একসময় দেশের বাইরে গেলেই ক্রেডিট কার্ডের মাধ্যমে লেনদেন করতেন গ্রাহক। এখন দেশের ভেতরেও বাড়ছে ক্রেডিট কার্ডের লেনদেন। অনেকে মূল্যস্ফীতির চাপে বড় খরচ মেটাতে ক্রেডিট কার্ডের ওপর নির্ভর করছেন। বাংলাদেশ ব্যাংকের হালনাগাদ প্রতিবেদন অনুযায়ী, নভেম্বর মাসে দেশের ভেতরে ক্রেডিট কার্ডের ব্যবহার বেড়েছে ২৫ দশমিক ৪৭ শতাংশ। একই সময়ে দেশের বাইরে ক্রেডিট কার্ডের ব্যবহা্র বেড়েছে ১৮ দশমিক ৫৫ শতাংশ।
সংশ্লিষ্টরা বলছেন, উচ্চ মূল্যস্ফীতির চাপে মানুষের আয়-ব্যয়ের ব্যবধান বাড়ছে। ফলে ক্রেডিট কার্ডের ওপর মানুষের নির্ভরতা বাড়ছে। তাদের মতে, অধিকাংশ মানুষ আগে দেশের বাইরে গেলে কেবল ক্রেডিট কার্ডের ব্যবহার করতেন। এখন তারা দেশের ভেতরেই ক্রেডিট কার্ডের মাধ্যমে কেনাকাটা করছেন। সুপারশপ ও বড় দোকানগুলোতে সহজে কার্ড গ্রহণের ব্যবস্থা, ব্যাংকের বিভিন্ন ছাড় ও কিস্তি সুবিধা এবং নিত্যপণ্যের দাম বেড়ে যাওয়ার প্রভাব ক্রেডিট কার্ডে লেনদেন বাড়ার পেছনে বড় ভূমিকা রেখেছে।
এ প্রসঙ্গে জানতে চাইলে একটি বেসরকারি ব্যাংকের কার্ড বিভাগের প্রধান নাম প্রকাশ না করার শর্তে খবরের কাগজকে বলেন, ‘শহরের শিক্ষিত জনগোষ্ঠী এখন আর নগদ টাকা দিয়ে লেনদেন করতে স্বাচ্ছন্দ্যবোধ করেন না। তাই তারা ডেবিট কার্ডের পাশাপাশি ক্রেডিট কার্ডেও লেনদেন করছেন। আবার বর্তমান উচ্চ মূল্যস্ফীতির চাপে অনেকে বড় খরচ মেটাতে ক্রেডিট কার্ডের ওপর নির্ভর করছে। আর গ্রাহকের আগ্রহকে প্রাধান্য দিয়ে ব্যাংকগুলোও সারা বছর ক্রেডিট কার্ডে নানা ধরনের ছাড় দিয়ে থাকে।’
সম্প্রতি বাংলাদেশ ব্যাংকের প্রকাশিত প্রতিবেদনের তথ্য পর্যালোচনায় দেখা যায়, ক্রেডিট কার্ড ব্যবহার করে দেশের ভেতরে সবচেয়ে বেশি খরচ হচ্ছে ডিপার্টমেন্টাল স্টোরগুলোতে। ২০২৫ সালের নভেম্বর মাসে দেশে ক্রেডিট কার্ডে মোট লেনদেন হয়েছে ৩ হাজার ৫০৪ কোটি টাকা, যা আগের মাস অক্টোবরের তুলনায় সামান্য বেশি। অক্টোবর মাসে লেনদেন হয়েছিল ৩ হাজার ৪৭১ কোটি টাকা। এর মধ্যে ১ হাজার ৫৮৯ কোটি টাকা, অর্থাৎ প্রায় অর্ধেকই ব্যয় হয়েছে ডিপার্টমেন্টাল স্টোরে। খরচের তালিকায় এরপর রয়েছে খুচরা দোকান, ইউটিলিটি বিল পরিশোধ, নগদ টাকা উত্তোলন এবং ওষুধ ও ফার্মেসি।
দেশের বাইরেও কার্ডে লেনদেন বাড়ছে। গত বছরের নভেম্বর মাসে বাংলাদেশি কার্ডধারীরা বিদেশে ক্রেডিট কার্ডে খরচ করেছেন ৫১১ কোটি ২০ লাখ টাকা। বিপরীতে, বিদেশি নাগরিকরা বাংলাদেশে কার্ড ব্যবহার করে খরচ করেছেন ৩৬০ কোটি টাকা।
তথ্য বিশ্লেষণে দেখা যায়, ক্রেডিট কার্ড ব্যবহার করে গত নভেম্বর মাসে বাংলাদেশিরা সবচেয়ে বেশি খরচ করেছেন যুক্তরাষ্ট্রে। ওই মাসে দেশটিতে ক্রেডিট কার্ডে লেনদেন হয়েছে ৬৯ কোটি ৮০ লাখ টাকা। এরপর রয়েছে সিঙ্গাপুরে ৫৩ কোটি ৮০ লাখ টাকা, থাইল্যান্ডে ৫২ কোটি ৮০ লাখ টাকা, যুক্তরাজ্যে ৪৭ কোটি ১০ লাখ টাকা, মালয়েশিয়ায় ৩৫ কোটি টাকা এবং ভারতে ৩৪ কোটি টাকা।
ব্যাংক কর্মকর্তারা বলছেন, গত বছরের তুলনায় বিদেশে ক্রেডিট কার্ডে ব্যয় বাড়ার পেছনে প্রধানত দুটি কারণ রয়েছে। রাজনৈতিক পরিস্থিতির স্থিতিশীলতা ও ডলার সংকট কেটে যাওয়া। এই বিষয়ে জানতে চাইলে ওই ব্যাংক কর্মকর্তা বলেন, ‘২০২৪ সালের আগস্টে ক্ষমতার পালাবদলের কারণে দেশে রাজনৈতিক অস্থিরতা তৈরি হয়। এ জন্য সে সময় বিদেশে ভ্রমণ কম করেন বাংলাদেশিরা। এখন রাজনৈতিক পরিস্থিতি কিছুটা স্থিতিশীল হওয়ায় আবার চিকিৎসা, ভ্রমণসহ বিভিন্ন কাজে মানুষ দেশের বাইরে যাচ্ছে। ফলে ক্রেডিট কার্ডের ব্যবহারও বাড়ছে।
তিনি আরও বলেন, ‘বর্তমানে ডলার সংকটও অনেকটা কেটে গেছে। ব্যাংকগুলোতে ডলার সরবরাহ আগের চেয়ে অনেক বেশি। বর্তমান সময়ের মতো ২০২৪ সালে ব্যাংকগুলোতে এত ডলার সরবরাহ ছিল না। তাই সে সময় নগদ কিংবা কার্ডেও ডলার সহজে পাওয়া যেত না। যদিও বাংলাদেশ ব্যাংকের নিয়ম অনুযায়ী, বাংলাদেশি নাগরিকরা বিদেশে বছরে ১২ হাজার ডলার ক্রেডিট কার্ডের মাধ্যমে ব্যয় করতে পারেন।’
প্রতিবেদনে দেখা যায়, ২০২০ সালের ডিসেম্বর শেষে দেশে ডেবিট, ক্রেডিট ও প্রিপেইড মিলিয়ে মোট কার্ড ইস্যু ছিল ২৩ লাখ ৭১ হাজার। পাঁচ বছর পর ২০২৫ সালের নভেম্বর পর্যন্ত সেই সংখ্যা বেড়ে দাঁড়িয়েছে ৫২ লাখ ৪৯ হাজারে। এই সময়ে কার্ডের সংখ্যা বেড়েছে ১২১ শতাংশ। একই সঙ্গে লেনদেনেও বড় উল্লম্ফন দেখা গেছে। ২০২০ সালের ডিসেম্বর শেষে সব ধরনের কার্ডে মোট লেনদেন হয়েছিল ২০ হাজার ৫২৪ কোটি টাকা। আর ২০২৫ সালের নভেম্বর পর্যন্ত তা বেড়ে দাঁড়িয়েছে ৪৭ হাজার ৭৬ কোটি ২০ লাখ টাকা বা ১২৯ শতাংশ।
ব্যাংক খাত-সংশ্লিষ্টরা বলছেন, কার্ডের ব্যবহার বাড়ায় আর্থিক অন্তর্ভুক্তি জোরদার হচ্ছে। ডিজিটাল লেনদেন বাড়লে অর্থনীতিতে স্বচ্ছতা বাড়বে, লেনদেন ব্যয় কমবে এবং সময় সাশ্রয় হবে। তবে গ্রামাঞ্চলে ডিজিটাল অবকাঠামোর সীমাবদ্ধতা, সাইবার নিরাপত্তা নিয়ে উদ্বেগ এবং কার্ড ব্যবহারে আস্থার ঘাটতি এখনো বড় চ্যালেঞ্জ।
প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, সামগ্রিকভাবে বাংলাদেশ ব্যাংকের গৃহীত উদ্যোগ নগদবিহীন ব্যাংকিং ব্যবস্থার প্রসারে সফল হয়েছে এবং কার্ড ব্যবহারের অব্যাহত বৃদ্ধি বাংলাদেশে আরও ডিজিটালভাবে অন্তর্ভুক্তিমূলক আর্থিক ব্যবস্থাপনায় ইতিবাচক প্রবণতা নির্দেশ করে। তবুও, আশা করা হচ্ছে যে, বাংলাদেশের উন্নয়ন অব্যাহত থাকলে এবং জনগণের জীবনযাত্রার মান বৃদ্ধি পেলে এবং আন্তর্জাতিক লেনদেন বৃদ্ধি পেলে কার্ডের ব্যবহার দিন দিন অব্যাহতভাবে বাড়বে।