উচ্চশিক্ষার স্বপ্ন নিয়ে যুক্তরাষ্ট্রে পাড়ি জমানো মেধাবী তরুণী নাহিদা সুলতানা বৃষ্টির মৃত্যুর খবরে মাদারীপুরের একটি পুরো গ্রাম আজ শোকে স্তব্ধ। যে মেয়েকে ঘিরে পরিবার বুনেছিল অসংখ্য স্বপ্ন, যে ছিল গ্রামের গর্ব আর আশার প্রতীক- তার অকাল ও মর্মান্তিক মৃত্যুতে নেমে এসেছে গভীর শোকের ছায়া।
শনিবার (২৫ এপ্রিল) বিকেলে মাদারীপুর সদর উপজেলার খোয়াজাপুর ইউনিয়নের চর গোবিন্দপুর গ্রামের এটিএম বাজার এলাকায় বৃষ্টির বাড়িতে গিয়ে দেখা যায়, শোক যেন গ্রামজুড়ে নীরবতার রূপ নিয়েছে। বাড়ির আঙিনায় আত্মীয়-স্বজন, প্রতিবেশী আর শুভাকাঙ্ক্ষীদের ভিড়; কিন্তু কারও মুখে কোনো শব্দ নেই। যেন সবাই নির্বাক হয়ে গেছে এক অবিশ্বাস্য দুঃসংবাদে।
নাহিদা সুলতানা বৃষ্টি ছিলেন পরিবারের ছোট সন্তান। বাবা জহির উদ্দিন আকন বহু বছর ধরে ঢাকার মিরপুরে বসবাস করছেন এবং একটি বিমা প্রতিষ্ঠানে ব্যবস্থাপক হিসেবে কর্মরত। বড় ভাই জাহিদ হাসান একজন প্রকৌশলী। সবার আদরের ছোট মেয়ে বৃষ্টি ছিলেন অত্যন্ত মেধাবী ও স্বপ্নবাজ।
পরিবার ও স্বজনরা জানান, মাত্র সাত মাস আগে নোয়াখালী বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয় থেকে পড়াশোনা শেষ করে উচ্চতর ডিগ্রির জন্য যুক্তরাষ্ট্রে যান বৃষ্টি। পরিবারের স্বপ্ন ছিল, মেয়েটি একদিন বড় কিছু করবে, দেশের মুখ উজ্জ্বল করবে। কিন্তু সেই স্বপ্ন ডানা মেলার আগেই থেমে গেল তার জীবন। মাত্র ২৩ বছর বয়সে নির্মমভাবে প্রাণ হারাতে হলো তাকে।
মৃত্যুর খবর নিশ্চিত হলেও এখনো তার মরদেহ উদ্ধার করা সম্ভব হয়নি। এই অনিশ্চয়তা পরিবারকে আরও অসহনীয় যন্ত্রণার মধ্যে ফেলেছে। মেয়ের মরদেহ না পেয়ে শোকের সঙ্গে যুক্ত হয়েছে গভীর উৎকণ্ঠা ও অসহায়তা।
শনিবার সকালে মৃত্যুর খবর ছড়িয়ে পড়ার পর থেকেই বৃষ্টির বাড়িতে মানুষের ঢল নামে। আত্মীয়-স্বজন, প্রতিবেশী, পরিচিতজন- সবাই ছুটে আসেন শোকাহত পরিবারকে সান্ত্বনা দিতে। কিন্তু সান্ত্বনার ভাষাও যেন হারিয়ে গেছে। যে মেয়েটি ছিল সবার ভালোবাসার, যে ছিল গ্রামের বহু তরুণ-তরুণীর অনুপ্রেরণা, তার এমন পরিণতি কেউ মেনে নিতে পারছেন না।
বৃষ্টির চাচাতো বোন তুলি আকন কাঁদতে কাঁদতে বলেন, “বৃষ্টি আপু খুব মেধাবী ছিল। বড় ভাইয়ার ফেসবুক পোস্ট দেখে আমরা প্রথম জানতে পারি। বিশ্বাসই করতে পারছিলাম না- এমন খবর কীভাবে সত্যি হয়!”
আরেক চাচাতো বোন ফজিলা আক্তারের কণ্ঠেও ছিল অসহায় কান্না- “আমরা কিছুতেই এই মৃত্যু মেনে নিতে পারছি না। ভীষণ কষ্ট হচ্ছে। মনে হচ্ছে পরিবারের একটা অংশই হারিয়ে গেছে।”
চাচা দানিয়াল আকন বলেন, “বৃষ্টি শুধু আমাদের পরিবারের নয়, পুরো এলাকার গর্ব ছিল। ও অনেক দূর যেতে পারত, দেশের জন্য ভালো কিছু করতে পারত। এমন নিষ্ঠুর মৃত্যু আমরা কোনোভাবেই মানতে পারছি না।”
বৃষ্টির বাবা জহির উদ্দিন আকনের কণ্ঠে তখন শুধুই এক অসহায় পিতার আর্তি। তিনি বলেন, “২০২৫ সালের ১২ আগস্ট উচ্চশিক্ষার জন্য সে যুক্তরাষ্ট্রে যায়। সবশেষ ১৬ এপ্রিল তার সঙ্গে আমাদের কথা হয়। এরপর থেকেই সে নিখোঁজ ছিল। পরে আমরা তার মৃত্যুর খবর পাই। আমি আমার মেয়ের মরদেহ দেশে ফেরত আনার এবং হত্যাকারীদের শাস্তির দাবি জানাচ্ছি।”
এ বিষয়ে মাদারীপুর সদর উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) ওয়াদিয়া শাবাব জানান, বিষয়টি তিনি বিভিন্ন মাধ্যমে জেনেছেন। এ ঘটনায় মূলত দূতাবাস কাজ করবে। পরিবার কোনো সহায়তা চাইলে প্রশাসনের পক্ষ থেকে তা দেওয়া হবে।
রফিকুল ইসলাম/অমিয়/