কৃষকদের মাঝে সারের সহজলভ্যতা নিশ্চিত করতে ছয় বছর আগে একটি প্রকল্প বাস্তবায়নের উদ্যোগ নেয় বিগত আওয়ামী লীগ সরকার। কিন্তু ছয় বছর পার হয়ে গেলেও প্রকল্পটির কাজের কাজ কিছুই হয়নি। সার সংরক্ষণ ও বিতরণ ব্যবস্থার লক্ষ্যে নেওয়া আলোচ্য প্রকল্পের আওতায় দেশের ৩৪ জেলায় বাফার গুদাম নির্মাণ করার কথা। কিন্তু বাস্তবতা হচ্ছে, একটি জেলায়ও এ গুদাম নির্মাণ হয়নি। তবে বেশির ভাগ জেলায় ভূমি অধিগ্রহণের কাজ হলেও চারটি জেলায় বাকি আছে এখনো। ভূমি অধিগ্রহণসহ অন্যান্য খাতে ব্যয় হয়েছে মোট প্রকল্পের মাত্র ১৩ শতাংশ। পরিকল্পনা মন্ত্রণালয়ের বাস্তবায়ন পরিবীক্ষণ ও মূল্যায়ন বিভাগের (আইএমইডি) এক প্রতিবেদনে এসব তথ্য উঠে এসেছে।
সূত্র বলেছে, নির্ধারিত সময়ে প্রকল্পের কাজ শেষ না হওয়ায় সংশোধন করে ২০২৫ সাল পর্যন্ত নির্ধারণ করা হয়। একনেকে প্রথম প্রকল্পটি অনুমোদন পায় ২০১৮ সালের ৪ নভেম্বর। প্রথমে আলোচ্য প্রকল্পটির প্রাক্কলিত ব্যয় ধরা হয় ১ হাজার ৯৮৩ কোটি টাকা। পরে সংশোধিত করে ব্যয় বাড়ানো হয় ২৫ শতাংশ। জানা গেছে, এ প্রকল্পের আওতায় চার জেলায় ভূমি অধিগ্রহণের উদ্যোগ নেওয়া হলেও কোনো কাজই এখন পর্যন্ত সম্পন্ন হয়নি।
জানতে চাইলে প্রকল্প পরিচালক প্রকৌশলী মঞ্জুরুল হক খবরের কাগজকে বলেন, ‘আমি কিছুদিন আগে দায়িত্ব নিয়েছি। সবকিছু বোঝার সুযোগ হয়নি। তাই কিছু মন্তব্য করতে পারছি না। তবে এ প্রকল্পের বাস্তবায়নকারী সংস্থা বাংলাদেশ কেমিক্যাল ইন্ডাস্ট্রিজ করপোরেশন-বিসিআইসির চেয়ারাম্যান মো. সাইদুর রহমানের সঙ্গে যোগাযোগ করা হলে তিনি বলেন, ‘প্রকল্পটি বিভিন্ন কারণে এতদিন দেরি হয়েছে। এ জন্য অগ্রগতি কম হয়েছে। ভূমি অধিগ্রহণ ছাড়া কোনো ঠিকাদারকে বিল পরিশোধ করা হয়নি। তবে আগামী ছয় মাসে ভালো অগ্রগতি হবে। কারণ ক্রয়সংক্রান্ত মন্ত্রিসভা কমিটিতে ছয়টি দরপ্রস্তাবের অনুমোদন পাওয়া গেছে। এসবের ওয়ার্ক অর্ডার হয়ে গেছে। ১৪টির টেন্ডার হয়েছে। ১০টি প্রক্রিয়াধীন রয়েছে।
সূত্র জানায়, দেশের বিভিন্ন স্থানে কৃষকরা ঠিকমতো সার না পাওয়ায় ৩৪ জেলায় বাফার গুদাম নির্মাণের উদ্যোগ নেওয়া হয়। সারের মজুত সুনিশ্চিত করে খাদ্য উৎপাদনে স্বয়ংসম্পূর্ণতা অর্জনের উদ্দেশ্যে শিল্প মন্ত্রণালয়ের আওতায় বাংলাদেশ কেমিক্যাল ইন্ডাস্ট্রিজ করপোরেশন (বিসিআইসি) বাস্তবায়ন করছে প্রকল্পটি।
প্রকল্পটি কার্যকর করতে প্রথমে ১ হাজার ৯৮৩ কোটি টাকা ব্যয় ধরা হয়। কিন্তু কাজের কাজ কিছু না হওয়া এবং ভূমির দাম অস্বাভাবিকভাবে বেড়ে যাওয়ায় ২০২৩ সালের ১১ এপ্রিল সংশোধন করে ব্যয় বাড়িয়ে ধরা হয় ২ হাজার ৪৮৩ কোটি টাকা।
আইএমইডির প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ৩৪টি গুদাম নির্মাণের জন্য ১৬৯ একর ভূমি অধিগ্রহণ করা দরকার। এর মধ্যে ২৯টি গুদামের জন্য ভূমি অধিগ্রহণ হয়েছে ১৩৮ একর। নাটোর জেলায় ভূমি অধিগ্রহণের জন্য এখনো জায়গা পাওয়া যায়নি। এ ছাড়া মাদারীপুর, পটুয়াখালী, কুষ্টিয়া ও কুড়িগ্রামের ভূমি অধিগ্রহণ কাজ এখনো সম্পন্ন হয়নি।
প্রতিবেদনে আরও উল্লেখ করা হয়েছে, বাংলাদেশে খাদ্যের চাহিদা মিটানোর লক্ষ্যে প্রতি বছর রাসায়নিক সার বিশেষ করে ইউরিয়া সারের ব্যবহার উত্তরোত্তর বৃদ্ধি পাচ্ছে। ধান, গম, ভুট্টা, শাক ও সবজি সবকিছুতেই কৃষকরা সারের প্রয়োগ করছেন। ৭০ শতাংশ কৃষক জানিয়েছেন, বোরো মৌসুমে চাহিদা অনুযায়ী সময়মতো তারা সার পান না। ৫১ শতাংশ কৃষক জানিয়েছেন, সারের মজুত কম থাকায় তারা চাহিদা অনুযায়ী পান না। ডিলার ও ব্যবসায়ীরাও জানিয়েছেন, চাহিদা মোতাবেক তারা সার বিতরণ করতে পারেন না। ১০০ ভাগ কৃষকই জানিয়েছেন এই প্রকল্পটি বাস্তবায়ন হলে অর্থাৎ ৩৪ জেলায় বাফার গুদাম নির্মাণ হলে কৃষির উৎপাদন বৃদ্ধি পাবে ও কর্মসংস্থানের সুযোগ সৃষ্টি হবে।
আইএমইডির সহকারী পরিচালক মো. মশিউর রহমান মিথুন জানান, নির্মিতব্য বাফার গুদাম চালু হলে ৩৪ জেলায় বিভিন্ন ধরনের ফসলের উৎপাদনে নিরবচ্ছিন্নভাবে রাসায়নিক সারের সরবরাহ নিশ্চিত এবং সারের প্রাপ্যতা ও বিতরণ ব্যবস্থা আগের তুলনায় সহজ হবে। এ ব্যাপারে যশোর সদরের কৃষক প্রতিনিধি মো. সোহেল আরমান বলেন, ‘বর্তমানে তারা চাহিদা মোতাবেক সার পাচ্ছেন না। প্রকল্পটি বাস্তবায়ন হলে রাসায়নিক সারের প্রাপ্যতা সহজ হবে এবং পারিবারিক আয়ও বৃদ্ধি পাবে।’
প্রতিবেদনে আরও বলা হয়েছে, বাফার গুদাম তৈরি হলে মৌসুমে সার আমদানি করে মজুত রাখা গেলে, প্রতি বছরে সরকারের ৬০০ কোটি টাকা সাশ্রয় হবে। একই সঙ্গে প্রতি বছরে আমদানি করা সার খরচের ২৫ শতাংশ সাশ্রয় হবে।
দুর্বল দিক: প্রকল্পটির অন্যতম দুর্বল দিক হলো একাধিকবার প্রকল্প পরিচালক পরিবর্তন। এ পর্যন্ত পাঁচজন প্রকল্প পরিবর্তন করা হয়েছে। বারবার প্রকল্প পরিচালক পরিবর্তনের কারণে প্রকল্পের অগ্রগতি মন্থর হয়েছে।
ভূমি অধিগ্রহণে জটিলতাও দুর্বল দিক বলে উল্লেখ করা হয়েছে। এখনো ৪টি জেলার ভূমি অধিগ্রহণ সম্পন্ন হয়নি। বিদায়ী (২০২৩-২৪) অর্থবছরে ৪৫ কোটি টাকা বরাদ্দ রাখা হলেও তা ব্যয় করতে পারেননি প্রকল্প পরিচালক। এখনো কোনো দরপত্র চূড়ান্ত মূল্যায়ন সম্পন্ন হয়নি। আর দরপত্র মূল্যায়ন কার্যক্রম সম্পন্ন না হওয়ায় এখনো কোনো ঠিকাদার প্রতিষ্ঠান নিয়োগ করা যায়নি। ফলে যেসব জায়গায় ভূমি অধিগ্রহণ সম্পন্ন হয়েছে সে জায়গাগুলোয় ভূমি উন্নয়নের কাজও শুরু হয়নি এবং প্রকল্পের মূল কাজ ৩৪টি বাফার গুদাম নির্মাণকাজ এখনো শুরু হয়নি।
প্রতিবেদনে বলা হয়, তৃতীয় পক্ষ দিয়ে ফিজিবিলিটি স্টাডি (সম্ভাব্যতা সমীক্ষা) করার নির্দেশ দিলেও এই প্রকল্পে তা নিরপেক্ষ কোনো প্রতিষ্ঠান দিয়ে করা হয়নি এবং প্রকল্প বাস্তবায়নের সম্ভাব্য ঝুঁকি চিহ্নিত করা হয়নি। এ ছাড়া মাঠ পর্যায়ে উপকারভোগীর জরিপ করা হয়নি। প্রকল্পের জন্য যাদের ভূমি অধিগ্রহণ করা হবে তাদের মতামত গ্রহণ করা হয়নি। সম্ভাব্যতা সমীক্ষা যাচাই প্রতিবেদনে জমি মধ্যে বৈদ্যুতিক খুঁটি, রেলওয়ের জমি, খাসজমি ইত্যাদি চিহ্নিত করা হয়েছে। এসব করা হলে ভূমি অধিগ্রহণে জটিলতা কম হতো বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।
ইতিবাচক দিক: প্রকল্পটি বাস্তবায়ন হলে সারা দেশে প্রায় ৮ লাখ টন সার মজুত রাখা যাবে। গোডাউন বৃদ্ধি পেলে সার ব্যবসায়ী ও ডিলারের সংখ্যাও বৃদ্ধি পাবে। প্রকল্পটি কার্যকরভাবে বাস্তবায়ন করতে ড্রয়িং ও ডিজাইন প্রণয়নের সময় প্রকল্পভুক্ত এলাকাগুলোর ফ্লাড লেভেল বা বন্যার পানির স্তর বিবেচনায় আনতে হবে। যাতে অতি বৃষ্টি বা বন্যার পানি গুদামের ভেতরে প্রবেশ করতে না পারে।
বিসিআইসি জানায়, যেসব এলাকায় গুদাম হওয়া কথা তা হলো- সিরাজগঞ্জ, ঝিনাইদহ, চুয়াডাঙ্গা, মেহেরপুর, কুষ্টিয়া, যশোর, নড়াইল, মাগুরা, খুলনা, সাতক্ষীরা, বগুড়া, নওগাঁ, গাইবান্ধা, রংপুর, কুড়িগ্রাম, লালমনিরহাট, ঠাকুরগাঁও, দিনাজপুর, জয়পুরহাট, রাজশাহী, নাটোর, বাগেরহাট, পটুয়াখালী, বরগুনা, ভোলা, ফরিদপুর, ময়মনসিংহ, নেত্রকোনা, কুমিল্লা, চাঁদপুর, লক্ষ্মীপুর, সিরাজগঞ্জ, মানিকগঞ্জ এবং মুন্সীগঞ্জ জেলা।