ঈদুল আজহাকে সামনে রেখে ফেনীর খামারগুলোতে এখন উৎসবের আমেজ বিরাজ করছে। জেলার বিভিন্ন প্রান্তের খামারিরা দিন-রাত ব্যস্ত সময় পার করছেন। কোরবানির পশুর পরিচর্যা, খাবার ও স্বাস্থ্য সুরক্ষায় বাড়তি যত্নে প্রস্তুত করা হয়েছে হাজারও গবাদি পশু।
এবার জেলায় কোরবানির জন্য প্রস্তুত রাখা হয়েছে ৯০ হাজার ৪৫২টি পশু, যা জেলার চাহিদার তুলনায় ৭ হাজার ৯২৭টি বেশি। স্থানীয় চাহিদা পূরণের পাশাপাশি অন্য জেলাতেও এসব পশু সরবরাহের সম্ভাবনা রয়েছে।
জেলা প্রাণিসম্পদ বিভাগের তথ্যমতে, বর্তমানে ফেনীতে ৫ হাজার ৪০৭ জন গো-খামারি পশু লালন-পালনের সঙ্গে জড়িত। ঈদকে ঘিরে অনেক মৌসুমি ব্যবসায়ীও খুচরা বিক্রির উদ্দেশ্যে পশু সংগ্রহ করেছেন। গত পাঁচ বছরে জেলায় কোরবানির পশুর চাহিদা বেড়েছে প্রায় ১০ হাজার।
খামারিরা বলছেন, আধুনিক পদ্ধতিতে পশু পালন ও খামার সম্প্রসারণের কারণে স্থানীয়ভাবেই চাহিদা পূরণ সম্ভব হচ্ছে। ফলে ফেনী ধীরে ধীরে কোরবানির পশু উৎপাদনে একটি সম্ভাবনাময় জেলায় পরিণত হচ্ছে।
সংশ্লিষ্ট সূত্রে প্রাপ্ত তথ্য অনুযায়ী, ২০২১ সালে ফেনীতে ৭২ হাজার কোরবানির পশুর চাহিদার বিপরীতে ৮০ হাজার ৮৬৫টি, ২০২৩ সালে চাহিদা ৮৫ হাজার বিপরীতে ৮৮ হাজার ২৩টি, ২০২৪ সালে ৮৭ হাজার ২০০টি কোরবানির পশুর চাহিদার বিপরীতে ৯০ হাজার ২৫০টি এবং ২০২৫ সালে কোরবানিতে ৮২ হাজার ৩৩৬টি পশুর চাহিদার বিপরীতে ৮৭ হাজার ২২৭টি গবাদি পশু ছিল।
জেলা প্রাণিসম্পদ অধিদপ্তর সূত্র জানায়, এবার কোরবানির জন্য ফেনীর ছয়টি উপজেলায় গবাদি পশুর চাহিদা রয়েছে ৮২ হাজার ৫২৫টি। এর মধ্যে ৯০ হাজার ৪৫২টি পশু প্রস্তুত রাখা হয়েছে, যা চাহিদার তুলনায় ৭ হাজার ৯২৭টি বেশি। পরিসংখ্যান অনুযায়ী, জেলায় গরু রয়েছে ৭১ হাজার ৫৬৯টি, ছাগল ১৩ হাজার ২২৯টি, মহিষ ১ হাজার ৭৩৫টি ও ভেড়া ৩ হাজার ৯১৯টি। ছাগলনাইয়া পশুর সংখ্যা ২৪ হাজার ৩৬০টি।
ফেনী সদর উপজেলায় গবাদি পশু রয়েছে ২২ হাজার ৪১৫টি। এ ছাড়া সোনাগাজী উপজেলায় ১৮ হাজার ৩৭৫টি, দাগনভূঞা উপজেলায় ৮ হাজার ৮৭৫টি। পরশুরাম উপজেলায় ৮ হাজার ৩৭৮টি ও ফুলগাজী উপজেলায় ৮ হাজার ৪৯টি পশু প্রস্তুত রয়েছে।
ফেনী শহরের পাঠানবাড়ি এলাকার হাসিনা অ্যাগ্রোর স্বত্বাধিকারী আরাফাত খান বলেন, ‘এ বছর কোরবানির পশু লালন-পালনে খামারিদের ব্যয় উল্লেখযোগ্য হারে বেড়েছে। বিশেষ করে গবাদি পশুর খাদ্য, ভুসি, খৈল, খড় ও ওষুধের দাম বাড়ায় উৎপাদন খরচও অনেক বৃদ্ধি পেয়েছে।’
তিনি বলেন, ‘প্রতিটি ছোট গরুর পেছনে অতিরিক্ত প্রায় ২০ হাজার টাকা এবং বড় গরুর ক্ষেত্রে প্রায় ৪০ হাজার টাকা পর্যন্ত বেশি খরচ হয়েছে। তবে বাড়তি ব্যয়ের পরও ভালো দামে পশু বিক্রির মাধ্যমে লাভের আশা করছেন খামারিরা।’
অন্যদিকে গলনাইয়া উপজেলার জাহান অ্যাগ্রোর স্বত্বাধিকারী বাদল চৌধুরী বলেন, ‘আমাদের খামারে অর্ধশত গরু প্রস্তুত করা হয়েছে। প্রতিটি গরু দেশীয় ও প্রাকৃতিক উপায়ে লালন-পালন করা হচ্ছে। গরুকে নিয়মিত ঘাস, খড়, ভুসি, খৈল, ভুট্টা ভাঙা, ধানের কুড়া ও পুষ্টিকর খাবার দেওয়া হয়। কোনো ধরনের ক্ষতিকর ওষুধ বা ইনজেকশন ব্যবহার করা হয় না।’
এ ছাড়া ফুলগাজী উপজেলার মদিনা অ্যাগ্রো ম্যানেজার মাহমুদুল হাসান সাব্বির বলেন, ‘আমাদের খামারে ২ শতাধিক গরু প্রস্তুত করা হয়েছে। প্রতিদিন সকাল-বিকেল গরুগুলোকে কাঁচা ঘাস, খড়, ভুসি, খৈল, ভুট্টা, ছোলা ভাঙা ও খনিজসমৃদ্ধ খাবার খাওয়ানো হয়। নিয়মিত পরিচ্ছন্নতা, গোসল ও পশু চিকিৎসকের পরামর্শ অনুযায়ী পরিচর্যা করা হচ্ছে। ক্রেতাদের সুবিধার্থে আমাদের খামারেও লাইভ ওয়েটে গরু বিক্রি করা হচ্ছে। এতে ক্রেতারা সহজেই পছন্দমতো গরু কিনতে পারছেন।’
ফেনী সদর উপজেলা প্রাণিসম্পদ কর্মকর্তা ডা. শহীদুল ইসলাম বলেন, ‘ফেনীতে খামারে আগ্রহীর সংখ্যা বাড়ছে। এখানে বিনিয়োগ লাভজনক ও নিরাপদ হওয়ায় অনেক নতুন উদ্যোক্তা গবাদি পশুর খামার গড়ে তুলছেন। এ ছাড়া অন্য জেলার থেকে এখানে দুধের দাম বেশি হওয়ায় গরু পালন বেশি লাভজনক।’
ফেনী জেলা প্রাণিসম্পদ কর্মকর্তা ডা. দেলোয়ার হোসেন বলেন, জেলার ৫ হাজার ৪০৭টি খামারে চলছে পরিচর্যা ও বিক্রির প্রস্তুতি। খামারিরা সকাল থেকে গভীর রাত পর্যন্ত গবাদি পশুর পরিচর্যায় ব্যস্ত সময় পার করছেন। এবার ভালো লাভ করার ব্যাপারে আশাবাদী তারা।
জেলা প্রাণিসম্পদ অধিদপ্তর থেকে ৩৭টি মেডিকেল টিম খামার ও পশুর হাটের তদারকি করবে। তিনি আরও বলেন, অসাধু ব্যবসায়ীরা ওষুধ খাইয়ে গরু মোটাতাজা করে থাকে। এ ব্যাপারে খামারিদের সতর্ক করা হয়েছে।