জাতীয় রাজস্ব বোর্ডকে (এনবিআর) ভেঙে নীতি এবং ব্যবস্থাপনা নামে আলাদা দুটি বিভাগ করা হয়েছে। এটা অবশ্যই ভালো কাজ। কিন্তু কোনো ধরনের আলোচনা ব্যতিরেকে পেশাজীবীদের জায়গা সংকুচিত ও অন্যান্য অংশীজনকে নিয়ন্ত্রণে রেখে যেটা করা হয়েছে, সেটা ঠিক হয়নি। এখন ঠিক করা গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হয়ে দাঁড়িয়েছে। অন্তর্বর্তী সরকার যে বাজেট প্রণয়ন করছে, তাতে জনগণের আশা-আকাঙ্ক্ষার প্রতিফলন ঘটবে কিনা সেই বিষয়েও সন্দেহ প্রকাশ করেছেন বিশিষ্টজনরা।
গতকাল সোমবার এসডিজি বাস্তবায়নে নাগরিক প্ল্যাটফর্ম আয়োজিত বাংলাদেশ অর্থনীতি ২০২৫-২৬: নীতি সংস্কার ও জাতীয় বাজেট শীর্ষক সেমিনারে বক্তারা এসব কথা বলেন।
অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথি ছিলেন প্রধান উপদেষ্টার বিশেষ সহকারী আনিসুজ্জামান চৌধুরী, বিশেষ অতিথি ছিলেন বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য আমীর খসরু মাহমুদ চৌধুরী।
অনুষ্ঠানে মূল প্রবন্ধ উপস্থাপন করেন বেসরকারি গবেষণা সংস্থা সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগের (সিপিডি) সম্মাননীয় ফেলো ড. দেবপ্রিয় ভট্টাচার্য। তিনি বলেন, এনবিআরকে দুই ভাগ করা ঠিক আছে। এটা আমাদের শ্বেতপত্রের সুপারিশেও ছিল। কিন্তু যে প্রক্রিয়ায় করা হয়েছে, সেটা ঠিক হয়নি। আলোচনা ব্যতিরেকে, পেশাজীবীদের জায়গা সংকুচিত ও অন্যান্য অংশীজনকে নিয়ন্ত্রণে রেখে করা হয়েছে, এটা করা ঠিক হয়নি। এতে আসল উদ্দেশ্য অর্জিত না-ও হতে পারে। তাই এটাকে এখনই ঠিক দরকার।
দেবপ্রিয় ভট্টাচার্য বলেন, বিগত সরকারের সময়ে চোরতন্ত্র বা লুটপাট তন্ত্রে যারা যুক্ত ছিলেন তাদের মধ্যে জড়িত রাজনীতিবিদরা পালিয়ে গেছেন, ব্যবসায়ী গোষ্ঠীরা ম্রিয়মাণ (নির্জীব) হয়ে আছেন। আর আমলারা আবার পুনরুজ্জীবিত হয়েছেন। অর্থনৈতিক সংস্কারে সরকারের মনোযোগ কম উল্লেখ করে দেবপ্রিয় ভট্টাচার্য বলেন, আমাদের সাধারণ আক্ষেপ হলো সরকারের পক্ষ থেকে অন্যান্য সংস্কারে যতখানি মনোযোগ দেওয়া হয়, অর্থনৈতিক সংস্কারের ব্যাপারে অতখানি মনোযোগ আমরা দেখি না। এটা একটা বড় ধরনের সমস্যা এবং উনারা অনুধাবন করেন না। অর্থনীতিতে যদি স্বস্তি না থাকে তাহলে অন্য কোনো সংস্কার কিন্তু স্বস্তিতে থাকবে না।
তারপরও এত কিছু অসম্পূর্ণতা বা অসঙ্গতি থাকার পরও বাজেট কীভাবে বাস্তবায়িত হবে সেটি চারটি বিষয়ের ওপরে অনেকখানি নির্ভর করবে বলে মনে করেন দেবপ্রিয় ভট্টাচার্য। তিনি বলেন, আমাদের যে ঐক্য প্রক্রিয়ার আলোচনা চলছে তার ফলাফল, নির্বাচন সম্বন্ধে একটি নির্দিষ্ট পথরেখা পাওয়া, যে বিচারের কথা বলা হচ্ছে তা আগে হবে না পরে হবে ইত্যাদি বিষয় এবং আমাদের শান্তিশৃঙ্খলা ও নিরাপত্তার বিষয়ের ওপরে নির্ভর করবে।
দেবপ্রিয় ভট্টাচার্য আরও বলেন, বিনিয়োগের যে সব উপাদান থাকে সেগুলো এই মুহূর্তে আমাদের খুব বেশি উৎসাহিত করতে পারছে না। ফলে কর্মসংস্থান বাড়ছে না। শ্রমিকদের মজুরি বাড়ার হার মূল্যস্ফীতির হারের চেয়ে নিচে। অর্থাৎ তাদের প্রকৃত আয় কমে যাচ্ছে। তাহলে আমরা অর্থনৈতিকে ঘুরে দাঁড়াতে দেখছি কিনা সেটি খুব বেশি শক্তি দিয়ে বলা যাচ্ছে না।
বাংলাদেশে এই মুহূর্তে চরম দারিদ্র সীমার নিচে মানুষের সংখ্যা বাড়ছে। এর মধ্যে যুবদারিদ্র একটা বড় বিষয়। অন্তর্বর্তী সরকার যেসব সামাজিক সুরক্ষা বাড়িয়েছে, তাতে দেখা গেছে সবচেয়ে বেশি বেড়েছে উন্মুক্ত বাজার ব্যবস্থার মাধ্যমে বিক্রি (ওএমএস) বা ট্রাক সেলে। এই বরাদ্দ মূলত শহরের মধ্যবিত্তের জন্য, প্রায় ৭ শতাংশ বাড়ানো হয়েছে। অন্যদিকে, গ্রামে কাজের বিনিময়ে খাদ্য অথবা গরিব মানুষকে খাওয়ানো প্রভৃতিতে ৪০ শতাংশ পর্যন্ত বরাদ্দ কমানো হয়েছে। অথচ আমরা বৈষম্যের বিরুদ্ধে বলেছি। অন্তর্বর্তী সরকারের সময়ে কাঠামোগত অসংগতির সমাধান হচ্ছে কি হচ্ছে না, এটি তার একটা বড় প্রমাণ।
দেবপ্রিয় ভট্টাচার্য বলেন, সংস্কারের ক্ষেত্রে সরকারের বেশকিছু উদ্যোগ গ্রহণ করার বিষয়টি আমাদের নজরে রেখেছে।
টাস্কফোর্স থেকে বলেছি দ্বি-বার্ষিক পরিকল্পনা তৈরি করা দরকার। বৈষম্যবিরোধী আন্দোলনের মাধ্যমে এই সরকার এলেও তারা অর্থনৈতিক বৈষম্য মোকাবিলায় যথেষ্ট পদক্ষেপ নিতে পারে নাই। যে ফিসক্যাল পলিসি নিয়ে কাজ হচ্ছে, সেটাও কিন্তু গত সরকারের। পুরোনো যে কাঠামো রয়েছে সেটাকেই ধুয়ে-মুছে কাজ করা হচ্ছে, সেটা আমাদের পছন্দ হয়নি। টাস্কফোর্সের যে সুপারিশ ছিল, সেটা ধরে যে গতি আসার কথা ছিল, তা আমরা দেখতে পাইনি।
এ সময় প্রধান উপদেষ্টার বিশেষ সহকারী অনিসুজ্জামান চৌধুরী তার বক্তব্যে বাংলাদেশের অর্থনৈতিক যাত্রার বিশ্লেষণ তুলে ধরেন। বাস্কেট কেস ধরনের পুরোনো, নেতিবাচক ধারণা থেকে বেরিয়ে এসে দেশের উন্নয়ন ও সক্ষমতা নিয়ে আত্মবিশ্বাসী হওয়ার ওপর তিনি জোর দেন। পাশাপাশি, স্থিতিশীল ও ন্যায্য আন্তর্জাতিক অর্থনৈতিক কাঠামোর অনুপস্থিতির দিকটি তুলে ধরেন, যা আজকের দিনে উন্নয়নশীল দেশগুলোর জন্য অন্যতম বড় চ্যালেঞ্জ।
বিশেষ অতিথির বক্তব্যে বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য আমীর খসরু মাহমুদ চৌধুরী বলেন, ‘পালিয়ে যাওয়া আওয়ামী লীগ সরকার অর্থনীতির প্রতিটি খাতেই ফুলিয়ে-ফাঁপিয়ে তথ্য-উপাত্ত তৈরি করেছে। অন্তর্বর্তী সরকারও সেই ভুল তথ্যের ওপর ভিত্তি করেই জাতীয় বাজেট প্রণয়ন করতে যাচ্ছেন। ভুল তথ্যের ওপর বাজেট প্রণীত হলে জনগণের আশা-আকাঙ্ক্ষা পূরণ হবে না।’
তিনি বলেন, ‘এনবিআরকে দুইভাগ করা হয়েছে। এটা খুবই ভালো উদ্যোগ। কিন্তু যেভাবে করা হয়েছে, তা নিয়ে সংশয় তৈরি হয়েছে। এটা শুধু রাজস্ব আদায়ের বিষয় না, এর সঙ্গে আরও অনেক বিষয় যুক্ত রয়েছে। যার কোনো ক্ষেত্রেই সুফল আসবে না।’
আমীর খসরু বলেন, ‘বিনিয়োগ ছাড়া কোনো দেশ আগাতে পারে না। কিন্তু এই সরকার ১০ মাসেও দেশের বিনিয়োগ পরিস্থিতি স্বাভাবিক করতে পারে নাই। আন্তর্জাতিক বিনিয়োগ সম্মেলন করেছে। খুবই ভালো উদ্যোগ। কিন্তু সেখানে অংশগ্রহণকারী সবার একটা কমন প্রশ্ন ছিল, সেটা হচ্ছে আগামী নির্বাচন কবে অনুষ্ঠিত হবে? নির্বাচন না হলে দেশি-বিদেশি বিনিয়োগকারীরা কেউ বিনিয়োগ করবেন না। যার প্রভাব ইতোমধ্যে দেখা যাচ্ছে। কিন্তু এই সরকার তা অনুধাবন করতে পারছেন না।’
র্যাপিডের নির্বাহী পরিচালক ও ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের উন্নয়ন অধ্যয়ন বিভাগের অধ্যাপক এম আবু ইউসুফ বলেন, এবার একটা ভিন্নধর্মী বাজেট হবে বলে আমরা আশা করি। কারণ বাজেট নিয়ে আগে যারা কথা বলেছে তারা এখন বাজেট প্রণয়ন করছে। অন্তর্বর্তী সরকার ক্ষমতায় এসে যতগুলো কমিটি করেছে শ্বেতপত্র, টাস্কফোর্স ও কমিশন এসবের প্রতিফলন বাজেটে থাকা উচিত। কিছু প্রতিফলন এর মধ্যে দেখা গেছে, যেমন এবারের বাজেটের আকার কমছে, এডিপির আকার ও প্রকল্পের সংখ্যা কমানো হয়েছে।
বাজেটে কর্মসংস্থানকে সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার দেওয়া উচিত উল্লেখ করে তিনি বলেন, শিক্ষা, সুরক্ষা ও স্বাস্থ্যের বিষয়গুলো থাকবে। ঋণের ওপর নির্ভরশীলতা কমাতে রাজস্ব বাড়ানোর বিকল্প নেই।
সানেমের নির্বাহী পরিচালক সেলিম রায়হান বলেন, আর্থিক খাতে সংস্কারে বাংলাদেশ ব্যাংকের অনেক উদ্যোগের কথা বলা হচ্ছে। কিন্তু এর কোনোটাই দৃশ্যমান নয়। সবই করা হচ্ছে আড়ালে, যথেষ্ট গোপনীয়তার মাধ্যমে। সেখানে বিতর্কিত একটি বড় গ্রুপকে আবার ঋণ পুনঃতফসিল সুবিধা দিতেও দেখা গেছে।
তিনি বলেন, এনবিআরকে যেভাবে দুই ভাগ করা হয়েছে, তাতে রাজস্ব আদায় বাড়বে বলে মনে হচ্ছে না। সংস্কারের বিষয়ে সরকারের উদ্যোগ নিয়েও প্রশ্ন তোলেন এই গবেষক।
তিনি বলেন, শ্বেতপত্র এবং টাস্কফোর্সে যেসব সুপারিশ করা হয়েছিল, তার তেমন কোনো প্রভাব দেখা যাচ্ছে না।