নিউমুরিং কনটেইনার টার্মিনাল (এনসিটি) সংযুক্ত আরব আমিরাতভিত্তিক কোম্পানি ডিপি ওয়ার্ল্ডের কাছে ইজারা দেওয়ার প্রতিবাদে শ্রমিক-কর্মচারীদের আন্দোলন দিনে দিনে আরও তীব্র হচ্ছে। আট ঘণ্টার কর্মবিরতি এখন রূপ নিয়েছে ২৪ ঘণ্টায়। সঙ্গে দেওয়া হয়েছে আরও কঠোর কর্মসূচির হুঁশিয়ারি।
আরও কঠোর কর্মসূচি
এনসিটি বিদেশি কোম্পানির কাছে ইজারা দেওয়ার সরকারি সিদ্ধান্তের প্রতিবাদে বিক্ষোভ মিছিল, কর্মবিরতিসহ বিভিন্ন কর্মসূচি চালিয়ে যাচ্ছে চট্টগ্রাম বন্দর জাতীয়তাবাদী শ্রমিক দল, চট্টগ্রাম বন্দর রক্ষা সংগ্রাম পরিষদ ও শ্রমিক কর্মচারী ঐক্য পরিষদ (স্কপ)। সংগঠনগুলোর নেতারা বলছেন, গত ৩১ জানুয়ারি চারজন ও ১ ফেব্রুয়ারি পৃথক আদেশে ১২ জনকে বদলি করা হয়েছে। তারা দাবি করছেন, আন্দোলনকে দুর্বল করে দেওয়ার জন্য বদলি করা হচ্ছে। তাই তারা আন্দোলনের মাত্রা ধীরে ধীরে তীব্র করছেন। গত ৩১ জানুয়ারি থেকে ২ ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত সকাল ৮টা থেকে বিকেল ৪টা পর্যন্ত কর্মবিরতি পালন করেছেন বন্দরের শ্রমিক-কর্মচারীরা। এবার কর্মবিরতির সময় আট থেকে বেড়ে ঠেকেছে ২৪ ঘণ্টায়। মঙ্গলবার সকাল ৮টা থেকে বুধবার সকাল ৮টা পর্যন্ত কর্মবিরতি পালন করবেন তারা।
বন্দর রক্ষা সংগ্রাম পরিষদের অন্যতম সমন্বয়ক ইব্রাহিম হোসেন বলেন, মঙ্গলবার সকাল ৮টা থেকে টানা ২৪ ঘণ্টা কর্মবিরতি পালন করা হবে। যেসব কর্মচারীকে বদলি করা হয়েছে, তা প্রত্যাহার করতে হবে। অন্যথায় আরও কঠোর কর্মসূচির ঘোষণা করা হবে।
এদিকে বন্দরের এনিসিটি টার্মিনাল ইজারা দেওয়ার সিদ্ধান্তের প্রতিবাদে বন্দর অভিমুখে কালো পতাকা মিছিল ও সমাবেশ করেছে স্কপ। সোমবার (২ ফেব্রুয়ারি) বেলা ১১টায় নগরের আগ্রাবাদ বাদামতলী মোড়ে স্কপের নেতা-কর্মীরা জড়ো হয়ে বন্দর অভিমুখে কালো পতাকা মিছিল শুরু করেন। পতাকা মিছিলটি নগরের বাদামতলী মোড় থেকে শুরু হয়ে যমুনা ভবনের সামনে গিয়ে শেষ হয়। এই কর্মসূচি থেকে এনসিটি ইজারা দেওয়ার সিদ্ধান্ত থেকে সরে আসার দাবি জানানো হয়।
১৬ জন বদলি, নতুন কর্মস্থলে যোগ দেননি কেউই
এনসিটি ইস্যুতে আন্দোলনে জড়িতদের মধ্যে এখন পর্যন্ত ১৬ জনকে বদলি করেছে চট্টগ্রাম বন্দর কর্তৃপক্ষ। এর মধ্যে গত ৩১ জানুয়ারি আন্দোলনে নেতৃত্বদানকারী চারজনকে বদলি করা হয়। তারা হলেন- অডিট সহকারী মো. হুমায়ুন কবীর (অভ্যন্তরীণ নিরীক্ষা ও পরিদর্শন বিভাগ), ইঞ্জিন ড্রাইভার মো. ইব্রাহিম খোকন (১ম শ্রেণি-নৌবিভাগ), উচ্চ হিসাব সহকারী মো. আনোয়ারুল আজিম (অর্থ ও হিসাব বিভাগ), এসএস খালাসি মো. ফরিদুর রহমানকে (প্রকৌশল বিভাগ) বদলি করা হয়েছিল। এর মধ্যে আছেন চট্টগ্রাম বন্দর জাতীয়তাবাদী শ্রমিক দলের সাধারণ সম্পাদক ইব্রাহীম খোকন। হুমায়ুন কবীর দলটির প্রচার সম্পাদক এবং সদস্য পদে আছেন আনোয়ারুল আজীম ও ফরিদুর রহমান। তাদের ঢাকার পানগাঁও কনটেইনার টার্মিনালে বদলি করা হয়।
অপরদিকে গত ১ ফেব্রুয়ারি পৃথক আদেশে বদলি করা হয় ১২ জনকে। একটি আদেশে বদলি করা হয় সাতজনকে। তারা হলেন– পরিবহন বিভাগের উচ্চ বহিঃসহকারী মোহাম্মদ শফি উদ্দিন ও রাশিদুল ইসলাম, পরিকল্পনা বিভাগের স্টেনো টাইপিস্ট মো. জহিরুল ইসলাম, বিদ্যুৎ বিভাগের এসএস পেইন্টার হুমায়ুন কবির, প্রশাসন বিভাগের উচ্চমান সহকারী মো. শাকিল রায়হান, যান্ত্রিক বিভাগের ইসিএম ড্রাইভার মানিক মিঝি ও প্রকৌশল বিভাগের মেসন মো. শামসু মিয়া। এর মধ্যে চারজনকে ঢাকার কমলাপুর কনটেইনার ডিপোয় ও তিনজনকে ঢাকার কেরানীগঞ্জের পানগাঁও ইনল্যান্ড কনটেইনার টার্মিনালে বদলি করা হয়েছে।
আরেকটি আদেশে বদলি করা হয় পাঁচজনকে। তারা হলেন- উচ্চ বহিঃসহকারী আবদুল্লাহ আল মামুন, স্টেনো টাইপিস্ট খন্দকার মাসুদুজ্জামান, ড্রাইভার মো. লিয়াকত আলী ও আমিনুর রসুল বুলবুল এবং খালাসি মো. রাব্বানী। তাদের পানগাঁও আইসিটিতে সংযুক্ত করা হয়েছে। সোমবার (২ ফেব্রুয়ারি) তাদেরকে পদায়নকৃত কর্মস্থলে যোগদান করতে বলা হয়েছে। তবে তাদের কেউই নতুন কর্মস্থলে যোগ দেননি।
চট্টগ্রাম বন্দর জাতীয়তাবাদী শ্রমিক দলের সাধারণ সম্পাদক ইব্রাহীম খোকন খবরের কাগজকে বলেন, আমরা কেউ নতুন কর্মস্থলে যোগদান করিনি। বরং কর্মবিরতির সময়সীমা বাড়ানো হয়েছে। এতদিন আমরা আট ঘণ্টার কর্মবিরতি পালন করেছি। মঙ্গলবার সকাল ৮টা থেকে ২৪ ঘণ্টা কর্মবিরতি পালন করা হবে। এভাবে সময়সীমা বাড়তে থাকবে।
বন্দর রক্ষা সংগ্রাম পরিষদের সমন্বয়ক ও বন্দর শ্রমিক দল নেতা হুমায়ুন কবীর বলেন, আমরা শান্তিপূর্ণ আন্দোলন করছি। অথচ বন্দর কর্তৃপক্ষ অন্যায়ভাবে বদলি আদেশ দিচ্ছে এই আন্দোলন দমন করার জন্য। আমরা অবিলম্বে এ অন্যায় বদলি আদেশ প্রত্যাহারের দাবি জানাচ্ছি। পাশাপাশি মঙ্গলবার সকাল ৮টা থেকে পরবর্তী ২৪ ঘণ্টা বন্দরে কর্মবিরতি চলবে। বিডার আশিক চৌধুরী, বন্দর চেয়ারম্যান এসএম মনিরুজ্জামান ও পরিচালক (প্রশাসন) ওমর ফারুকের অপসারণ দাবি করছি। তাদের বিচারের আওতায় আনারও দাবি জানাচ্ছি।
সোমবার আরও ১৫ জনকে বদলি
এনসিটি ইজারার বিরুদ্ধে আন্দোলনরত ১৫ কর্মচারীকে খুলনার মোংলা বন্দর ও পটুয়াখালীর পায়রা বন্দরে বদলি করা হয়েছে। সোমবার (২ ফেব্রুয়ারি) নৌপরিবহন মন্ত্রণালয়ের সহকারী সচিব মো. বেলায়েত হোসেন স্বাক্ষরিত আদেশে দাপ্তরিক প্রয়োজনে বদলিপূর্বক সংযুক্তি প্রদান করার কথা জানানো হয়। এর মধ্যে আটজনকে পায়রা বন্দরে এবং সাতজনকে মোংলা বন্দরে বদলি করা হয়েছে।
অচলাবস্থা বন্দরে
এদিকে শ্রমিক-কর্মচারীদের গত ৩১ জানুয়ারি থেকে টানা কর্মবিরতির কারণে বন্দরে অচলাবস্থা তৈরি হয়েছে। বন্দর জেটিতে জাহাজ থেকে কনটেইনার ও পণ্য ওঠানো-নামানোর কার্যক্রম ব্যাহত হচ্ছে।
চট্টগ্রাম বন্দরের ট্রাফিক বিভাগ থেকে পাওয়া তথ্যমতে, চট্টগ্রাম বন্দরে কনটেইনার সংখ্যা বাড়ছে। গত ৩১ জানুয়ারি বন্দর ইয়ার্ডে ৩২ হাজার ১১১ টিইইউএস কনটেইনার ছিল। ১ ফেব্রুয়ারি সে সংখ্যা বেড়ে দাঁড়ায় ৩২ হাজার ৮৭৩ টিইইউএসে। অপরদিকে বন্দর থেকে কনটেইনার ডেলিভারির হারও কমে গেছে। গত ৩১ জানুয়ারি বন্দর থেকে ৩ হাজার ১০২ টিইইউএস কনটেইনার ডেলিভারি হয়। ১ ফেব্রুয়ারি কনটেইনার ডেলিভারির সংখ্যা কমে দাঁড়ায় ১ হাজার ৭৫০ টিইইউএসে।
বার্থিং সভা পণ্ড
সোমবার সকালে বার্থিং সভায় অংশ নিতে শিপিং এজেন্টরা বন্দর ভবনের নিচতলার কক্ষে উপস্থিত হতে থাকেন। বার্থিং সভায় জাহাজ আগমনের ঘোষণাও দেন শিপিং এজেন্টরা। এ সময় একদল আন্দোলনকারী সবাইকে বেরিয়ে যেতে বলেন। এ নির্দেশনার পর শিপিং এজেন্টরা কক্ষ ত্যাগ করেন। ফলে সভাটি পণ্ড হয়ে যায়।
অনুকূল না হলে চুক্তি হবে না: নৌপরিবহন উপদেষ্টা
গতকাল সোমবার সচিবালয়ে সাংবাদিকদের সঙ্গে আলাপকালে নৌপরিবহন উপদেষ্টা ব্রিগেডিয়ার জেনারেল (অব.) এম সাখাওয়াত হোসেন বলেছেন, দেশের জন্য অনুকূল না হলে চট্টগ্রাম বন্দরের নিউমুরিং কনটেইনার টার্মিনাল (এনসিটি) সংযুক্ত আরব আমিরাতভিত্তিক কোম্পানি ডিপি ওয়ার্ল্ডের কাছে ইজারা দেওয়া হবে না। ডিপি ওয়ার্ল্ডের সঙ্গে এখনো চুক্তি হয়নি জানিয়ে তিনি বলেন, যদি আমাদের জন্য অনুকূল হয় তবে চুক্তি হবে, অনুকূল না হলে হবে না। দেশের স্বার্থবিরোধী কোনো চুক্তি এ সরকার করবে না।