চট্টগ্রামের বাজারে কমেছে শীতকালীন সবজির দাম। কিন্তু পেঁয়াজের দামে ঊর্ধ্বগতিই থাকছে। ভারত থেকে পেঁয়াজ আমদানি করা হলেও খুচরা বাজারে এর প্রভাব পড়েনি। ফলে বাজারে সবজিতে স্বস্তি পেলেও পেঁয়াজে অস্বস্তি ক্রেতাদের। অনেকেই পেঁয়াজকে বাজারের তালিকা থেকে বাদ দিয়েছেন, অনেকে কিনছেন আগের চেয়ে পরিমাণে অর্ধেক।
জানা গেছে, সপ্তাহের ব্যবধানে শীতকালীন সবজির দাম অর্ধেক কমেছে চট্টগ্রামের বাজারে। বাজারে সবজির সরবরাহ পর্যাপ্ত রয়েছে। ফুলকপি, বাঁধাকপি, শিম, বরবটি, মুলা, গাজর, শসা সপ্তাহের ব্যবধানে দাম অর্ধেকে নেমেছে। খুচরা ব্যবসায়ীদের কাছে শীতকালীন সব ধরনের সবজি রয়েছে। ক্রেতারা সবজি কিনে আনন্দ পাচ্ছেন।
খুচরা বাজারে ফুলকপি-বাঁধাকপি ৪০ টাকা ও মুলা ৪০ টাকায় বিক্রি হচ্ছে। লাউ ৩০ টাকা কেজিতে বিক্রি হচ্ছে। নতুন আলু ৪০, পুরোনো আলু ২৩ টাকায় বিক্রি হচ্ছে। মিষ্টিকুমড়া ৪০ টাকা, প্রতি হালি কাঁচকলা ৪০ টাকা, পেঁপে ৩৫ টাকা, কাঁচা মরিচ ৫০ টাকা, ধনেপাতা ৮০ টাকা কেজিতে বিক্রি হচ্ছে। শিম ৮০ টাকা, তিতি করলা ৭০ টাকা, বেগুন ৪০ টাকা, শসা বড় সাইজ ৭০ টাকা, ছোট সাইজের ৪০ টাকা কেজিতে বিক্রি হচ্ছে। বরবটি ৮০ টাকা, গাজর ৪০ টাকায় বিক্রি হচ্ছে।
গত সপ্তাহে দেশি পেঁয়াজ পাইকারিতে প্রতি কেজি ১০০ থেকে ১২০ টাকায় বিক্রি হয়েছিল। কিন্তু দুই দিনে কেজিতে অন্তত ২০ থেকে ৩০ টাকা বেড়ে বিক্রি হচ্ছে ১৪০ থেকে ১৫০ টাকায়। খুচরায় পেঁয়াজ বিক্রি হচ্ছে ১৫০ থেকে ১৬০ টাকায়। খুচরায় ক্রেতাদের পেঁয়াজ কিনতে অনীহা দেখা যাচ্ছে। আগে যেখানে এক থেকে দুই কেজি পেঁয়াজ কিনতেন এমন ক্রেতা এখন কিনছেন আধা কেজি। পেঁয়াজ ভারত থেকে আমদানি করা হলেও বাজারে কোনো ধরনের প্রভাব পড়েনি।
চট্টগ্রামের ষোলশহরের কর্ণফুলী মার্কেটে বাজার করতে আসা গৃহিণী শারমিন আক্তার বলেন, ‘আগে এক থেকে দুই কেজি পেঁয়াজ কিনতাম, এখন কিনছি আধা কেজি। দাম বেড়েছে অস্বাভাবিক। না খেলে সমস্যা কোথায়? আমরা যদি পেঁয়াজকে বর্জন করি, তাহলে দাম অটোমোটিক কমে যাবে। এমন তো নয় যে পেঁয়াজ ছাড়া তরকারি রান্না করা যাবে না। পেঁয়াজের বদলে পেঁয়াজের ফুল বেশি করে তরকারিতে দেওয়া যায়। বাজারে ৪০ টাকায় ফুল পাওয়া যাচ্ছে।’
এদিকে বাজারে ব্রয়লার মুরগি ১৪৫ থেকে ১৫০ টাকা, সোনালি মুরগি ৩০০ থেকে ৩৩০ টাকা, লেয়ার ৩০০ টাকা, দেশি মুরগি ৫৫০ থেকে ৫৬০ টাকা দরে বিক্রি হচ্ছে। হাঁসের মধ্যে দেড় কেজি ওজনের প্রতি পিস দেশি হাঁস ৫০০ টাকা, দুই কেজি ওজনের চীনা হাঁস প্রতি পিস ১ হাজার থেকে ১ হাজার ৭০০ টাকা দরে বিক্রি হচ্ছে।
গরুর মাংস প্রতি কেজি ৭৮০ থেকে ৯০০ টাকা, খাসির মাংস ১ হাজার ২০০ টাকা কেজি দরে বিক্রি হচ্ছে। এ ছাড়া প্রতি ডজন লাল ডিম ১২০ টাকা থেকে কমে ১১০ টাকায়, সাদা ডিম ১২০ থেকে ১২৫ টাকা ও দেশি হাঁসের ডিম ১৯০ থেকে ২০০ টাকা দরে বিক্রি হচ্ছে।
মাছের মধ্যে লইট্যা ১৮০ থেকে ২০০ টাকা, কোরাল ৭০০ থেকে ৯০০ টাকা, আইড় ৬০০ থেকে ৭৫০ টাকা, চিংড়ি প্রকারভেদে ৭৫০ থেকে ১ হাজার ২০০ টাকা কেজি দরে বিক্রি হয়েছে। এ ছাড়া খাল-নদী ও চাষের মাছের মধ্যে রুই ও কাতলা ৩৫০ থেকে ৪৫০ টাকা, ছোট আকারের পাবদা ৪০০ টাকা, মাঝারি সাইজের ৫০০ থেকে ৬০০ টাকা, শিং ৪০০ থেকে ৫০০ টাকা, টেংরা ৬০০ থেকে ৭০০ টাকা, পুঁটি ২০০ থেকে ২৫০ টাকা, সরপুঁটি ৩০০ থেকে ৪৫০ টাকা, তেলাপিয়া বড় সাইজের ২৫০ থেকে ৩০০ টাকা, নাইলেটিকা ২২০ থেকে ২৮০ টাকা, কৈ ২০০ থেকে ২২০ টাকা এবং পাঙাশ ও সিলভার কার্প ১৮০ থেকে ২৮০ টাকা কেজি দরে বিক্রি হচ্ছে।
চট্টগ্রামের ষোলশহর ২ নম্বর গেট রেল বিটের সবজি বিক্রেতা জাহাঙ্গীর আলম খবরের কাগজকে বলেন, ‘শীতকালীন সব সবজির দাম অর্ধেক কমেছে। আগামী সপ্তাহে আরও কমতে পারে। কারণ বাজারে পর্যাপ্ত সবজি পাওয়া যাচ্ছে। সবজি কিনে ক্রেতারা স্বস্তি পাচ্ছেন। আমরাও বেশি বিক্রি করতে পারছি।’
খাতুনগঞ্জ ট্রেড অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রিজ অ্যাসোসিয়েশনের আইনবিষয়ক সম্পাদক এবং চাক্তাই-খাতুনগঞ্জ আড়তদার সমিতির সাধারণ সম্পাদক ও ভোগ্যপণ্য আমদানিকারক মো. মহিউদ্দিন খবরের কাগজকে বলেন, ভোগ্যপণ্যের বাজারে অস্থিরতা তৈরির সম্ভাবনা রয়েছে। পেঁয়াজের দাম যে হারে বাড়ছে সেটি নিয়ন্ত্রণ করা না গেলে বাজার অস্তির হয়ে যাবে। তবে সরকার নিয়ন্ত্রণের জন্য আমদানির অনুমতি দিয়েছিল। সেখানে সরকারের ভুল নীতির কারণে সমস্যা সৃষ্টি হয়েছে। আমদানি উন্মুক্ত করে দেওয়া হয়নি। সীমাবদ্ধতা রাখায় বাজারে দাম কমেনি। বরং যিনি আমদানি করছেন তিনিই মজুত করে রাখছেন।
চট্টগ্রামের খাতুনগঞ্জের হামিদুল্লাহ মিয়া মার্কেট ব্যবসায়ী কল্যাণ সমিতির সাধারণ সম্পাদক মো. ইদ্রিস বলেন, ডিসেম্বরে নতুন মুড়িকাটা পেঁয়াজ বাজারে এসেছে। কিন্তু কৃষক পর্যায়ে সেই পেঁয়াজ মজুত করেছে। তাই বাজারে দাম কমেনি। পেঁয়াজের দাম উল্টো বেড়ে যাওয়ায় আমদানির অনুমতি দেওয়া হয়েছে। কিন্তু এর সুফল গ্রাহকরা পাচ্ছেন না।
কনজ্যুমারস অ্যাসোসিয়শন অব বাংলাদেশের (ক্যাব) কেন্দ্রীয় কমিটির ভাইস প্রেসিডেন্ট এস এম নাজের হোসাইন খবরের কাগজকে বলেন, বাজারে তদারকিব্যবস্থা জোরদার করা হচ্ছে না। আমরা এটা দেখছি না। তাই ব্যবসায়ীরা যে যার মতো করে দাম বাড়িয়ে পণ্য বিক্রি করছে। একবার কোনো পণ্যের দাম বাড়লে সেটি আর কমে না। এভাবে চলতে থাকলে সাধারণ মানুষের ভোগান্তি কোনো দিন দূর হবে না।’
জাতীয় ভোক্তা অধিকার সংরক্ষণ অধিদপ্তর চট্টগ্রাম বিভাগীয় কার্যালয়ের উপপরিচালক ফয়েজ উল্যাহ বলেন, ‘মাঠ পর্যায়ে আমাদের অভিযান অব্যাহত আছে। আমরা আমাদের সীমিত জনবল নিয়ে যতটা সম্ভব আন্তরিকতার সঙ্গে কাজ করে যাচ্ছি। অপরাধ প্রমাণিত হলে আইন প্রয়োগ করছি।’