রাজধানীর নিউ মার্কেটের ৪২৬ দোকানে এক বছরে হাজার কোটি টাকার বেশি বাণিজ্য হয়। দেশের অন্যতম পুরোনো এই মার্কেট। এখানে ঘর-গৃহস্থালির জিনিসপত্র থেকে পোশাক, জুতা-স্যান্ডেল, প্রসাধনী, জুয়েলারি, বই, স্টেশনারি- সব পাওয়া যায়।
নিউ মার্কেট দেয়াল দিয়ে ঘেরা। এর মধ্যে সারি সারি সাজানো আছে ৪২৬ দোকান। মাঝখানে খোলা জায়গায় এসব দোকানের বাইরে চৌকি পেতেও অনেকে বেচাকেনা করছেন। সারা বছরই এসব দোকানে বেচাকেনা হয়। একইভাবে চৌকি থেকেও বেচাকেনা চলে।
ঢাকা নিউ মার্কেট ব্যবসায়ী মালিক সমিতির সভাপতি অ্যাডভোকেট মকবুল হোসেন খবরের কাগজকে বলেন, রাজধানীর নিউ মার্কেট বহু পুরোনো। দেশ স্বাধীনের আগে থেকে নিউ মার্কেটে বেচাকেনা চলে। যুগ যুগ ধরে এখানে ব্যবসা চলছে। বর্তমানে ৪২৬টি দোকান আছে। দৈনিক ৩-৪ কোটি টাকার বেশি বিক্রি হয় এসব দোকানে। এক বছরে গড়ে এক হাজার কোটি টাকার বেশি বিক্রি হয়।
ব্যবসায়ী এই নেতা বলেন, সারা দেশ থেকে এখানে কেনাকাটা করতে আসেন। প্রতিবেশী অনেক দেশ থেকেও এখানে কেনাকাটা করতে আসেন। দেশের অনেক মার্কেট থেকে এখানে দরদাম করে কেনার সুযোগ আছে। দামও তুলনামূলক কম। সাধারণত নিম্নমধ্যবিত্ত ও মধ্যবিত্ত শ্রেণির মানুষ এখানকার ক্রেতা। তবে অনেক ধনী মানুষও এখান থেকে কেনাকাটা করতে আসেন। অনেকে বিয়ের বাজার করে থাকেন। পূজা সামনে রেখে বেচাকেনা বেড়েছে।
ঢাকা নিউ মার্কেট প্রতি সপ্তাহে মঙ্গলবার বন্ধ থাকে। বাকি ছয় দিন সকাল ১০-১১টা থেকে এখানে বেচাকেনা শুরু হয়। চলে রাত ৯-১০টা পর্যন্ত।
সরেজমিনে গিয়ে দেখা যায়, সকাল ৮-৯টা থেকে দোকান খুলে বিক্রেতারা বিক্রির প্রস্তুতি নিচ্ছেন। ক্রেতা আসতে শুরু করেন সকাল ১০টা-সাড়ে ১০টা থেকে। এখানকার বেশির ভাগ ক্রেতা নিম্নবিত্ত এবং মধ্যবিত্ত শ্রেণির। শুধু যে রাজধানীতে বসবাসকারীরাই এখানে বাজার করতে আসছেন তা নয়। সারা দেশ থেকেই এখানে লোকজন বাজার করতে আসছেন।
খুলনা থেকে আসা ব্যবসায়ী সাজ্জাদ জামিল খবরের কাগজকে বলেন, ‘আমি খুলনা থেকে বিয়ের বাজার করতে এসেছি। নিউ মার্কেট থেকে শাড়ি, কসমেটিকস (প্রসাধনী) ও জুতা কিনছি। এখানে ভালো জিনিস কম দামে পাওয়া যায়।’
নিউ মার্কেটে দরদাম করে পণ্য কেনার সুযোগ আছে। অন্য বাজারের তুলনায় এখানে দামও তুলনামূলক কম।
গৃহিণী শাহিনা বেগম খবরের কাগজকে বলেন, ‘আমার বিয়ে হয়েছে প্রায় ২৬ বছর। সংসার জীবনের শুরুতেই নিউ মার্কেট থেকে বাজার করি। আমার মাও এখান থেকে কেনাকাটা করতেন। এখানে শাড়ি, জামা, জুতা-স্যান্ডেল থেকে ঘর-গৃহস্থালিসহ সব ধরনের জিনিসপত্র পাওয়া যায়। যানজটের এই শহরে এক জায়গা থেকে আরেক জায়গায় যেতে অনেক সময় লাগে। নিউ মার্কেটে এক জায়গায় কেনাকাটা করা যায়। এতে সময় কম লাগে।’
আরেক জন ক্রেতা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী সোহানুর রহমান খবরের কাগজকে বলেন, নিউ মার্কেটে হাল ফ্যাশনের পোশাক, জুতা পাওয়া যায়। আমি পোশাক জুতা নিউ মার্কেট থেকে কিনি। খাতাপত্র, বই, কাগজকলমও এখান থেকেই কিনি। আমার বন্ধুরাও এখান থেকে কেনে।
নিউ মার্কেটে টানা তিন প্রজন্ম শাড়ির ব্যবসা করছে ‘খান ব্রাদার্স’। দোকানটির এক বিক্রেতা খবরের কাগজকে বলেন, এখানে সব ধরনের শাড়ি পাওয়া যায়। এখানকার শাড়ির দাম ৫০০ টাকা থেকে ১ হাজার, ১ হাজার ৫০০ টাকা বা তার বেশি। কাতান, টাঙ্গাইল জামদানি, হাফ সিল্ক, বিয়ের লেহেঙ্গা, শাড়ি, বেনারসিসহ সব রকমের শাড়ি আছে।
নিউ মার্কেটে জামা-কাপডের দোকান এল মোহাম্মদ স্টোর, বেকারি পণ্যের দোকান জিএমজি স্টোর, থালাবাসনের দোকান নাজমা স্টোর, ওড়নার দোকান ম্যাচিং ফেয়ার, ব্যাগের দোকান মদিনা লেদার স্টোর, বাই-স্টেশনারির দোকান বুক-ভিলা ক্রোকারিজের দোকানসহ প্রায় সব দোকানেই সকাল থেকে দোকান খোলা থাকা পর্যন্ত ক্রেতার ভিড় দেখা গেল।
নিউ মার্কেটের ২ নম্বর গেট দিয়ে খানিকটা যেতেই বাহারিসব জুলেয়ারির দোকান। এখান থেকে কিছু দূর এগিয়ে মেয়েদের রকমারির পোশাক বিক্রি হচ্ছে। মেয়েদের হাল ফ্যাশনের ওয়ান পিস, টু পিস এবং থ্রি পিসসহ ভারত, পাকিস্তানের বিভিন্ন ডিজাইনের পোশাক বিক্রি হচ্ছে, যা সাধারণ আয়ের ক্রেতার বাজেটের মধ্যেই আছে।
নিউ মার্কেটে চৌকির ওপরে জিনিসপত্র রেখে বিক্রি করছেন মো. সুমন। তিনি খবরের কাগজকে বলেন, চৌকির ওপর রেখে মেয়েদের পোশাক, ক্লিপ, চুরি, মালা বিক্রি করি। দোকানের মধ্যে যে দামে বিক্রি হয় আমি তার থেকে কম রাখি। এখানকার ক্রেতারা হলেন ভার্সিটিপড়ুয়া মেয়ে।
পছন্দমতো ওড়না, হিজাব, স্কার্ফ কিনতে চাইলে নিউ মার্কেটের কিছুটা ভেতরে গেলেই পাওয়া যাবে। সুতি ওড়না ৭০-৮০ টাকা থেকে শুরু করে ডিজাইনভেদে দাম বাড়ে। আরও বিক্রি হচ্ছে স্টোন ওয়ার্কের ওড়না, স্কার্ফ, হিজাব। এসবের ক্রেতাদের বেশির ভাগই নারী।
নানা রকমের প্যান্ট, জিন্স পাওয়া যায় এখানে। দাম ২৫০ টাকা থেকে শুরু। ব্যাগি জিন্স, ফোরমাল প্যান্ট, কার্গো প্যান্ট- সবই পাওয়া যায়। কটন ট্রাউজার, স্পোর্টস প্যান্ট, শর্ট প্যান্টও বিক্রি হচ্ছে। দাম ১০০-১৫০ টাকা থেকে শুরু।
রাজধানীর নিউ মার্কেটে মালা, চুড়ি, কানের দুল, ঘড়ি, প্রসাধনী বিক্রি হচ্ছে। ক্লিপ, ঝুমকা, ছোট মালা, পুঁতির মালা, রেশমি কাচের চুড়ি সবই পাওয়া যায়। দাম ২০ টাকা থেকে শুরু হয়ে একশ-দুশ বা তার বেশি। ছোট গহনার পাশাপাশি বিয়ে, বড় অনুষ্ঠানে পরার জন্য ভারী, বড় গহনাও বিক্রি হয়। এসব ডিজাইনের তারতম্যভেদে দামের ওঠানামা করছে। কলেজ, ভার্সিটি, অফিসে ব্যবহার করাসহ সব ধরনের ব্যাগ পাওয়া যায় এখানে। দাম ২০০ টাকা থেকে ২ হাজার, ৫ হাজার বা তার বেশি। নিউ মার্কেটে ‘প্যাকার্স কিং’ নামের ৩০৫ ও ৩০৬ নম্বর দোকান। এখানে বিভিন্ন ধরনের ব্যাগ, লাগেজ, মানি ব্যাগ পাওয়া যায়। বিভিন্ন ধরনের খেলনা বিক্রি হয় আরেক দোকানে। বিক্রেতা জানান, পালা-পার্বণের আগে ৫০ শতাংশ ডিসকাউন্টেও বিক্রি করি।
নিউ মার্কেটে গত চার বছর ধরে মো. পিন্টু চৌকির ওপর বাচ্চাদের পোশাক বিক্রি করেন। তিনি বলেন, জিরো সাইজের বাচ্চার কাপড়ের দাম ৫০ টাকা থেকে শুরু, ২-৪ বছর বয়সী বাচ্চার কাপড়ের দাম ২০০ টাকা থেকে শুরু।
নিউ মার্কেটে ঘর সাজানোর সামগ্রী, রান্না করার ননস্টিক প্যান, মার্বেল কোটিং প্যান, রান্না করে খাবার পরিবেশনের জন্য আধুনিক ডিজাইনের ডিনার সেট, ফিরনি সেট, চামচ, মগ, প্লেট সব কিছুই পাওয়া যায়। এখানে বেকারির খাবারও পাওয়া যায়। দাম অন্য মার্কেটের চেয়ে তুলনামূলক কম। একানকার দোকানে বাসায় বানানো নানা পদের কেক, বিস্কুটও বিক্রি হয়।