ফরিদপুরের বোয়ালমারীর নদেরচাঁদ খালে চলছে সরকারি অর্থায়নে খননকাজ। তবে এই উন্নয়ন কাজকে ঘিরে নির্বিচারে কাটা হয়েছে খালের দুই পাড়ের শত শত গাছ। অথচ স্থানীয়দের দাবি, গাছগুলো না কেটেও খাল খনন সম্ভব ছিল।
এদিকে গাছ কাটাকে কেন্দ্র করে শুরু হয়েছে পাল্টাপাল্টি অভিযোগ। বন বিভাগের দাবি, খননকাজের ঠিকাদার ইউপি চেয়ারম্যানের অনুমতি ছাড়াই গাছ কাটেন। আর চেয়ারম্যানের অভিযোগ, বন বিভাগই দায় এড়াতে তাদের ওপর দোষ চাপাচ্ছে।
জানা গেছে, সামাজিক বনায়ন কর্মসূচির আওতায় উপজেলার গুনবহা ইউনিয়নের নদেরচাঁদ বাজার থেকে স্লুইসগেট পর্যন্ত খালটির দুপাশে প্রায় ১০ হাজার গাছ রোপণ করেছিল ফরিদপুর বন বিভাগ। এসব গাছ তদারকির দায়িত্বে ছিল ‘নদেরচাঁদ সামাজিক বনায়ন ব্যবস্থাপনা কমিটি’।
সম্প্রতি খননকাজে ক্ষতিগ্রস্ত কিছু গাছ কাটার অনুমতি দেয় প্রশাসন। আর সেই সুযোগকে কাজে লাগিয়ে প্রায় তিন শতাধিক গাছ কেটে লোপাটের অভিযোগ উঠেছে বনায়ন কমিটির বিরুদ্ধে।
সরেজমিনে গিয়ে দেখা যায়, খালের কয়েক কিলোমিটার এলাকাজুড়ে গাছ কাটার কাজ চলছে। দা, কুড়াল ও করাত দিয়ে ছোট-বড় বিভিন্ন গাছ কাটা হয়েছে। রেন্টি, লাটিম, আম ও মেহগনিসহ বিভিন্ন প্রজাতির গাছ কাটার পর গোড়া পর্যন্ত তুলে ফেলা হয়েছে। পরে প্রমাণ লুকাতে গর্তগুলো মাটি দিয়ে ঢেকে দেওয়া হয়েছে। গাছগুলোর কাণ্ড ও ডালপালা ভ্যান ও নসিমনে করে বন বিভাগের অফিসে নেওয়ার কথা বলে অন্যত্র নিয়ে যাওয়া হয়েছে।
নিয়ম অনুযায়ী, কাটা গাছের মূল কাণ্ড বন বিভাগের নার্সারিতে জমা দেওয়ার কথা। কিন্তু পাঁচ দিনে শত শত গাছ কাটা হলেও নার্সারিতে জমা পড়েছে মাত্র পাঁচটি গাছ। বাকি গাছের কোনো হদিস নেই।
গুনবহা ইউনিয়নের উমরনগর গ্রামের গফফার মোল্লা বলেন, ‘গাছ না কেটেও খাল খনন করা সম্ভব ছিল। গাছগুলোর বয়স ১৫ থেকে ২০ বছর। খালের পাশে মাটি ফেললেও গাছগুলো টিকে থাকত এবং মানুষ ছায়া পেত।’ মুক্তারপুর গ্রামের শ্রমিক রবিউল ইসলাম বলেন, ‘গাছগুলো সরকারি জায়গায় ছিল। ভেকু মেশিন দিয়ে মাটি কাটলেও গাছের তেমন সমস্যা হতো না। গাছ রেখেও খাল খনন করা যেত।’
বোয়ালমারীর ছোলনা গ্রামের বাসিন্দা সমাজকর্মী সুমন রাফি ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, ‘বন বিভাগের পাশাপাশি ২০১২-১৩ সালে আমি নিজেও কিছু গাছ লাগিয়েছিলাম। বড় গাছগুলোর সঙ্গে ছোট গাছও কাটা হচ্ছে, যা পরিবেশে জন্য হুমকি। এমন হলে মানুষ গাছ লাগানোর আগ্রহ হারাবে।’
তবে অভিযোগের বিষয়ে নদেরচাঁদ সামাজিক বনায়ন ব্যবস্থাপনা কমিটির সদস্য মো. নান্নু শেখ বলেন, ‘খাল খননের সময় কিছু গাছ ভেকুর সঙ্গে লেগে ভেঙে যাচ্ছিল। পরে গুনবহা ইউনিয়নের চেয়ারম্যান, ইউএনও ও বোয়ালমারী বন কর্মকর্তারা এসে ভেকুতে বেঁধে ক্ষতিগ্রস্ত গাছগুলো কেটে ফেলতে বলেন।’
কমিটির সভাপতি হেমায়েত মোল্লা বলেন, ‘ভেকু দিয়ে খননকাজের সময় কিছু গাছ বাধা হয়ে দাঁড়ায়। বিষয়টি বন বিভাগকে জানানো হলে ইউএনও, বন কর্মকর্তা ও ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান ঘটনাস্থল পরিদর্শন করেন। পরে নিচের দিকে থাকা কিছু গাছ কাটার অনুমতি দেওয়া হয়। সেগুলো বন বিভাগের অফিসে পাঠিয়ে দেওয়া হবে।’
বোয়ালমারী উপজেলা বিএনপির সভাপতি ও গুনবহা ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান অ্যাডভোকেট সিরাজুল ইসলাম বলেন, ‘কিছু ছোট গাছ পড়ে গিয়েছিল, সেগুলো কাটলেও তারা কাটতে পারত, কিন্তু বড় গাছ কেটে ঠিক করেনি। বন বিভাগ খাল খননের সুযোগে বড় বড় গাছ কেটে এখন বিএনপি তথা আমাদের ওপর দায়ভার চাপানোর চেষ্টা করছে।’ তিনি দাবি করেন, গাছ কাটার ঘটনায় দল বা তার নিজের কোনো সম্পৃক্ততা নেই।
এদিকে সহকারী বন সংরক্ষক তাওহীদ হোসেন বলেন, ‘খাল খননের ঠিকাদার স্বয়ং ইউপি চেয়ারম্যান সিরাজুল ইসলাম। তিনি শুরুতে বন বিভাগকে না জানিয়ে গাছ কাটা শুরু করেছিলেন। আমরা জানতে পারলে গাছ কাটা বন্ধ করা হয়। পরে ইউএনওর নির্দেশে নির্দিষ্ট কিছু গাছ কাটার অনুমতি দেওয়া হয়। খাল যেমন উপকারী, ঠিক গাছও তেমনি উপকারী। গাছগুলো কাটা হোক, সেটা আমরাও চাই না।’
এ বিষয়টি নিয়ে ইউএনও এস এম রকিবুল হাসান বলেন, ‘নিয়মের বাইরে গাছ কাটার কোনো সুযোগ নেই। সরকারি জমির গাছ কেউ নিয়ে যেতে পারবে না। এ ঘটনায় তদন্ত কমিটি গঠন করা হয়েছে। অভিযান চালিয়ে কিছু গাছ উদ্ধারও করা হয়েছে।’