মিয়ানমার থেকে নির্যাতনের মুখে বাংলাদেশে আশ্রয় নেওয়া রোহিঙ্গাদের একটি অংশ এখন আশ্রয়ক্যাম্প ছেড়ে গোপনে দেশের বিভিন্ন এলাকায় ছড়িয়ে পড়ার চেষ্টা করছে। দালালচক্রের সহায়তায় সাগরপথ ব্যবহার করে তারা চট্টগ্রামের আনোয়ারার পারকি সমুদ্র সৈকত ও কর্ণফুলী টানেলসংলগ্ন উপকূলীয় এলাকাকে ‘নিরাপদে নামার পয়েন্ট’ হিসেবে ব্যবহার করছে বলে স্থানীয়রা অভিযোগ করেছেন।
এলাকাবাসী ও আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর একাধিক সূত্র জানায়, গত এক বছরের বেশি সময় ধরে পারকি সমুদ্র সৈকত, কর্ণফুলী টানেল সার্ভিস এরিয়া, রায়পুর চুন্নাপাড়া ও রাঙ্গাদিয়া মাছের চরসহ উপকূলের বিভিন্ন নির্জন পয়েন্টে মাঝেমধ্যেই ইঞ্জিনচালিত নৌকায় করে রোহিঙ্গাদের নামানো হচ্ছে। পরে তারা ছোট ছোট দলে ভাগ হয়ে সিএনজিচালিত অটোরিকশায় বিভিন্ন এলাকায় চলে যাচ্ছে।
সর্বশেষ গত শুক্রবার ভোরে পারকি সমুদ্র সৈকতে শিশু ও নারীসহ প্রায় ২০ জন রোহিঙ্গার একটি দল আসে। সকাল ১০টার দিকে কর্ণফুলী ফার্টিলাইজার কোম্পানি লিমিটেড (কাফকো) ও কর্ণফুলী টানেল এলাকার আশপাশে কাঁদামাখা অবস্থায় ঘোরাফেরা করতে দেখে স্থানীয়রা তাদের আটক করেন।
তবে আটক হওয়া ব্যক্তিদের বিষয়ে আনোয়ারা ও কর্ণফুলী থানা পুলিশের পক্ষ থেকে নির্দিষ্ট কোনো তথ্য নিশ্চিত করা যায়নি। স্থানীয়দের দাবি, অনেক ক্ষেত্রে পুলিশ বিষয়টিকে ঝামেলা মনে করে সক্রিয়ভাবে এগোয় না। পরে স্থানীয়রা আটক রোহিঙ্গাদের সেনাবাহিনী, নৌবাহিনী ও কোস্টগার্ডের কাছে হস্তান্তর করলে সংশ্লিষ্ট বাহিনী তাদের আশ্রয়ক্যাম্পে ফেরত পাঠায়।
রোহিঙ্গা আটকের একটি ভিডিও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়ে। ১ মিনিট ২৯ সেকেন্ড দৈর্ঘ্যের এই ভিডিওতে এক রোহিঙ্গা যুবককে বলতে শোনা যায়, ‘ভাসানচর ক্যাম্প থেকে পালিয়ে এসেছি। ওখানে গ্যাস নেই। পরিবার থেকে বিচ্ছিন্ন হওয়ার কারণে কক্সবাজারের ক্যাম্পে যাওয়ার উদ্দেশ্যে এ পথে এসেছি।’
প্রত্যক্ষদর্শী স্থানীয় বাসিন্দা জাহেদুল আলম বলেন, ‘শুক্রবার সকালে শরীরে কাঁদামাখা নারী-শিশুসহ প্রায় ২০ জনকে সন্দেহজনকভাবে ঘোরাফেরা করতে দেখি। কথা বললে তারা জানায়, ভাসানচর আশ্রয়ক্যাম্প থেকে পালিয়ে এসেছে। পরে পুলিশ ফাঁড়িতে নিতে চাইলে তারা যেতে রাজি হয়নি এবং সেখান থেকে চলে যায়।’
আরেক স্থানীয় বাসিন্দা এম. লোকমান শাহ বলেন, ‘মানবিক কারণে আশ্রয় দেওয়া হলেও নিয়ন্ত্রণহীনভাবে ক্যাম্প ছাড়ার প্রবণতা নিরাপত্তা ঝুঁকি তৈরি করছে। কয়েক বছর ধরে সাগরপথে পারকি সৈকত ও টানেল এলাকার বিভিন্ন পয়েন্ট দিয়ে লোকালয়ে প্রবেশের ঘটনা ঘটছে। এসব এলাকায় কঠোর নজরদারি জরুরি।’
এ বিষয়ে জানতে চাইলে কর্ণফুলী থানার বন্দর পুলিশ ফাঁড়ির ইনচার্জ আবদুল্লাহ আল নোমান বলেন, ‘রোহিঙ্গা আসার বিষয়ে এখনো আমাদের কাছে নিশ্চিত কোনো তথ্য নেই।’
আনোয়ারা থানার ওসি জুনায়েত চৌধুরী ও কর্ণফুলী থানার ওসি শাহীনূর আলমের সঙ্গে কথা হয় প্রতিবেদকের। তাদের কারো কাছেই রোহিঙ্গা আসার কোনো তথ্য নেই বলে জানিয়েছেন তারা। তবে বিষয়টি নিয়ে খোঁজ নেওয়ার আশ্বাস দিয়েছেন তারা।
এই পথ ব্যবহার করে রোহিঙ্গা আসার ঘটনা নতুন নয়। সংবাদমাধ্যম সূত্রে জানা যায়, ২০২৫ সালের ১৬ সেপ্টেম্বর টানেল সার্ভিস এরিয়া থেকে ভাসানচর থেকে পালিয়ে আসা ৩১ জন রোহিঙ্গাকে আটক করা হয়। চলতি বছরের ২২ জানুয়ারি রায়পুর চুন্নাপাড়া এলাকা থেকে শিশুসহ ৭ রোহিঙ্গা আটক হয়। এর আগেও বিভিন্ন সময়ে কর্ণফুলী টানেল সার্ভিস এরিয়া ও পারকি সমুদ্র সৈকত এলাকা থেকে রোহিঙ্গাদের স্থানীয়রা আটক করে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর কাছে হস্তান্তর করেন।