শেরপুরের সীমান্তবর্তী জনপদে বন্যহাতির উপদ্রব বেড়ে গেছে। বিশেষ করে গত এক সপ্তাহ ধরে পরিস্থিতি আরও ভয়াবহ হয়েছে। ফলে চরম আতঙ্কে দিন কাটাচ্ছেন কৃষকরা। তাই ফসল রক্ষা করতে না পেরে অনেকেই বাধ্য হয়ে আধা-পাকা বোরো ধান কেটে নিচ্ছেন।
জানা গেছে, ভারতের মেঘালয় রাজ্যঘেঁষা উপজেলা শেরপুরের শ্রীবরদী, ঝিনাইগাতী ও নালিতাবাড়ী। এসব উপজেলার বিস্তীর্ণ পাহাড়ি অঞ্চলজুড়ে দীর্ঘদিন ধরেই বন্যহাতির বিচরণ রয়েছে। সীমান্তঘেঁষা ভারতের গহিন বনাঞ্চল থেকে খাবারের সন্ধানে প্রায়ই হাতির দল লোকালয়ে নেমে আসে। কারণ, বাংলাদেশের বনাঞ্চল তুলনামূলক সমতল হওয়ায় হাতিগুলো সহজেই ফসলি জমি ও বসতবাড়ির দিকে চলে আসে এবং ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতি চালায়।
স্থানীয়রা জানান, দিনের বেলায় হাতির দল সাধারণত পাহাড়ের উঁচু টিলা ও ঘন জঙ্গলের আড়ালে অবস্থান করে, যেখানে মানুষ সহজে তাদের দেখতে না পায়। কিন্তু বিকেল কিংবা সন্ধ্যা হলেই হাতি দলবেঁধে লোকালয়ে নামে। আর তখনই শুরু হয় মানুষ ও বন্যহাতির মধ্যে লড়াই।
কৃষকরা জানান, তাদের জীবিকার উৎস ফসল রক্ষার জন্য তারা রাতভর জেগে থাকেন। বন্যহাতি ফসলের খেতে নামলে ঢাক-ঢোল পিটিয়ে, টিন পিটিয়ে শব্দ করে এবং মশাল বা আগুন জ্বালিয়ে হাতি তাড়ানোর চেষ্টা করেন। কিন্তু সাম্প্রতিক সময়ে দেখা যাচ্ছে, এসব প্রচলিত পদ্ধতি অনেক ক্ষেত্রেই আর কার্যকর হচ্ছে না। ক্ষুধার্ত ও বন্যহাতির বিশাল দলের সামনে এসব প্রতিরোধ ব্যবস্থা ভেঙে পড়ছে। ফলে কৃষকদের ক্ষয়ক্ষতি দিন দিন বাড়ছে। এ কারণে কৃষকরা আধা-পাকা বোরো ধান কেটে নিচ্ছেন।
স্থানীয়রা জানান, মানুষ ও হাতির এই দ্বন্দ্ব নতুন কোনো সমস্যা নয়; বরং দীর্ঘদিন ধরে তারা এই পরিস্থিতির মুখোমুখি হয়ে আসছেন। তবে সাম্প্রতিক সময়ে হাতির আক্রমণের মাত্রা ও সংখ্যা বেড়ে যাওয়ায় পরিস্থিতি আরও ভয়াবহ হয়ে উঠেছে। ফলে তারা দ্রুত একটি টেকসই ও দীর্ঘমেয়াদি সমাধান কামনা করছেন।
শ্রীবরদী উপজেলার বালিজুড়ি এলাকার কৃষক আকরাম মিয়া বলেন, ‘প্রতিদিন রাত হলেই আমাদের মনে আতঙ্ক কাজ করে—কখন যে হাতির দল চলে আসে। এ জন্য ধান এখনও পুরোপুরি না পাকলেও বাধ্য হয়ে আগেভাগেই কেটে ফেলতে হচ্ছে। কারণ আমরা জানি, যদি এক রাতের জন্যও ফসল খেতে রেখে দেই, তাহলে হাতির দল এসে সব শেষ করে দিতে পারে। এতে আমাদের বড় অঙ্কের আর্থিক ক্ষতি হবে।’
একই এলাকার কৃষক লাল মিয়া বলেন, ‘আমরা আগের মতোই ঢোল বাজাই, আগুন জ্বালাই, চিৎকার করি, কিন্তু এখন আর হাতিরা তেমন ভয় পায় না। এগুলো দলবেঁধে আসে এবং নির্বিঘ্নে ফসল নষ্ট করে চলে যায়। এই পরিস্থিতিতে আমরা বাধ্য হয়ে আধা-পাকা ধান কেটে বাড়িতে তুলে রাখছি। এতে উৎপাদন কম হলেও পুরোটা হারাতে হচ্ছে না।’
ঝিনাইগাতী উপজেলার গোমড়া গ্রামের কৃষক হাকিম মিয়া বলেন, ‘এই ধানই আমাদের বছরের একমাত্র ফসল এবং জীবিকার প্রধান উৎস। কিন্তু হাতির দল এক রাতেই কয়েক বিঘা জমির ধান খেয়ে বা নষ্ট করে দেয়। আমরা সারারাত জেগে পাহারা দেই, তবুও কোনো লাভ হয় না। এমন পরিস্থিতিতে আমাদের ভবিষ্যৎ নিয়ে চরম অনিশ্চয়তা তৈরি হয়েছে।’
নালিতাবাড়ী উপজেলার পানিহাটা এলাকার কৃষক ফুরকান মিয়া ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, ‘এভাবে আর চলতে পারে না। আমরা শুধু সাময়িক সমাধান চাই না, চাই স্থায়ী ও কার্যকর ব্যবস্থা। প্রতিদিন এভাবে ফসলের ক্ষতি হলে আমাদের বেঁচে থাকাই কঠিন হয়ে যাবে। সরকার যদি দ্রুত কার্যকর পদক্ষেপ না নেয়, তাহলে আমরা চরম সংকটে পড়ব।’
জেলা কৃষি বিভাগের উপ-পরিচালক মোহাম্মদ সাখাওয়াত হোসেন বলেন, ‘যেহেতু সীমান্ত অঞ্চল, এখানে হাতির বিচরণ রয়েছে। আমরা কৃষকদের বলেছি ধান ৮০ শতাংশ পাকলেই তারা যেন সেগুলো কেটে ফেলে। পাশাপাশি কৃষকদের পরামর্শ দেওয়া হচ্ছে সীমান্তবর্তী এলাকায় কাঁটাযুক্ত গাছ লাগানোর। এতে করে ফসলও থাকবে আবার হাতির চলাচলও নিয়ন্ত্রণ হবে।’
ময়মনসিংহ বনবিভাগের বালিজুড়ি রেঞ্জের রেঞ্জ অফিসার সুমন মিয়া বলেন, ‘বন্যহাতির আক্রমণে জান-মালের ক্ষতি হলে বন বিভাগ সরকারি নীতিমালা অনুযায়ী ক্ষতিপূরণ বা আর্থিক সহায়তা দিয়ে থাকে। হাতির আক্রমণে কেউ মারা গেলে তার পরিবারকে সর্বোচ্চ ৩ লাখ টাকা পর্যন্ত ক্ষতিপূরণ দেওয়া হয়। আর কোনো ব্যক্তি গুরুতর আহত হলে চিকিৎসার জন্য ১ লাখ টাকা পর্যন্ত সহায়তা দিচ্ছে সরকার। যদিও, একজন মানুষের মৃত্যুর প্রতিদান টাকা দিয়ে হয় না। এ ছাড়া হাতি-মানুষের দ্বন্দ্ব নিরসনে এবং হাতির আক্রমণ থেকে রক্ষায় স্থানীয়দের টর্চলাইট, হুইসেল, হ্যান্ড লাউডস্পিকার ও বাইনোকুলার বিতরণ করা হচ্ছে। স্থানীয়দের সঙ্গে সমন্বয় করে হাতি তাড়ানোর কার্যক্রম আরও জোরদার করার পরিকল্পনা নেওয়া হয়েছে। হাতি-মানুষের দ্বন্দ্ব নিরসনে বনবিভাগ কাজ করে যাচ্ছে।’
এ বিষয়ে শেরপুর-৩ (শ্রীবরদী-ঝিনাইগাতী) আসনের সংসদ সদস্য মাহমুদুল হক রুবেল বলেন, ‘মানুষ ও বন্যপ্রাণীর সহাবস্থান নিশ্চিত করা সরকারের একটি গুরুত্বপূর্ণ লক্ষ্য। এই লক্ষ্য বাস্তবায়নে বিভিন্ন পরিকল্পনা গ্রহণ করা হয়েছে। বিশেষ করে সীমান্তবর্তী এলাকায় হাতির উপদ্রব কমাতে দীর্ঘমেয়াদি ও কার্যকর উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে, যাতে মানুষ ও বন্যপ্রাণী উভয়েই নিরাপদে থাকতে পারে।’
উল্লেখ্য, গত এক যুগে শেরপুর সীমান্ত অঞ্চলে বন্যহাতির আক্রমণে ২৯ জন কৃষকের মৃত্যু হয়েছে। বিপরীতে বিভিন্ন ঘটনায় মারা গেছে ৩১টি বন্যহাতি।