কাজী মোতাহার হোসেন বহুমাত্রিক গুণে গুণান্বিত জন। তিনি পাণ্ডিত্য ও বিদগ্ধতায় ছিলেন অনন্য প্রতিভার অধিকারী। অধ্যাপনা ও গবেষণা, বিজ্ঞান ও সাহিত্যচর্চা, ক্রীড়া ও সংগীতের ক্ষেত্রে ছিল তার সহজাত অনুরাগ। তিনি মুসলিম সাহিত্য সমাজের অন্যতম সংগঠকও ছিলেন।
কাজী মোতাহার হোসেন ১৮৯৭ সালে বর্তমান কুষ্টিয়া জেলার কুমারখালী থানার লক্ষ্মীপুরে নানাবাড়িতে জন্মগ্রহণ করেন। মা তসিকুন্নেসা এবং বাবা কাজী গওহর উদ্দিন আহমদ। পৈতৃক নিবাস বর্তমান রাজবাড়ী জেলার পাংসার বাহাদুরপুর গ্রামে। বাবা ছিলেন ব্রিটিশ সেটেলমেন্টের আমিনদের ইন্সপেক্টর।
মোতাহার হোসেনের শিক্ষাপ্রতিভার স্ফুরণ ঘটে কৈশোরেই। শিক্ষার সূচনা পৈতৃক গ্রামের পাঠশালায়। বাগমারা নিম্নপ্রাথমিক স্কুলের চূড়ান্ত পরীক্ষায় প্রথম স্থান অধিকার করে দু-টাকা বৃত্তি লাভ করেন। উচ্চ প্রাইমারি পরীক্ষা এবং মাইনর পরীক্ষায় ভালো ফলাফলের জন্য যথাক্রমে তিন টাকা এবং চার টাকা বৃত্তি পান। ১৯১৫ সালে কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ের অধীন মেট্রিকুলেশন পরীক্ষার ফলাফলে রাজশাহী ও প্রেসিডেন্সি ডিভিশনের শিক্ষার্থীদের মধ্যে তিনি প্রথম হন এবং ১৫ টাকা বৃত্তি লাভ করেন। তৎকালীন মুসলিম পরিবারের সন্তান হিসেবে এটি ছিল বিরল ঘটনা। পরবর্তীকালেও তিনি তার মেধার প্রমাণ দেন। কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ের অধীন ঢাকা কলেজে তিনি পদার্থ বিজ্ঞান বিষয়ে স্নাতক (সম্মান) অধ্যয়ন করেন। পরীক্ষার ফলাফলে আসাম ও পূর্ববঙ্গের শিক্ষার্থীদের মধ্যে যথারীতি প্রথম হন। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অধীন স্নাতক উত্তর পরীক্ষাতেও তিনি ভালো ফল করেন।
কাজী মোতাহার হোসেনের কর্মজীবনের সূচনা ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে পদার্থ বিজ্ঞানে এমএ পড়াকালীন। তিনি নিজ বিভাগে ডেমোনেস্ট্রেটর হিসেবে পেশাগত জীবন শুরু করেন। দুই বছর পর সহকারী প্রভাষক হন। এ সময় পদার্থ বিজ্ঞান বিভাগের রিডার ছিলেন প্রখ্যাত বিজ্ঞানী সত্যেন্দ্রনাথ বসু। তিনি সত্যেন বসুর বিশেষ স্নেহভাজন ছিলেন। মূলত বসুর অনুপ্রেরণায় মোতাহার হোসেন কলকাতার স্ট্যাটিসটিক্যাল ইনস্টিটিউট থেকে পরিসংখ্যান বিষয়ে ডিপ্লোমা ডিগ্রি অর্জন করেন। তিনি এ সময় কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে গণিতেও এমএ সম্পন্ন করেন। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে পরিসংখ্যান বিভাগ খোলা হলে মোতাহার হোসেন প্রভাষক হিসেবে যোগদান করেন। কালান্তরে তিনি এ বিভাগের বিভাগীয় প্রধান এবং বিজ্ঞান অনুষদের ডিনের দায়িত্ব পালন করেন। কাজী মোতাহার হোসেন Design of Experiments শিরোনামে পিএইচডি ডিগ্রি লাভ করেন। তার গবেষণায় উদ্ভাবিত তত্ত্ব Husain's Chain Rule আন্তর্জাতিক স্বীকৃতি পায়। বিভাগের সংখ্যাতিরিক্ত অধ্যাপক এবং পরবর্তীতে তিনি জাতীয় অধ্যাপকের পদও অলংকৃত করেন।
কাজী মোতাহার হোসেন বিজ্ঞানের ছাত্র হলেও সাহিত্যের প্রতি তার ছিল গভীর অনুরাগ। স্কুলজীবনেই সাহিত্যচর্চার সূচনা। শিখা, সওগাত, মোহাম্মদী ইত্যাদি পত্রিকায় তিনি নিয়মিত লিখতেন। মননশীল প্রবন্ধ ছাড়াও তিনি কবিতা, ছোটগল্প, উপন্যাস ও স্মৃতিকথা লিখেছেন। বিজ্ঞান এবং সংগীত বিষয়ে তার গুরুত্বপূর্ণ রচনা রয়েছে। এমনকি পুস্তক সমালোচনাও করেছেন। তার উল্লেখযোগ্য প্রবন্ধ সংকলন ‘সঞ্চরণ’ ১৯৩৭ সালে প্রকাশিত হয়। গ্রন্থটি রবীন্দ্রনাথ ও প্রমথ চৌধুরীর বিশেষ প্রশংসা লাভ করে। শিক্ষা-সংস্কৃতি, বিজ্ঞান, ভাষা-সমস্যা, সংগীত, দর্শনসহ বিচিত্র বিষয়ে ছিল তার গভীর আগ্রহ। তার গুরুত্বপূর্ণ গ্রন্থাদি হলো- সেই পথ লক্ষ্য করে, নজরুল কাব্য পরিচিতি, নির্বাচিত প্রবন্ধ, ভাই গিরীশচন্দ্র সেন ইত্যাদি।
বাংলা ভাষায় বিজ্ঞানচর্চার ক্ষেত্রেও ছিল মোতাহার হোসেনের অগ্রণী ভূমিকা। বাংলায় বিজ্ঞানগ্রন্থ রচনা করে তিনি উচ্চতর শিক্ষায় বাংলা বিজ্ঞানগ্রন্থের ব্যবহার বৃদ্ধিতে সচেষ্ট হন। এ লক্ষ্যে রচিত হয় তার বিজ্ঞানগ্রন্থ- তথ্যগণিত, গণিত শাস্ত্রের ইতিহাস, আলোকবিজ্ঞান ইত্যাদি।
সাহিত্যচর্চার সূত্রে কবি কাজী নজরুল ইসলামের সঙ্গে মোতাহার হোসেনের সখ্য হয়। ১৯২৭ সালে ঢাকার মুসলিম সাহিত্য সমাজের সম্মেলনে কাজী নজরুল ইসলাম অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন। পরের বছরও নজরুল মুসলিম সাহিত্য সম্মেলনে যোগদান করেন। এ সময় তিনি দীর্ঘ আড়াই মাস কাজী মোতাহার হোসেনের বর্ধমান হাউসের বাড়িতে থেকে যান। ফলে মোতাহার হোসেনের সঙ্গে নজরুলের অভিন্ন হৃদয় বন্ধুত্ব গড়ে ওঠে। নজরুল তাকে ‘মোতিহার’ বলে সম্বোধন করতেন। এ সম্মোধনেই নজরুল পরবর্তীকালে মোতাহার হোসেনকে অনেক চিঠি লিখেছিলেন। এসব চিঠিতে নজরুল-মোতাহারের অন্তরঙ্গ সম্পর্কের চিত্র ধরা আছে।
কাজী মোতাহার হোসেন কেবল সাহিত্য ও বিজ্ঞানচর্চার মধ্যে নিজেকে সীমাবদ্ধ রাখেননি। তার প্রবল আগ্রহের বিষয় ছিল সংগীত ও ক্রীড়া। তিনি নিজের বাড়িতে একটি সাংগীতিক পরিবেশ সৃষ্টি করেন। খ্যাতিমান ওস্তাদ রেখে নিজের কন্যাদের সংগীতে তালিম দেন। নিজেও সংগীত চর্চা করতেন। সংগীত বিষয়ে তার কিছু গুরুত্বপূর্ণ প্রবন্ধ আছে। ক্রীড়ার ক্ষেত্রে বিশেষত দাবা খেলায় তিনি সবিশেষ খ্যাতি অর্জন করেন। বাল্যকালেই ফুটবল, সাতার ও দাবা খেলায় পারদর্শী হয়ে ওঠেন। ব্যাডমিন্টন এবং লন টেনিসও খেলতেন। তবে তার দাবা প্রতিভা ছিল উল্লেখ করার মতো। কলকাতায় অল ইন্ডিয়া চেস ব্রিলিয়ান্স প্রতিযোগিতায় তিনি চ্যাম্পিয়ন হন। এমনকি ১৯২৯ থেকে ১৯৬০ সাল পর্যন্ত তিনি অবিভক্ত বাংলা এবং পূর্ব পাকিস্তানে দাবা চ্যাম্পিয়ন ছিলেন। আন্তর্জাতিকভাবে খ্যাতিমান অনেক দাবাড়ুর সঙ্গেও খেলে প্রশংসা অর্জন করেন। তারই প্রচেষ্টায় দাবা ফেডারেশন গঠিত হয় এবং তিনি এর সভাপতির দায়িত্বও পালন করেন।
কাজী মোতাহার হোসেন সাধারণ পরিবারে জন্ম নিলেও আপন প্রচেষ্টায় কৃতী হয়ে ওঠেন। সত্যভাষী, মানবতাবাদী আত্মভোলা ও শান্ত স্বভাবের জন্য তিনি সবার প্রিয়ভাজন ছিলেন। নিরলস জ্ঞানচর্চায় ছিলেন নিবেদিত। বিজ্ঞানচর্চার পাশাপাশি সাহিত্য-সংস্কৃতিচর্চায় ছিল তার ঐকান্তিক প্রয়াস। বিশ শতকের পশ্চাৎপদ বাঙালি মুসলিম সমাজে জন্ম হলেও কাজী মোতাহার হোসেন আপন প্রতিভার দ্যুতিতে অনন্য হয়ে ওঠেন।
লেখক: অধ্যাপক, বাংলা বিভাগ, ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয়, কুষ্টিয়া