গাজীপুরের কাপাসিয়ায় একই পরিবারের মা, সন্তানসহ ৫ জনকে গলাকেটে হত্যার ঘটনা ঘটেছে।
এ ঘটনার পর থেকে পলাতক রয়েছেন গৃহবধূর স্বামী।
শুক্রবার (৮ মে) দিবাগত রাতে উপজেলার রাউতকোনা গ্রামে এই হত্যাকাণ্ড সংঘটিত হয়।
পুলিশ বলছে, নৃশংসভাবে এ হত্যাকাণ্ডের রহস্য উদঘাটনে আইন শৃঙ্খলা বাহিনীর একাধিক টিম কাজ করছে। প্রাথমিক ভাবে পরকীয়া, মাদক ও আর্থিক লেনদেন নিয়ে দ্বন্দ্বের কারণে এ হত্যাকাণ্ড ঘটেছে বলে মনে করছে পুলিশ। এ ব্যাপারে জিজ্ঞাসাবাদের জন্য দুইজনকে আটক করেছে পুলিশ।
নিহতরা হলেন, গোপালগঞ্জের মেরী গোপীনাথপুর গ্রামের ফোরকান মিয়ার স্ত্রী শারমিন, তার তিন কন্যা সন্তান মিম খানম , উম্মে হাবিবা ওরফে মারিয়া, ফারিয়া (দেড় বছর ) এবং শাহাদাত হোসেন মোল্লার ছেলে ও নিহত শারমিনের ছোট ভাই রসুল মোল্লা।
স্থানীয় ও পুলিশ সূত্রে জানা গেছে, কাতার প্রবাসী মনির হোসেনের বাড়িতে ভাড়ায় বসবাস করতেন প্রাইভেটকার চালক ফোরকান ও তার স্ত্রী শারমিন, তিন মেয়ে মিম, মারিয়া ও ফারিয়া। শুক্রবার সন্ধ্যায় সেখানে বেড়াতে আসেন শ্যালক রসুল মিয়া। রাতে তাদের স্বাভাবিক চলাফেরা দেখতে পান প্রতিবেশীরা।
শনিবার (৯ মে) সকালে প্রতিবেশীরা বাড়িতে কোনো সাড়াশব্দ না পেয়ে ভেতরে গিয়ে রক্তাক্ত মরদেহগুলো পড়ে থাকতে দেখেন। খবর পেয়ে ঘটনাস্থলে ছুটে আসেন নিহত শারমিনের পরিবার। পরে স্থানীয়রা থানা পুলিশে খবর দেয়। খবর পেয়ে জেলা পুলিশের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা, পিবিআই, সিআইডিসহ একাধিক টিম ঘটনাস্থল পরিদর্শন করেন।
নিহতের স্বজনদের অভিযোগ, অভিযুক্ত ফোরকান মাদকাসক্ত ছিলেন। গেল রাতে মাদক সেবন করে স্ত্রী, সন্তান ও শ্যালককে কুপিয়ে হত্যা করে পালিয়ে যান। এসময় স্বজনদের মোবাইল ফোনে হত্যাকাণ্ডের খবর জানিয়ে দেন অভিযুক্ত ফোরকান।
স্বজনরা আরও বলেন, পেশায় প্রাইভেটকার চালক ফুরকান মিয়া বছরখানেক আগে রাউৎকোনা গ্রামের প্রবাসী মনির হোসেনের বাড়ির নিচতলা ভাড়া নেন। শনিবার সকাল সাড়ে ৬টার দিকে ফুরকান তার ছোট ভাইয়ের স্ত্রী রাশিদাকে ফোন করে জানান, তিনি পাঁচজনকে হত্যা করে পালিয়ে যাচ্ছেন। এরপর প্রতিবেশীরা ওই বাড়িতে গিয়ে বীভৎস দৃশ্য দেখতে পান। ঘরের মেঝেতে তিন শিশুকন্যার গলাকাটা মরদেহ পাশাপাশি পড়ে ছিল। মা শারমিনের মরদেহ জানালার গ্রিলে হাত-মুখ বাঁধা অবস্থায় ঝুলছিল এবং শ্যালক রসুল মিয়ার মরদেহ পড়ে ছিল বিছানার ওপর।
ফোরকানের ভায়রা হাফিজুর রহমান বলেন, সকাল ৬ টার দিকে মোবাইল ফোনে হত্যাকাণ্ডের বিষয়টি জানতে পেরে তারা ঘটনাস্থলে ছুটে যান। এসময় ঘরের দরজা ভেতর থেকে ভেজানো ছিল। তিনি ধাক্কা দিয়ে দরজা সরিয়ে মেঝেতে তিন শিশুর রক্তাক্ত মৃতদেহ, বিছানায় রসুল মোল্লা ও ঘরের গ্রীলের সাথে মুখে স্কচটিপ ও হাত বাঁধা অবস্থায় শারমিনের মরদেহ দেখতে পান। পরে পুলিশে খবর দিলে তারা মরদেহ উদ্ধার করে।
তিনি আরও বলেন, ফোরকান মাদকাসক্ত ছিলেন। এ নিয়ে তাদের মধ্যে পারিবারিক কলহ লেগে থাকতো।
পুলিশ জানায়, পারিবারিক কলহের জেরে ফুরকান মিয়া এ ঘটনা ঘটিয়ে থাকতে পারে। ঘটনাস্থল থেকে দেশীয় মদের খালি বোতল, রান্না করা পায়েশ ও কোকাকোলার বোতল উদ্ধার করা হয়েছে। এছাড়া মরদেহের পাশে বেশ কিছু প্রিন্ট করা কাগজ পড়ে থাকতে দেখে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী। ওই কাগজের সূত্র ধরে পুলিশ জানতে পারে, ফুরকান হোসেন এর আগে তার স্ত্রীর বিরুদ্ধে গোপালগঞ্জ জেলার সদর থানায় ১০ লাখ টাকা আত্মসাতের একটি অভিযোগ করেছিলেন। একই সাথে ওই অভিযোগপত্রে স্ত্রীর পরকীয়ার বিষয়টিও উল্লেখ করেছিলেন তিনি।
এদিকে, এক সঙ্গে ৫ জন নিহতের ঘটনায় এলাকায় শোকের ছায়া নেমে এসেছে। শত শত এলাকাবাসী ঘটনাস্থলে ভিড় জমিয়েছেন। নৃশংস এ হত্যাকাণ্ডের বিচার চাইছেন তারা।
প্রতিবেশীরা বলছেন, নেশার কারণে একসাথে ৫ জনের মৃত্যু কোন ভাবেই মেনে নেওয়া যায় না। এত রক্ত তারা কাপাসিয়ায় এর আগে দেখেন নি। তাই দায়ীর দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির দাবি করেছেন তারা।
জেলা প্রশাসনের অতিরিক্ত জেলা ম্যাজিস্ট্রেট সালমা খাতুন বলেন, বিষয়টি খুবই হৃদয়বিদারক। বাচ্চাগুলো দেখে আমার অনেক কষ্ট লেগেছে।
আমরা চেষ্টা করবো প্রশাসন, পুলিশ সহ সবার সাপোর্ট নিয়ে খুনিকে গ্রেপ্তার করা।
ইতোমধ্যে মরদেহগুলোর সুরতাহাল প্রতিবেদন সম্পন্ন হয়েছে। পরে ময়না তদন্তের জন্য গাজীপুর শহীদ তাজউদ্দীন আহমদ মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল মর্গে পাঠানো হয়েছে। এই ঘটনায় এলাকায় চরম আতঙ্ক ও শোকের ছায়া নেমে এসেছে।
পলাশ প্রধান/এসএন