জ্বালানিসংকটে দেশের লাইটার জাহাজ চলাচল মারাত্মকভাবে ব্যাহত হচ্ছে। চাহিদানুযায়ী জ্বালানি (ডিজেল) না পাওয়ায় পণ্য পরিবহনে সমস্যা তৈরি হয়েছে। বিশেষ করে অনেক লাইটার জাহাজ ভোগ্যপণ্য বোঝাই করলেও জ্বালানিসংকটের কারণে চট্টগ্রাম ছেড়ে যেতে পারছে না। এ কারণে ঈদে ভোগ্যপণ্যের সংকট ও দাম বেড়ে যাওয়ার আশঙ্কা তৈরি হয়েছে। এদিকে পরিস্থিতি সামাল দিতে নিরবচ্ছিন্ন তেল সরবরাহ নিশ্চিত করার দাবি জানিয়েছে বাংলাদেশ ওয়াটার ট্রান্সপোর্ট কো-অর্ডিনেশন সেল (বিডব্লিউটিসিসি)।
চট্টগ্রাম বন্দরের বহির্নোঙরে অবস্থানরত মাদার ভেসেলগুলোর (বড় জাহাজ) একটি অংশ ড্রাফটের কারণে সরাসরি বন্দর জেটিতে ভিড়তে পারে না। এসব মাদার ভেসেল থেকে পণ্য খালাস করে দেশের বিভিন্ন ঘাটে পৌঁছে দিতে লাইটার জাহাজই প্রধান ভরসা। লাইটার জাহাজ মালিকদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, চট্টগ্রাম বন্দর থেকে পণ্য পরিবহনে প্রায় দেড় হাজার লাইটার জাহাজ রয়েছে। কিন্তু ডিলারদের কাছ থেকে আগের মতো জ্বালানি না পাওয়ায় জাহাজ চলাচল ও পণ্য পরিবহনে সমস্যা হচ্ছে।
লাইটার জাহাজ মালিকদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, বর্তমানে ২০০টি লাইটার জাহাজ জ্বালানিসংকটের কারণে অলস বসে আছে। এসব জাহাজে ডাল, গম, ছোলা, চিনিসহ বিভিন্ন ভোগ্যপণ্য রয়েছে, যার পরিমাণ ৪ থেকে ৫ লাখ টন। এ কারণে ঈদে ভোগ্যপণ্যসংকট ও দাম বাড়ার আশঙ্কা করছেন লাইটার জাহাজ মালিকরা।
লাইটার জাহাজ ‘শেখ এন্টারপ্রাইজ’-এর মালিক মো. জাহাঙ্গীর বলেন, ‘সড়কপথে দুই-তিন কিলোমিটার দূরত্বে পাম্প আছে, কিন্তু নদীপথে কোনো পাম্প নেই। যাওয়া-আসা মিলিয়ে একটি লাইটার জাহাজে তিন থেকে পাঁচ হাজার লিটার জ্বালানির প্রয়োজন হয়। গত ৩ মার্চ ১৭ হাজার লিটার জ্বালানি নিয়েছিলাম। ৪ তারিখ থেকে আর পাচ্ছি না। আমার নিজেরই প্রতি মাসে দুই থেকে আড়াই লাখ লিটার জ্বালানি লাগে। আমি পদ্মা অয়েল লিমিটেডের সঙ্গে সোমবার দেখা করেছি। তারা নিশ্চিতভাবে কিছু জানাতে পারেনি। এখন লাইটার জাহাজ তো অলস বসে আছে। অনেক লাইটার জাহাজে ভোগ্যপণ্যসহ বিভিন্ন পণ্য রয়েছে। তাই ঈদে ভোগ্যপণ্যের দাম বাড়ার শঙ্কা তৈরি হয়েছে।’
বাংলাদেশ লাইটারেজ শ্রমিক ইউনিয়নের সিনিয়র সহসভাপতি নবী আলম বলেন, সংকটের কারণে লাইটার জাহাজগুলোতে চাহিদানুযায়ী জ্বালানি নেওয়া সম্ভব হচ্ছে না। আগে একটি লাইটার জাহাজে পাঁচ হাজার লিটার জ্বালানি দিলে এখন দিচ্ছে দুই থেকে তিন হাজার লিটার। তাই একটি জাহাজ পণ্য নিয়ে চট্টগ্রাম ছেড়ে গেলে আবার ঢাকা থেকে জ্বালানি সংগ্রহ করতে হয়। সেখানে জ্বালানি পাওয়া যাবে কি না, সেটাও অনিশ্চিত।
বাংলাদেশ কার্গো ভেসেল ওনার্স অ্যাসোসিয়েশন (বিসিভোয়া), কোস্টাল ভেসেল ওনার্স অ্যাসোসিয়েশন (কোয়াব) এবং ইনল্যান্ড ভেসেল ওনার্স অ্যাসোসিয়েশন অব চিটাগাং (আইভোয়াক)-এর সমন্বয়ে বাংলাদেশ ওয়াটার ট্রান্সপোর্ট কো-অর্ডিনেশন সেল গঠিত। তারাই লাইটার জাহাজগুলো পরিচালনা করে।
লাইটার জাহাজে জ্বালানি তেলের নিরবচ্ছিন্ন সরবরাহ নিশ্চিত করতে গত ৯ মার্চ বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ মন্ত্রণালয়ের সচিবকে চিঠি দিয়েছে বিডব্লিউটিসিসি। ওই চিঠিতে বলা হয়, বর্তমানে চট্টগ্রাম বন্দরের বহির্নোঙরে বিভিন্ন বাল্ক পণ্য নিয়ে প্রায় ৭৩-৭৪টি মাদার ভেসেল অবস্থান করছে। মাদার ভেসেলগুলো থেকে দেশের বিভিন্ন গন্তব্যে পণ্য পরিবহনের জন্য বিডব্লিউটিসিসি হতে প্রতিদিন প্রায় ১০০টি লাইটার জাহাজ বরাদ্দ দেওয়া হয়। লাইটার জাহাজগুলো পণ্য বোঝাই করে দেশের বিভিন্ন গন্তব্যে যাওয়া-আসার জন্য প্রতিদিন গড়ে ৪ থেকে ৫ লাখ লিটার জ্বালানি প্রয়োজন হয়। সড়কপথে ৩ থেকে ৪ কিলোমিটার পরপর পেট্রলপাম্প থাকলেও নদীপথে এই সুবিধা নেই।
বর্তমান পরিস্থিতিতে জ্বালানিসংকটের কারণে অনেক লাইটার জাহাজ পণ্য বোঝাই করে কর্ণফুলী নদীতে ভাসমান আছে। প্রয়োজনীয় জ্বালানি না পেলে লাইটার জাহাজ গন্তব্যের উদ্দেশে ছেড়ে যেতে পারছে না। আগত মাদার ভেসেল থেকে পণ্য খালাস করা সম্ভব হচ্ছে না। এ কারণে খাদ্যপণ্যসহ বিভিন্ন পণ্যের বাজার অস্থিতিশীল হয়ে পড়ার পাশাপাশি মাদার ভেসেল থেকে পণ্য খালাস কার্যক্রম বাধাগ্রস্ত হচ্ছে। এতে আন্তর্জাতিক বাজারে চট্টগ্রাম বন্দরের সুনাম ক্ষুণ্ন হওয়ার আশঙ্কা দেখা দিয়েছে। তাই চিঠিতে লাইটার জাহাজগুলোতে জ্বালানি তেলের নিরবচ্ছিন্ন সরবরাহ নিশ্চিত করার জন্য অনুরোধ করা হয়েছে।