শীর্ষ সন্ত্রাসী ও চাঁদাবাজদের অভয়ারণ্যে পরিণত হয়েছে খুলনা। অভ্যন্তরীণ দ্বন্দ্ব, মাদক কারবার ও আধিপত্য বিস্তারকে কেন্দ্র করে খুলনায় ধারাবাহিক হত্যাকাণ্ড-হামলা, গুলি বিনিময়ের ঘটনায় উদ্বেগ ছড়াচ্ছে। চলতি মাসের শুরুতে নগরীর লবণচরা এলাকায় রাশিদুল ইসলাম নামে এক যুবককে বাড়ি থেকে ডেকে নিয়ে প্রকাশ্যে কুপিয়ে হত্যা করা হয়। এর আগে ১৯ মার্চ তার বাড়িতে হামলা চালিয়ে পরিবারের চারজনকে গুলি করার ঘটনা ঘটে।
পুলিশের তথ্য অনুযায়ী, চলতি বছরে খুলনায় এখন পর্যন্ত ৩৬টি হত্যার ঘটনা ঘটেছে। ২০২৫ সালে ৮৩টি ও ২০২৪ সালে আরও ৬০টি হত্যার ঘটনা ঘটে।
খুলনায় হত্যা, চাঁদাবাজি, টাকার বিনিময়ে টার্গেট কিলিং, মাদক সিন্ডিকেটে কমপক্ষে ৯টি গ্রুপ সক্রিয় রয়েছে বলে জানা গেছে। ২০২৪ সালের আগস্টের পর পুলিশের নিষ্ক্রিয়তায় অপরাধ প্রবণতা বেড়েছে বলে দাবি করেন বিশ্লেষকরা। এদিকে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে খুলনা মেট্রোপলিটন পুলিশ, র্যাব ও আইনশৃঙ্খলা রক্ষার অন্য ইউনিটগুলো বিশেষ যৌথ অভিযান শুরু করেছে। তবে শীর্ষ সন্ত্রাসীদের কেউ এখনো ধরা না পড়ায় উদ্বেগ-উৎকণ্ঠায় দিন পার করছেন নগরবাসী।
জানা গেছে, গত ৪ মার্চ নগরীর ডাকবাংলা মোড়ে রূপসা উপজেলা শ্রমিক দলের সাবেক আহ্বায়ক মাসুম বিল্লাহকে গুলি করে হত্যা করে দুর্বৃত্তরা। এই মিশনে একাধিক সন্ত্রাসী দল অংশ নেয়। পুলিশ ঘটনাস্থল থেকে অস্ত্রসহ একজনকে গ্রেপ্তার করলেও পরবর্তী সময়ে তদন্ত কার্যক্রম আর এগোয়নি। ২৯ মে নগরীর সোনাডাঙ্গা এলাকায় দুই নাতিসহ বৃদ্ধ নানিকে হত্যার ঘটনা ঘটে। এ মামলার প্রধান আসামি রফিকুল ইসলাম হাওলাদারকে ৫ জুন রাতে বরিশাল থেকে গ্রেপ্তার করে র্যাব। একইভাবে ২ জুন লবণচরা এলাকায় বাড়ির সামনে থেকে রাশিদুল ইসলাম নামে এক যুবককে মোটরসাইকেলে তুলে নিয়ে যায় সন্ত্রাসীরা। পরে প্রকাশ্যে তাকে কুপিয়ে হত্যা করা হয়।
পুলিশ জানায়, প্রায় তিন বছর আগে একটি মামলায় রাশিদুল কারাগারে ছিলেন। সেখানে ইমরান নামের আরেক যুবকের সঙ্গে তার পরিচয় হয়। সেই সূত্রে ইমরানের পরিবারের সঙ্গে রাশিদুলের যোগাযোগ গড়ে ওঠে। একপর্যায়ে ইমরানের স্ত্রীর সঙ্গে রাশিদুলের পরকীয়া সম্পর্ক গড়ে ওঠে। এরপর আট মাস আগে ইমরান আরেকটি মামলায় কারাগারে গেলে রাশিদুল তার স্ত্রীকে বিয়ে করেন। কারাগার থেকে বের হয়ে ইমরান দলবল নিয়ে ১৯ মার্চ রাশিদুলের বাড়িতে হামলা করলে ৪ জন গুলিবিদ্ধ হয়। পরে ২ জুন বাড়ি থেকে ডেকে নিয়ে রাশিদুলকে হত্যা করা হয়।
মানবাধিকার বাস্তবায়ন সংস্থা খুলনার সমন্বয়কারী অ্যাডভোকেট মোমিনুল ইসলাম জানান, সাম্প্রতিক সময়ে খুলনায় মাদক কারবার, চাঁদাবাজি ও আধিপত্য বিস্তারকে কেন্দ্র করে সন্ত্রাসী চক্রগুলোর সংঘাত আশঙ্কাজনকভাবে বৃদ্ধি পেয়েছে। প্রায়ই নগরীর বিভিন্ন এলাকায় অস্ত্রের মহড়া, গোলাগুলি ও খুনের ঘটনা ঘটছে।
এদিকে উদ্ভূত পরিস্থিতে ৩ জুন কেএমপির সদর দপ্তরে শহরের বর্তমান আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতিসংক্রান্ত বিশেষ সভা অনুষ্ঠিত হয়। এতে যৌথভাবে বিশেষ অভিযান পরিচালনার সিদ্ধান্ত হয়। শুক্রবার সন্ধ্যা থেকে শনিবার সকাল পর্যন্ত চলা অভিযানে চিহ্নিত সন্ত্রাসীদের কয়েকজন সহযোগী, মাদক কারবারি, অস্ত্রসহ ৬২ জন গ্রেপ্তার হয়।
পুলিশ, র্যাব ও অন্যান্য বিশেষায়িত ইউনিট বর্তমানে একযোগে সমন্বিত অভিযান পরিচালনা করছে। গ্রেপ্তারদের কাছ থেকে বিপুল পরিমাণ দেশীয় অস্ত্র এবং অবৈধ মোটরসাইকেল জব্দ করা হয়। তবে অভিযানে শীর্ষ সন্ত্রাসীদের কেউ এখনো গ্রেপ্তার না হওয়ায় ও সন্ত্রাসী কার্যক্রম-চাঁদাবাজি অব্যাহত থাকায় সাধারণ মানুষের মধ্যে উদ্বেগ কাটছে না।
পুলিশ জানায়, এর আগে ১৫ এপ্রিল নগরীর বিভিন্ন থানার ওসি রদবদল করা হয়। তবে ওসিদের বদলেও আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির তেমন উন্নতি হয়নি।
খুলনা মেট্রোপলিটন পুলিশ কমিশনার মোহাম্মদ জাহিদুল হাসান বলেন, শীর্ষ পর্যায় থেকে যৌথ অভিযানের নির্দেশনা রয়েছে। সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ডে জড়িতদের তালিকা করা হয়েছে। এ ছাড়া আইনশৃঙ্খলা নিয়ন্ত্রণে রাখা পুলিশের কর্তব্যের মধ্যে পড়ে। অপরাধপ্রবণ এলাকাগুলোকে অভিযানে প্রাধান্য দেওয়া হচ্ছে।