহ বিভিন্ন স্থানে স্বাস্থ্যকেন্দ্রে কাজ করেন।
ওষুধ নিতে আসা জবেদা বেগম (৫০) বলেন, ‘একসময় এখানে হাজারও মানুষ সেবা নিতে আসত। জরুরি অসুস্থ রোগীরা ভর্তি হয়ে চিকিৎসা নিত। এখন গ্যাস আর জ্বরের বড়ি ছাড়া কিছুই পাওয়া যায় না।’
রহমতপুর গ্রামের অটোরিকশাচালক আনোয়ার হোসেন বলেন, ‘আশপাশে আর কোনো হাসপাতাল নেই। আগে বালুয়া হাসপাতালেই গর্ভবতী মা ও শিশুসহ সাধারণ মানুষ চিকিৎসা নিত। এখন কেউ অসুস্থ হলে ১০ কিলোমিটার দূরে গাইবান্ধা জেনারেল হাসপাতালে যেতে হয়।’
রামচন্দ্রপুর ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান মোসাব্বির হোসেন হাসপাতালটি পুনরায় চালুর দাবি জানিয়ে বলেন, ‘বর্তমানে দুজন মেডিকেল অফিসারের একজনও নেই। সিভিল সার্জনসহ সংশ্লিষ্ট দপ্তরে যোগাযোগ করা হচ্ছে। হাসপাতালটির কার্যক্রম সঠিকভাবে চালু হলে এলাকার হাজারও মানুষ উপকৃত হবে এবং জেলা সদর হাসপাতালের চাপ কমবে।’
হাসপাতালের চত্বরে রাতে মাদকসেবীদের আড্ডা বন্ধের দাবি জানিয়ে গাইবান্ধা পরিবেশ ক্লাবের সভাপতি গোলাম রাব্বানী মুসা বলেন, যেখানে একসময় মানুষ সেবা পেত, আজ সেখানে অসামাজিক কর্মকাণ্ড হচ্ছে। প্রায় ৫ একর জমি পড়ে আছে। সরকার চাইলে হাসপাতালটি পুনরায় চালু অথবা অন্য কোনো উন্নয়ন কাছে ব্যবহার করতে পারে। এভাবে শুধু এলাকার পরিবেশ নষ্ট হচ্ছে।’
এ বিষয়ে জেলা সিভিল সার্জন ডা. মো. রফিকুজ্জামান জানান, হাসপাতালটির ইনডোর সার্ভিস অনেক আগে বন্ধ হলেও আউটডোর চালু আছে। পূর্ণাঙ্গ কার্যক্রম চালুর জন্য ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের কাছে লিখিত প্রতিবেদন পাঠানো হয়েছে।