ঢাকা ৬ আষাঢ় ১৪৩৩, শনিবার, ২০ জুন ২০২৬

সর্বশেষ
আর্জেন্টিনা-ব্রাজিলে মাতোয়ারা ‘প্রচেষ্টা’র এক দিন জিয়াউর রহমান জনগণের বাকস্বাধীনতা নিশ্চিত করেছিলেন: প্রাণিসম্পদ প্রতিমন্ত্রী যুদ্ধবিরতি কার্যকরের পরও থামেনি হামলা, লেবাননে নিহত ১৬ হরিণাকুণ্ডুতে আ.লীগ–বিএনপি সমর্থকদের সংঘর্ষ, আহত ১৬ ফেরদৌস ওয়াহিদ ও সাঈদা শম্পার ‘মন বোঝে না’ চট্টগ্রামে প্রযুক্তিনির্ভর কর্মসংস্থান তৈরির আহ্বান ভূমি প্রতিমন্ত্রীর ‘বাজেটে শিক্ষা ও স্বাস্থ্য খাতকে গুরুত্ব দিয়েছে সরকার’ প্রগতিশীল গণতান্ত্রিক দলের চেয়ারম্যান মনিরুল, মহাসচিব আমান কৃষিকাজে বিজ্ঞান বিষয়ক প্রবন্ধ রচনা, ২য় পর্ব, এইচএসসির বাংলা ২য় পত্র বরেন্দ্র সভ্যতার ইতিহাস-ঐতিহ্য ধারণ করে শিক্ষার্থীদের সুনাগরিক হওয়ার আহ্বান ভূমিমন্ত্রীর বৃহত্তর কুষ্টিয়ার প্রথম পতাকা উত্তোলনকারী আব্দুল জলিলের স্মরণসভা ইবি ছাত্রদলে পদ পাচ্ছে ছাত্রলীগ কর্মীরা! প্রাথমিক পরীক্ষায় শিশুদের থেকে ফি আদায় প্রসঙ্গে গাজীপুরে তেল কারখানায় অগ্নিকাণ্ড, নিয়ন্ত্রণে ৩ ইউনিট রাজশাহীতে অটো ভাড়া বৃদ্ধি তিস্তা ইস্যুতে আন্দোলনের হুঁশিয়ারি, পরবর্তী কর্মসূচি ‘ঢাকা ঘেরাও’ নায়িকা ববির কথিত স্বামী আবুল বাশার গ্রেপ্তার সিটি কলেজ ক্যাম্পাস, ষোলশহরে ছাত্রলীগের ঝটিকা মিছিল সোনারগাঁয় যুবলীগ-ছাত্রলীগের দুই নেতা গ্রেপ্তার সম্পর্কের পর বিয়ে হয়নি বলে ধর্ষণের অভিযোগ গ্রহণযোগ্য নয়, রায় কোর্টের সিরাজউদ্দৌলা নাটকের ৩টি অনুধাবনমূলক প্রশ্ন ও উত্তর, ৭ম পর্ব, এইচএসসির বাংলা ১ম পত্র খোলা ড্রামে ভোজ্যতেল: ভোক্তার অধিকার কোথায়? আগস্টের মধ্যেই ঢাকা-পাবনা রুটে সরাসরি ট্রেন: নৌপরিবহনমন্ত্রী গাজী গিয়াস উদ্দিনকে মোহাম্মদ নাসির উদ্দিন সাহিত্য পুরস্কার প্রদান তীব্র তাপপ্রবাহে করণীয় আইনের শাসন ও মানবাধিকার নিশ্চিত করুন নিত্যপণ্যের দামে কোনো চাপ নেই, বাজেট জনবান্ধব: পানিসম্পদ প্রতিমন্ত্রী উদ্ভিদের বংশ বৃদ্ধি অধ্যায়ের ১০টি বহুনির্বাচনি প্রশ্ন ও উত্তর, ১ম পর্ব, অষ্টম শ্রেণির বিজ্ঞান দেশে বাড়ছে হামের প্রকোপ, একদিনে ৭ মৃত্যু ছত্রিশ-চব্বিশের পরকীয়া নিয়ে তুলকালাম

ধারাবাহিক উপন্যাস তার নাম রাখিও স্বাধীনতা

প্রকাশ: ২৯ জানুয়ারি ২০২৬, ০৫:১৭ পিএম
আপডেট: ২৯ জানুয়ারি ২০২৬, ০৫:১৮ পিএম
তার নাম রাখিও স্বাধীনতা
অলংকরণ: নাজমুল আলম মাসুম

ষষ্ঠদশ পর্ব
এদিকে ঢাকা চট্টগ্রাম রোডের টোল প্লাজার অগ্নিকাণ্ড ঢাকার সিচুয়েশন রুমেও অগ্নি উদ্‌গিরণ করছে।
বিদেশি গোয়েন্দাপ্রবর ইতোমধ্যে নক্ষত্র রেখা অতিক্রম করায় কাজ শুরু করেছেন। তার প্রথম বক্তব্য,
আগেই বলেছি, নকশাল বাড়ি ট্রেন্ড অনুযায়ী ধোলাইপাড় থেকে টার্গেট শনিরআখড়ায় আসার পরপরই টোল প্লাজায় আগুন দেওয়া হয়।
-ইতোমধ্যে সাদা শার্ট আর নীল জিন্স পরা দশজনকে ঘটনাস্থল থেকে অ্যাপ্রিহেন্ড করা হয়েছে।
-গুড।
-তবে।
-তবে কী?
-যে দম্পতিকে আমাদের সোর্স ধোলাইপাড়ে নিখোঁজ হওয়া ছেলেটি সম্পর্কে জিজ্ঞাসা করেছিল, টোলপ্লাজা আক্রমণের ঠিক আগ মুহূর্তে তাদের ঘটনাস্থলে দেখা গেছে।
-আমাদের টার্গেট এখন একটি জিন্স শার্ট পরা ছেলে নয় বরং গ্রামের এক দম্পতি?
-তাই তো মনে হয়।
-কী বিচিত্র এই দেশ। আলেক্সান্ডার দ্য গ্রেট এজন্যই রাজা পুরুকে বলেছিলেন, হাউ স্ট্রেঞ্জ ইউর কান্ট্রি ইজ। আমিও বলি, একজন জোয়ান ছেলে ভোজবাজির মতো কীভাবে দুজনের এক দম্পতিতে পরিণত হলো। হাউ স্ট্রেঞ্জ।

বিদেশি গোয়েন্দা মুখে স্ট্রেঞ্জ বললেও রুমে কেউ স্ট্রেঞ্জড অর্থাৎ আশ্চর্য হয় না। কেউ তার টিটকারিও গায়ে মাখে না। কারণ তাদের ট্রেকিং ডিভাইস টার্গেট ধরতে কাজে লাগবে। তাই নেতা বলে;
-এখন কী করব?
-প্রথমে ধোলাইপাড় থেকে শনিআখড়ায় গত কয়েক ঘণ্টার যত দম্পতি রাস্তা দিয়ে গেছে তাদের ওপর নজর ঢালুন। আমাদের টার্গেট হয়তো কারও স্বামী বা স্ত্রী হয়ে ওই এলাকায় ঘুরে বেড়াচ্ছে।
-দ্বিতীয়ত?
-দ্বিতীয়ত, আপনাদের মাঝে একটি ফুটো দেখতে পাচ্ছি আমি। ছেলেটি নিশ্চয় জানতে পেরেছে, তাকে খোঁজ করা হচ্ছে, তাই হয়তো সে বেশ পরিবর্তন করে সবার চোখে ধুলো দিতে পেরেছে। আবার,
-আবার কী?
-আবার হয়তো এ লোকের পর্যবেক্ষণ শক্তি এতই নিখুঁত, তিনি পরিবেশ আঁচ করতে পেরে নিজেই বেশ পাল্টে ফেলেছেন।

সিচুয়েশন রুমের নেতা যেন স্বস্তির নিশ্বাস ফেললেন। তার স্বস্তি সংক্রমিত হয় দেশি সব গোয়েন্দার মাঝে। ডিবি অফিসের বিখ্যাত ‘ভাতের হোটেল’ থেকে আনা শ্রাবণ দিনের পাটিসাপটা পিঠার সঙ্গে ধোঁয়া ওঠা চা দেওয়া হয় সবাইকে। পিঠা খেতে খেতে নেতা বলেন,
- আমার দৃঢ় বিশ্বাস আমাদের মধ্যে কেউ ডাবল ক্রস করেনি এবং কোনো ফুটোও নেই। কিন্তু বন্ধুদেশের স্পাই তাকে হতাশ করে বলেন,
- ডাবল ক্রস বা ফুটো থাকলেই বরং আমি খুশি হতাম।
পাটিসাপটা পিঠা নেতার মুখে আটকে যায়। বলেন,
-কারণ?
-কারণ আমরা এখন এমন এক ব্যক্তির সঙ্গে ডিল করছি, যে মানুষের বাইরে দেখে ভেতর পড়ে ফেলতে পারে। এ লোক নিশ্চয়ই বহু সাধনা করে নিজেকে বড় করেছে। তার সামরিক ও নিরাপত্তা অভিজ্ঞতার ঝুলিও ভারী হতে বাধ্য। সবচেয়ে বড় কথা অবস্থাদৃষ্টে মনে হয়, এসব বোমাবাজি বা অগ্নিকাণ্ড তার চূড়ান্ত লক্ষ্য নয়। তার লক্ষ্য আরও বড়।
-কী সে লক্ষ্য হতে পারে?
বিদেশি অবলীলায় বলে ফেলেন, 
-সে একটা দেশের প্রধানকে সরিয়ে দেওয়ার যোগ্যতা রাখে। 
পুরো রুম একসঙ্গে দাঁড়িয়ে যায়। বিদেশি, যেন কিছু হয়নি এমনভাবে বলেন,
-সরিয়ে দেওয়া মানে সব সময় হত্যাকাণ্ড নয়।


সতেরো
সিচুয়েশন রুমের লোকজন যখন আতঙ্ক আর উত্তেজনায় পাগল হওয়ার জোগাড়, তখন নেতা মিরপুরে শাহ আলির মাজারের মসজিদের ফ্লোরে চিন্তাহীন ঘুমে আচ্ছন্ন। সে আগেও দেখেছে মসজিদের শক্ত মাদুরের ওপর কোনো এক অজানিত কারণে শোয়ামাত্র ঘুম এসে যায়। আল্লাহ যে দুনিয়াতে কত জায়গায় কত রহস্য লুকায়ে রেখেছেন তার হিসাব কে রেখেছে।
তার ঘুম ভাঙল একজন মুরুব্বির মৃদু করাঘাতে। 
ঘুম ভাঙলে নেতা দেখলো, তাবলিগের যে জামাত মসজিদে তাশরিফ রাখার কথা তারা ইতোমধ্যে এসে গেছে। সালাত এবং মাশওয়ারা শেষে তাদের একদল গাশতের জন্য (হেঁটে হেঁটে দ্বিনের দাওয়াত দেওয়া) অন্য দল আমিরে তোয়ামের নেতৃত্বে সন্ধ্যাকালীন খাদ্য সংগ্রহের জন্য বেরিয়ে পড়েছে। এই মুরুব্বি জিম্মাদার হিসেবে মসজিদে জিকিরের জন্য রয়ে গেছেন।

সালাম বিনিময়ের পর নেতা জানতে চাইল, জামাতে তেঁতুলঝরা গ্রামের কেউ আছে?
মুরুব্বি বললেন, না। তবে আমাদের নায়েবে আমির বলেছেন, যদি কেউ তার গ্রামের কথা জিজ্ঞেস করে তখনই শুধু বলতে।
নেতা বলল, আমিই এই জামাতের আমির। তবে বাদ এশা মাশওয়ারার পর ঠিক হবে আমাদের পরবর্তী গন্তব্য কোথায়। 
মুরুব্বি কিছু বলেন না। জানালা দিয়ে বাইরের মেঘ ক্লান্ত দিনের অন্ধকার এসে মসজিদের পরিবেশ আতুর করে তোলে। দূরের কোণের জমায়েত থেকে ক্বারী আব্দুল বাসিতের কণ্ঠে সুরা দোহার সুমধুর সুর ‘ভাসিয়া আসে’- নিশ্চয়ই তোমার ভবিষ্যৎ অতীতের চেয়ে উত্তম হবে।

সুরার কথায় অনুপ্রাণিত নেতা মুরুব্বির সঙ্গে বাইরের আলোতে আসে। তারপর হেঁটে ১০ নম্বরের ব্রিজের ওপর ওঠে। এখান থেকে প্রায় পুরো মিরপুর একনজরে দেখা যায়।
নিচে হাতের বামে শহরের হুলুস্থুলের মধ্যে হজরত শাহ আলী বাগদাদীর মাজারটি যেন নিজেই তার পীরের মতো মোরাকাবার তৃতীয় কী চতুর্থ স্তরে গিয়ে ‘সমাধি মুদ্রা লাভ করিয়াছে’। নেতা ভাবে, ১৫ শতকের এই সুফি দিল্লি থেকে এখানে এসে ইসলামের প্রচারের জন্য কী অমানুষিক কষ্টই না সহ্য করেছেন। বিধর্মী অধ্যুষিত বিরানা প্রান্তরে খেয়ে না খেয়ে দিন গুজরান করেছেন, তারপর যখন দলে দলে ওরা এল ইসলামের সুশীতল ছায়াতলে, চল্লিশ দিনের উপবাসী চিল্লায় চলে গেলেন, ফিরে আসলেন না আর কোনোদিন।

সেই কতদিন! নেতা ভবে, যদি বিপ্লব সমাপ্ত হয় কোনোদিন এসব ধুন্ধুমার কোলাহল ছেড়ে চলে যাবে সেরকম কোনো নিভৃতির নিরালায়, জীবন চিল্লায় কাটবে জীবনের অবশিষ্ট দিন শাহ আলী বাগদাদীর মতো। 

কিন্তু এক্ষণে তার করণীয় মাথাচাড়া দিয়ে উঠল। মুরুব্বিকে বলল, তার ঝোলায় একটি প্যাকেট থাকার কথা। মুরুব্বি এগিয়ে দিলে দেখা গেল এটি একটি কালো চশমা মাত্র। তবে চোখে পড়ার পর বোঝা গেল এটি আসলে চশমার আদলে তৈরি টেলিস্কোপ। সাধারণ টেলিস্কোপের চেয়ে অনেক শক্তিশালী, কিন্তু কেউ বুঝতে পারবে না টেলিস্কোপ ব্যবহার হচ্ছে। যারা নেতাকে সাহায্য করছে, তাদের প্রযুক্তি জ্ঞানে বিস্ময় বোধ করল নেতা।

কিন্তু সময় ছিল কম। সে তার আগ্রহী দৃষ্টি মিরপুরের দক্ষিণে বিস্তৃত করলো। ব্লকেড চললেও এদিকের মিরপুর বরাবরের মতো মানুষের হাঁকডাকে জমজমাট। একজন আমড়া বিক্রেতা ক্রেতাহীন দাঁড়িয়ে আছেন। কিছুক্ষণ পরপর ‘শব্দ করিয়া মেট্রোরেল চলিয়া যাইতেছে’। বাস-কারের অনুপস্থিতিতে রিকশা আর ভ্যানের রাজত্ব চলছে। ট্রাফিক পুলিশ স্থানে স্থানে কর্মহীন বসে আছেন, ট্রাফিক লাইটগুলো বিনা কারণে লাল-হলুদ-সবুজ হয়ে জ্বলছে আর নিভছে। নেতার মতো অখণ্ড মনোযোগে বৈদ্যুতিক তারের ওপর এক সারি কাক বসে আছে। একজন বৃদ্ধ ফেরিওয়ালা ভারা নিয়ে অসমর্থ কাঁধে ধীর পায়ে এগিয়ে চলেছেন, তার চরণে ‘বেলা শেষের আলো আসিয়া পড়িয়াছে’।

এ সময় এক করুণ দম্পতি নেতার দৃষ্টি আকর্ষণ করল। তারা কোথাও যাওয়ার জন্য একাধিক রিকশাওয়ালার কাছে যাচ্ছে, কিন্তু বোধ করি অতিরিক্ত বাড়ার কারণে রিকশায় উঠতে পারছে না। আজ ব্লকেডের দিনে অতিরিক্ত রিকশা ভাড়ার অভিজ্ঞতা তার নিজেরও হয়েছে। কিন্তু এই দম্পতি নিজেদের সঙ্গে এখন কথা কাটাকাটি করছে। নেতার মনে হলো যদি এই জাদুর চশমাতে দেখার মতো শোনার ব্যবস্থাও থাকত, সে শুনত, মহিলা বলছে, সামান্য রিকশাতেই যদি না চড়াতে পারো বিয়ে করেছিলে কেন? তবে মুহূর্তেই নিজেকে তিরস্কার করে নেতা; বলে, হয়তো মহিলা এটাও বলতে পারে, আজ তো রাস্তা ফাঁকা, রিকশায় চড়ার দরকার কী, চলো হেঁটে চলে যাই, তোমার সঙ্গে কতদিন পাশাপাশি হাঁটা হয় না। নেতা বুঝতে পারে, এ আসলে তারই মনের কথা!

মিরপুরের ভরা বাজারের মধ্যে হঠাৎ তার কথা মনে পড়ে যায়। তামিরুল মিল্লাত মাদরাসায় কেমন আছে সে? মনে পড়ে যায়, আন্দোলন করতে গিয়ে গ্রামের নিরালায় তার কাছে আসা, একান্ত কাছে যখন তাদের মাঝখানের দূরত্ব ধনুকের ছিলার চেয়েও কমে একান্ত ছোঁয়াছুঁয়ির মধ্যে চলে এসেছিল। সেই রাত! আল্লাহকে সাক্ষী রেখে পরস্পরকে কাছে পাওয়ার সেই রাত! সে কি ভোলা যায়, ভুলতে পারে কেউ?

তার মনে পড়ে মন্দাকিনী ধারার সেই রাত। জনবসতি থেকে দূরে বহুদূরে চা বাগানের গহীনে সারা দিন কাটল আন্দোলনের প্রস্তুতিতে। রাত নেমে এলে অ্যাসিস্ট্যান্ট ম্যানেজার তার ঘর ছেড়ে দিয়ে চলে গেছেন। একলা ঘরে ওর সঙ্গে থাকতে হবে; কী করি! কী করি! তারপর বৃষ্টি ভেঙে চা-বাগানের মসজিদের তরুণ ইমামের ঝুপড়িতে গিয়ে বলা- কবুল, কবুল। সেই কতদিন!

হঠাৎ তার ভেতরটা হাহাকার করে ওঠে, তাকে তো জিজ্ঞাসাও করা হয়নি, তাদের ভালোবাসার ফসল কীভাবে তার ভেতর জমাট বাঁধছে, চাঁদের কলার মতো বিকশিত হচ্ছে দিন দিন।

সে আর ভাবতে পারে না। শ্যাওড়াপাড়া আর কাজীপাড়া দুটি পুলিশ ফাঁড়িই ‘ধোঁয়ায় ছাইয়া গেল হঠাৎ’। এবার দেখা গেল ধোঁয়ার ওপর কুণ্ডলিত আগুনের শিখা। চশমারূপী টেলিস্কোপ অ্যাডজাস্ট করে দেখল, দুটি স্টেশনেরই সিসিটিভিতে প্রথমে আগুন লাগল তারপর ছাই ভস্ম হলো সবকিছু।
মিরপুরের জমাট রাস্তাঘাটে মুহূর্তেই শ্মশানের নীরবতা নেমে এল। বন্ধ হয়ে গেল মেট্রোরেল।

ফায়ার ব্রিগেডের গাড়ি কেবল আসতে শুরু করছে। তার আগেই মুরুব্বিকে নিয়ে নেতা মসজিদের দিকে রওনা দিয়েছে। সে ভাবছে, শহরের ভেতরের ব্লকেডের দায়িত্বটা ছাত্রদের অনুপস্থিতিতে ট্র্যাডিশনাল রাজনৈতিক দলগুলোই নিয়েছিল। তার ভয় ছিল তারা অপারেশন চালানোর সময় লেজে গোবরে করে ফেলে। কিন্তু একবারে নিখুঁত একটা অপারেশন দেখে তাদের প্রতি তার শ্রদ্ধা বেড়ে গেল অনেক। হয়তো দিনের পর দিন ব্যর্থ হতে হতে তারা এখন যথাযথই স্মার্ট হয়ে উঠেছে। তবে, এসব নেতার প্রতি তার আসল কৃতজ্ঞতা অন্য জায়গায়- তারা এখনো বলে চলেছেন, শিক্ষার্থীদের আন্দোলনের প্রতি তাদের নৈতিক সমর্থন আছে কেবল, তারা এতে অংশ নিচ্ছেন না। কারণ এতে সরকারি দল শিক্ষার্থীদের আন্দোলন বিরোধীদল হাইজ্যাক করেছে বলার মওকা পাবে। তবে নেতা এও জানে বিপ্লব সফল হলে, শিক্ষার্থীরাই বলবে, বিরোধীদল নয়, ছাত্ররাই এই বিপ্লবের সব কৃতিত্বের অধিকারী! সে মনে মনে বলে, রাজনৈতিক নেতৃত্বের এ ত্যাগ ও মহত্ত্ব কোনোদিন ভুলব না।

মসজিদের ভেতরে সবকিছু অন্যরকম। গাশতের দল ইতোমধ্যে ফিরে এসেছে। একদল মুসল্লি তাজবিদের মকশো করছে। বাইরে কয়েকজন খাবারের এন্তেজামে ব্যস্ত। তাদের দেখে মুচকি হাসল নেতা, কাল সকালে এদের পরীক্ষা হবে।

দেশে অনেক ইসলামি দল ও সংস্থা থাকলেও তাবলিগের প্রতি তার সমর্থন শর্তহীন। সে জানে, এটিই একমাত্র জামাত যারা তাকফিরি অর্থাৎ অন্যদের কাফির বলা থেকে বিরত থাকে, শুধু দাওয়াতের কাজটুকু করে যায় নীরবে। কিন্তু তাকে কষ্ট দেয় যখন শোনে, ইদানীং এখানেও ভাঙন ধরেছে। দীর্ঘ নিশ্বাস ফেলে নেতা, বলে হে মালিক, দ্বীনের এই শেষ পতাকাটুকু খণ্ডিত করো না।

আজ শাহ আলী মাজারের মসজিদের দৃশ্যমান স্বাভাবিকতার বিপরীতে হঠাৎ দমবন্ধ পরিবেশ সৃষ্টি হয়েছে। সাধারণ জামায়াতে কেউ জিকিরে নিমগ্ন থাকে, কেউ থাকে সালাত আর মাশোয়ারায়। কিন্তু আজ বৈরী পরিবেশ সবাইকে এই অভূতপূর্ব সমাবেশে একত্র করেছে।
আমির সাহেব আল্লাহ্, আল্লাহর রাসুলের অফুরন্ত সালাত ও সালাম বাদ বললেন,
-হে জামায়াত, আল্লাহ আমাদেরই উদ্দেশ করে কোরআনে বলছেন,
আমি দুনিয়াতে এমন একদল মানুষকে আমার প্রতিনিধি করে পাঠিয়েছি যারা মানুষকে সত্য পথের দিকে ডাকবে আর মিথ্যার পথে বাধা দেবে। আমরা এতদিন দ্বীনের দাঈ হিসেবে নিজেদের সেই একদলের অন্তর্ভুক্ত মনে করতাম।

-কিন্তু আজ যখন সত্য এবং মিথ্যা ময়দানে পরস্পরের মুখোমুখি হয়েছে, যখন মজলুমের কণ্ঠ স্তব্ধ করে বাতাসে জালিমের চিৎকার ভেসে আসছে, যখন দ্বীনের বিরুদ্ধে দুনিয়া বিজয়ীর পতাকা উড়াচ্ছে, যখন অবরুদ্ধ অগণন নরনারীর আর্তনাদে আল্লাহর জমিন ভারী হয়ে উঠেছে, যখন ধর্মকে মসজিদে তালা বন্দি করে অধর্মের কালো ঘোড়া দাবড়ে বেড়াচ্ছে দুনিয়ার রাজপথ; তখন, তখন দাওয়াতের বিনম্র পতাকাটি গুটিয়ে আমরাও কি মসজিদে এতেকাফ নিয়ে বসে থাকবো! বাইরের এই গরম হাওয়ার বিপরীতে মত্ত থাকব জিকিরের নরম হালকায়?

নেতা জানে তাবলিগে দাওয়াতের বয়ান কখনো এরকম জ্বালাময়ী হয় না। সে এও জানে, ৬ উসুল আর ৯ ফুরুর বন্ধনে তারা যুগ যুগ ধরে মন্ত্রমুগ্ধ হয়ে আছে। তবে তার ভালো লাগে ইসলামের এই তাবলিগ জামাত অন্য কোনো দলকে কাফের ফতোয়া দেয় না। তাই ইদানীং বিভক্তি সত্ত্বেও তার বিশ্বাস ইসলামের টিম টিমে প্রদীপখানি আল্লাহ যুগ যুগ ধরে এদের মাধ্যমে প্রজ্বলিত রেখেছেন। আল্লাহ্ কি তার গ্রন্থে বলেননি, ওরা ফুঁ দিয়ে আমার বাত্তি নিভিয়ে দিতে চায়, কিন্তু কালতুফানের মুখে আমিই দ্বীনকে দেদীপ্যমান রাখি। 

-হে হাজিরান, কাল আমাদের পরীক্ষার দিন। আমরা কি পরিকল্পনা মতো মহল্লা থেকে মহল্লার দরজায় দাওয়াতের গাশত নিয়ে হাজির হব, না কি, আল্লাহ নির্ধারিত মৃত্যুক্ষণের আগে মরণের ভয়ে মসজিদ ছেড়ে বের হব না? আল্লাহ আমাদের সহায় হোন।

চলবে...

আরও পড়ুন

বৃষ্টি মনোমুগ্ধকর খুনি

প্রকাশ: ১৯ জুন ২০২৬, ১২:২৬ পিএম
বৃষ্টি মনোমুগ্ধকর খুনি
বই

ছয় ঋতুর এই দেশে বর্ষাঋতু ছাড়াও যে ঝুম বৃষ্টির অনুভূতি সৃষ্টি হতে পারে তা এমরান কবিরের পঞ্চম কাব্যগ্রন্থবৃষ্টি: মনোমুগ্ধকর খুনিনা পড়লে বোঝাই যেত না বর্ষার সময় ঝুম বৃষ্টিতে বারান্দায় বসে বই পড়লে যেমন অজান্তেই বৃষ্টির গতিময় ফোঁটা শরীরে পড়ে, শিহরণ জাগে আর নষ্টালজিয়ায় আক্রান্ত হয় মনএমরান কবিরের এই কাব্যপাঠে সে রকমই অভিজ্ঞতা হলো শব্দের মেঘেও যে বৃষ্টির ছটা থাকে তাও বুঝিয়ে দিল মেঘে গর্জন নেই তবে বর্ষণ আছে ফ্ল্যাপ থেকেই শুরু হয়েছে মেঘের ঘনঘটা, ‘তোমার ভূগোলে আসার পর/ ভেবে দেখ/ কীরূপ ছিল আমার জয়োল্লাস/ আজ ভূগোলের গোলে/ থামিয়ে রেখেছি গান/ ফেরার পথে নিয়ে যাব/ তোমার না-দেখানো-/ বৃষ্টির সোনালি আগুন/ যার জন্য অনেক আগেই আমি/ হয়েছিলাম খুন পুরো কাব্যে যেন এই শৈল্পিক খুনেরই প্রতিধ্বনি

এই বইয়ের উৎসমুখে একটি গদ্য শোভা পেয়েছে সেখানে লিখেছেন তিনি, ‘কোনো ঋতুই আমাদের কাছে পুরাতন হয়ে আসে না যতবারই আসে ততবারই যেন নতুন যেন ছন্দের সাথে ছন্দের সহবাস

কবিতায় বলেছেন তিনি, ‘বাতাস তখন আগুন আগুন,/ পলকে পলকে তার রমণীয় শিখা!’ বৃষ্টির আগে বাতাসের কাছে গ্রীষ্মের যে তীব্রতা তা কবি রমণীয় শিখার সঙ্গে তুলনা করেছেনমেঘ মেঘ গল্পকবিতাটি পড়ার সঙ্গে সঙ্গে  মনে ভেসে ওঠে, ‘বনের ভেতর বন, তাহার ভেতর পালকের গান, উড়ন্ত উচ্ছল তার নয়নের আসমান’–কী শৈল্পিক ছোঁয়ায় তিনি বর্ষাকে জীবন্ত করে তুলেছেন

বাংলার প্রকৃতি, বাংলার মানুষ, বাংলার বর্ষাকে তিনি যেন শব্দের ক্যামেরায় তুলে ধরেছেন এভাবে বাংলার মেঠোপথ ধরে হেঁটে যাওয়া, বর্ষার বৃষ্টি গায়ে মেখে বড় হওয়া এক জলময় চিরায়ত রোমাঞ্চকর বিজ্ঞাপন হয়ে উঠেছে, ‘বৃষ্টি: মনোমুগ্ধকর খুনি কবিতাগুলো

প্রায় প্রতিটি কবিতায় বর্ষার সঙ্গে এক রহস্যের চাঁদমুখ হয়ে ধরা পড়বে একটা চরিত্রঅধ্যাপিকা কে এই অধ্যাপিকা? তিনি বইটি উৎসর্গও করেছেন সেই অধ্যাপিকাকে অথচ তাকে সুনির্দিষ্ট করা দুরূহ বর্ষায় যেমন মেঘ থাকে, ঝড় থাকে, বৃষ্টি থাকে, বন্যা থাকে, বনের ভেতর হারিয়ে যাওয়া পথ থাকে, বৃক্ষের সঙ্গে বৃষ্টির অজ্ঞাত গল্প থাকে, ঠিক তেমনি কাব্যের বর্ণনায়, শব্দে, ভাবে চরিত্র বর্ষার মতোই রহস্য-রোমাঞ্চকর হয়ে ওঠে! কি জলকন্যা? একি বৃষ্টিবিলাসী নারী? কি কাব্যের পূর্ণতা? নাকি প্রকৃতির রূপক? নাকি কবির মনে সদা জেগে থাকা এক সৌন্দর্যের অনুপম মুখ? আবিষ্কারের জন্য পড়তে পড়তে বই শেষ হবে, রহস্যের শেষ হবে না, ‘অধ্যাপিকা,/ আপনি তো খুউব/ সরল অঙ্কের মতো/ তুমুল বৃষ্টিবাহিকা!’ কিংবাসবাই তো ছাত্র, রোদে রোদে থাকি বিস্মিত পাঠে/ তাপে তাপে বাষ্পীয় উত্তাপে, জানতে পারিনি একা/ আপনি এমন মেঘের মতোন উচ্ছল গায়িকা/ এমন ভেজা গান, গেয়ে যান/ ভিজে যায়/ সমস্ত অববাহিকা

মিথ মৈথুনকবিতায় তিনি আরও গাঢ় রহস্যের শ্যামল বনে বৃষ্টির ফোঁটার মতো করে বলে উঠলেন, ‘তার চেয়ে, অধ্যাপিকা/ সবুজ ঘাসের পাশে হাঁটতে থাকুন ধীরে/ আর তাকিয়ে দেখুন বারবার, কী যে অপরূপ রূপ বরষার

বর্ষার সঙ্গে মিলেমিশে একাকার হয়ে গেছে বর্ষার জলে ভেজা ভেজা পথে চলতে থাকা এই নিগুঢ় প্রতীকী চরিত্রটি বর্ষাকে সবাই উপলব্ধি করলেও কবি এমরান কবিরের কাব্য যেন বর্ষার স্বচ্ছ আয়না; অতীত, বর্তমান, দেখা-অদেখা সব একসঙ্গে অধ্যাপিকার  প্রতিটি চরণে, শাড়ির ভাঁজে এসে পাঠক হৃদয়ে ভর করে

মাঠ-ঘাট, জলে ভরা নদী, দিঘি, কূলভাঙা নদী বেয়ে গেয়ে যাওয়া বর্ষার সুখের মাঝি, কাদাময় পথ, বৃষ্টির আলিঙ্গন, বর্ষায় অভাবি গৃহিণীর অনাহারে থাকা, জলে পাতিহাঁসের মতো অবাধ গোসল করা শিশুর দল, ঘরের কোনে নিভৃতে একাকি দুটো মনের এক শরীর হওয়ার রহস্যের খেলাসবই আছে কাব্যে

কাব্যে ছোট ছোট কবিতা থাকলেও শেষে আত্মমগ্ন বীজের প্রত্ন ধারাপাত শিরোনামীয় একটি দীর্ঘ কবিতা সন্নিবেশিত হয়েছে ৩০০ চরণেরও অধিক কবিতা পাঠককে এক অভূতপূর্ব শিল্পআস্বাদনের অভিজ্ঞতা দেবে, ‘একদম নিঃশব্দ একাকিনী/ একান্তে দাঁড়িয়ে, একান্তে শুধু/ তিনি শুদ্ধতম একাকিনী/ আঁচল কোমরে গুঁজে দাঁড়িয়ে থাকেন মাঠে/ সেই সবুজ কৃষাণী

বর্ষার বিপুল, বিস্তৃত বহুমুখী চরিত্র অবদানের সঙ্গে যেমন বহুবিধ আকাঙ্ক্ষা জড়িয়ে আছে তেমনি দীর্ঘ কবিতার সঙ্গে জড়িয়ে আছে কৃষাণীবাংলার চিরায়ত মাতৃরূপিণী অবয়ব তিনি মমতায় সংগ্রামে, শ্রমে শ্রান্তিতে, ত্যাগে তিতিক্ষায়, ভালোবাসায় রুক্ষতায় এক-একক-অদ্বিতীয় তিনি চির বিজয়িনী ভেতরে ভেতরে ক্ষয়ে যাওয়া ইমারতের মতো হলেও বাইরে তার হাসির ছটাযেন পাকা ধান

আমরা জানি বৃষ্টি আমাদের এই অঞ্চলের কৃষি, সভ্যতা সংস্কৃতির কতটাজুড়ে রয়েছে দীর্ঘ কবিতাটিতে তা উঠে এসেছে দারুণভাবে কবিতাটিতে রয়েছে অদ্ভুত আত্মগীতি রয়েছে মায়া মোহনার কথা, নরম মাটি কৃষাণ-কৃষাণীর নরম হৃদয়ের কথা, রয়েছে ধান গানের কথা উৎপাদন আর জেগে উঠবার কথাও সবচেয়ে রয়েছে এক অপরূপ সম্ভাবনার কথা সব মিলয়ে বৃষ্টির সঙ্গে আমাদের রোমান্টিকতা আর চিরায়ত বাংলার সম্বন্ধসূত্র উঠে এসেছে যার সঙ্গে নিবিড়ভাবে জড়িত রয়েছে আমাদের কৃষি, কৃষ্টি, সভ্যতা, সংগ্রাম, প্রেম, কাম আর আর্থ-সামাজিক অবস্থা

কৃষাণী, নাকি অধ্যাপিকাকে বড় হয়ে বর্ষার চির ছায়া হয়ে থাকবে, মেঘের কোলে রহস্য হয়ে থাকবে তা অনুভব করতে এই কাব্য পাঠের বিকল্প নেই! বর্ষা আসবে বারবার কিন্তু কাব্যিক খুনির বিচার হবে না

সৈয়দ আলী আহসান প্রথম কবি দেখা ও কয়েক টুকরো স্মৃতি

প্রকাশ: ১৯ জুন ২০২৬, ১২:২২ পিএম
প্রথম কবি দেখা ও কয়েক টুকরো স্মৃতি
আঁকা: নিয়াজ চৌধুরী তুলি

আমি তখন নবম বা দশম শ্রেণির ছাত্র আমাদেরলজিং টিচারকলেজে পড়েন একদিন তিনি জানালেন তাদের কলেজে একটি অনুষ্ঠান হবে, এতে যোগ দেবেন দেশের একজন বিখ্যাত কবি আমার মন খুব চাইছে কলেজের অনুষ্ঠানে যেতে

মাথার মধ্যে লেখালেখির পোকা নিঃশব্দে ওড়াউড়ি করে কাকপক্ষীও যেন টের না পায়, গোপনে কাগজকলম নিয়ে বসি লিখি কী লিখি জানি না একজন বিখ্যাত কবিকে দেখার সুযোগ হাতছাড়া করা যায় নালজিং সারকে খুব করে ধরলাম সার রাজিতার সঙ্গে অনুষ্ঠানে যাব কিন্তু বাবার অনুমতি লাগবে আমার বাবা কড়া মানুষ এমনিতে কোথাও যেতে দেন না কিন্তু আমার আবদারে রজি হলেন আমার সে কী আনন্দ!

হলভর্তি লোক ছাত্রছারা তো আছেই অভিভাবক, স্থানীয় গন্যমান্য অনেকেই উপস্থিত ভাগ্য ভালো, মঞ্চের কাছাকাছি বসার জায়গা পেয়ে গেলাম অনুষ্ঠানের মধ্যমণি দেশের বিখ্যাত কবি সৈয়দ আলী আহসান মুখে চাপদাড়ি, পোশাকে পরিপাটি তিনি যখন মাইক্রোফোনের সামনে দাঁড়ালেন, পুরো হল নীরব তিনি দীর্ঘ সময় বক্তৃতা করলেন কঠিন কঠিন বিষয় তার অনেক কথাই মাথায় ঢোকেনি ঢোকার কথাও নয় তার বাচনভঙ্গি খুবই আকর্ষণীয় বুঝি আর না বুঝি শুনতে ভালো লাগছে আমার মুগ্ধতাসামনাসামনি একজন কবিকে দেখছি খেয়াল করলাম, তিনি দুটি চশমা ব্যবহার করছেন একটা খুলে আর একটা পরছেন, সেটাও বদলাচ্ছেন কারণ কী! অনেক পরে জেনেছি, কাছে এবং দূরে দেখার জন্য আলাদা চশমা দরকার হয়

দীর্ঘ বক্তৃতা শেষে কবি নিজের লেখা কবিতা শোনালেন এই প্রথম মনে একটা খটকা লাগল, এটা আবার কেমন কবিতা!? পাঠ্যবইয়ে যে কবিতা পড়ি, এটা তো সেরকম না রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর, কাজী নজরুল ইসলাম, জসীমউদ্দীন, সুফিয়া কামালএদের কবিতা পড়লে বা শুনলে মনে কেমন দোলা লাগে, এই কবির কবিতায় তেমন দোলা নেই

যাই হোক, কবিতা বুঝতে না পারলেও কবিকে ভালো লেগেছে সব থেকে বড় কথা একজন কবিকে জীবনে প্রথম সামনাসামনি দেখা! কবি সেদিন যে কবিতাটি পড়েছিলেন, নামআমার পূর্ব বাংলা

পরবর্তীত, কলেজের পাঠ্যসূচিতে সৈয়দ আলী আহসানেরআমার পূর্ব বাংলাকবিতাটি অন্তর্ভুক্ত ছিল পড়তে হয়েছে, ক্লাসে এটা নিয়ে স্যারের বক্তৃতা শুনতে হয়েছে, পরীক্ষার খাতায় উত্তর লিখতে হয়েছে আগে আমাদের কবিতা পাঠের অভিজ্ঞতায় ছিল ছন্দমিলের কবিতা আগেই উল্লেখ করেছি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর, কাজী নজরুল ইসলাম, সুফিয়া কামাল, জসীমউদ্দীনের কবিতায় চরণান্তেমিল’-এর বিষয়টি প্রথম দেখলাম চরণান্তে মিল নেই মাইকেল মধুসূদন দত্তের কবিতায় ক্লাসে স্যার বললেন, এটা অমিত্রাক্ষর ছন্দ শিখলাম চরণান্তের মিল ছাড়াও কবিতা হয় স্যার আরও বললেন, মাইকেলের প্রায় কবিতাই ১৪ মাত্রার চরণে লেখা ১৪ মাত্রা মানে ১৪টি অক্ষর গুনে গুনে দেখলাম, তাই তো! প্রতি চরণে ১৪টি অক্ষরই তো আছে স্যার মাত্রা পর্ব সম্বন্ধেও বললেন ১৪ অক্ষর মানে ১৪ মাত্রা এই ১৪ মাত্রার চরণ আবার দুই ভাগে বিভক্ত প্রথম ভাগে মাত্রা, পরের ভাগে মাত্রা, এই হলো ১৪ শিখলাম মাত্রা আর পর্ব

এই সামান্য জ্ঞান নিয়ে সৈয়দ আলী আহসানের  আমার পূর্ব বাংলাকবিতাটি দেখার চেষ্টা করলাম কবিতাটি এরকম

আমার পূর্ব বাংলা এক গুচ্ছ স্নিগ্ধ,

       অন্ধকারের তমাল

অনেক পাতার ঘনিষ্ঠতায়,

      একটি প্রগাঢ় নিকুঞ্জ

সন্ধ্যার উন্মেষের মতে

সরোবরে অতলের মতো

কালো-কেশ সঞ্চয়ের মতো

বিমুগ্ধ বেদনার শান্তি

আমার পূর্ব বাংলা বর্ষার অন্ধকারে অনুরাগ

ঘুমের অলসতায় চোখ বুঁজে আসার মতো শান্তি

হৃদয় ছুঁয়ে-যাওয়া স্নিগ্ধ নীলাম্বরী

(অংশবিশেষ)

 কবিতার বিষয় দেশানুরাগ গভীর মুগ্ধ অনুভবে দেশকে দেখা গদ্য-ছন্দে লেখা অন্তমিল তো নেই-, নেই মাত্রা পর্ব-সমতা আঁটোসাঁটোভাবে কাব্যালংকার না মেনেও যে উল্লেখযোগ্য কবিতা হতে পারে, সৈয়দ আলী আহসানেরআমার পূর্ব বাংলাএর একটি উদাহরণ

 

দুই.

লেখালেখির এই জীবনে অনেকের সঙ্গে পরিচয় হয়েছে কারও সঙ্গে কালেভদ্রে, কারও সঙ্গে মাঝেমাঝে, কারও সঙ্গে প্রায় নিত্য দেখাসাক্ষাৎ হয় সৈয়দ আলী আহসানের সঙ্গে দেখা হওয়াটা ছিল মাঝেমাঝে, প্রয়োজনে কেউ কেউ যেমন করেন, বয়সের দেওয়াল তুলে অনুজদের একটু দূরেই রাখেন সৈয়দ আলী আহসান ছিলেন এর বিপরীত বৈশিষ্ট্যের মানুষ অনুজদের তিনি সহজ আনন্দে গ্রহণ করতেন

একবার হলো কী, আমি রেডিওতে কবিতা পাঠের অনুষ্ঠানে অংশ নিয়েছিলাম শাহবাগ তখন রেডিওর প্রধান কেন্দ্র উপস্থিত হয়ে দেখি আমি যাদের সঙ্গে কবিতা পড়ব, তারা সবাই দেশের খ্যাতিমান কবি, আমি একমাত্র কবিযশঃপ্রার্থী তরুণ এক-দুজন তো তাচ্ছিল্য করল আমি মেনে নিয়েছি কারও কারও খ্যাতির অহংকার তো থাকতেই পারে রেওয়াজ অনুযায়ী অনুষ্ঠানের শেষ পর্ব পঠিত কবিতার ওপর আলোচনা অনুষ্ঠানের সঞ্চালক সৈয়দ আলী আহসান সেদিন আমার লেখার মৃদু প্রশংসাই করেছিলেন

বহুমাত্রিক লেখক সৈয়দ আলী আহসানের গ্রন্থসংখ্যা অনেক শুধু সংখ্যা বিচারে নয়, বিষয়-বৈচিত্র্যেও সমৃদ্ধ এর মধ্যে একটি বইয়ের কথা এখানে উল্লেখ করছি বইটির নামপ্রেম যেখানে সর্বস্ব উল্লেখ করার কারণ, এই বইটির আমিআঁতুড়-সাক্ষী

আমি তখন একটি সাপ্তাহিক পত্রিকায় যুক্ত ওই কাগজে সৈয়দ আলী আহসানের আনেক লেখা ছাপা হয়েছে যখনই চেয়েছি, সৈয়দ আলী আহসান লেখা দিয়েছেন তবে লেখাটি তৈরি হতোশ্রুতিলিখনপদ্ধতিতে

প্রেম যখানে সর্বস্বএকটি সংকলন গ্রন্থ এই সংকলন গ্রন্থের প্রায় সবকটি লেখারই আমি ছিলামশ্রুতি লেখক নির্দিষ্ট সময়ে যেতাম সৈয়দ আলী আহসানের কলাবাগান এলাকার বাসায় তিনি আগে থেকেই যেন প্রস্তুত থাকতেন আমি খাতাকলম নিয়ে বসতাম তিনি চোখ বুঁজে বলতেনধীর গতি, স্পষ্ট উচ্চারণ হাতের কাছে কোনোরেফারেন্সনেই তিনি বলে যাচ্ছেন সংশ্লিষ্ট সব তথ্যই তার মুখস্থ লেখার শেষ বাক্যটি বলে চোখ খুলতেন, বলতেন, চলবে তো? মননশীল আধুনিক কাব্যবোধ, চিত্রকলা, প্রেমানুভূতির বহুমাত্রিকতা ছিল লেখাগুলোর বিষয় ফরাসি সাহিত্যের আনুপূর্বিক খুঁটিনাটি, শিল্পকলার বাহ্যিক সৌন্দর্য অন্তর-ঐশ্বর্য তার ওইসব লেখায় বিস্তৃত চিত্রশিল্প বা ভাস্কর্য বিশ্লেষণেনারীবিষয়টি সৈয়দ আলী আহসানের লেখায় বিস্তৃত নতুন মাত্রা পেত বিশেষ করে নারীশরীরের সৌন্দর্য মাহাত্ম্য বর্ণনায় তার ভাষা-প্রাঞ্জলতায় শিল্পচেতনারূপ দ্যুতি ছড়াত

অসংকোচেই বলি, শ্রুতিলেখক হিসেবে আমি বেশ আনন্দই পেতাম

গ্রন্থকথা মিথ্যার চোরাস্রোত বয়ে যায়

প্রকাশ: ১৯ জুন ২০২৬, ১২:১১ পিএম
মিথ্যার চোরাস্রোত বয়ে যায়
বই

একটি সুন্দর জাতি গঠন করতে হলে অবশ্যই বই পড়তে হবে বই মানুষের সুপ্ত প্রতিভার বিকাশ ঘটায় আমেরিকান কবি জেমস রাসেল বলেছেন, ‘বই হলো এমন এক মৌমাছি যা অন্যদের সুন্দর মন থেকে মধু সংগ্রহ করে পাঠকের জন্য নিয়ে আসে প্রসঙ্গে দুঃখ করে বাংলা ভাষার সবচেয়ে জনপ্রিয় কথাসাহিত্যিক শরৎচন্দ্র চট্টোপাধ্যায় বলেছেন, ‘আমাদের দেশের লোক বই পড়েন বটে, কিন্তু পয়সা খরচ করে কিনে পড়েন না’…

আশির দশকের শেষপ্রান্তের কবি শামীম আহমদের এগারোতম কবিতার বইটি এবারের বইমেলায় এসেছে গ্রন্থে ছাপ্পান্নটি কবিতার পাঠোদ্ধার করা গেল তবে, শামীম আহমদের কবিতা স্বপ্রণোদিতভাবে একটি ভিন্ন পরিচয় নিয়ে আসে, তার কবিতা যারা নিয়মিত পড়েন তাদের কাছে সেটা উন্মোচিত হয় তার কবিতায় অসংখ্য পাশ্চাত্য প্রতীক, মিথ, চিত্রকল্প ব্যবহার হয় এবং বেশ দক্ষভাবে তবে বর্তমান আলোচ্য কাব্যগ্রন্থে এই স্বাভাবিক প্রবণতার স্বল্পতা লক্ষণীয় এবং কেন যেন কবি ভীষণ ক্রুদ্ধ হয়ে কবিতাগুলো লিখেছেন এবং বেশ সহজভাবে প্রকাশ করেছেনযেখানে শুধু বানিয়ার বাণিজ্য বিতানে/ বোধের বাণিজ্য হয় দেশাত্ববোধের মোড়কে,/ এই চটকদার বিজ্ঞাপনে/ আমি ভুলে যাই জন্মমূল মায়ের জঠরের সুতীব্র আর্তনাদ’ (আমি মাতৃভূমি: পৃ-৪৮)জংধরা জ্যোৎস্না দেখে প্রফুল্ল হওয়া নিরেট মূর্খতা/ এর চেয়ে মোমবৃক্ষের আলো নিষ্পাপ পবিত্র/ নিজকে পুড়িয়ে লীন হয়ে যায়/ আঁধারের যবনিকাপাতে’ (বর্তমান তারুণ্যের প্রতি: পৃ-৩৮) কবি universal true চাঁদের আলোকেও আজকের দেশ সমাজের অধোগতি দেখে পুরো ক্রোধে মুখ ফিরিয়ে নিচ্ছেনরূপকের এই দেশে আমি বড্ড সন্দিহানপ্রতিকী আলখেল্লায়, দূর্যোধনের তীরের মতো/ চিকচিক করে দৃষ্টির ফলা/ কখন যে আঁচড়ে পড়ে মৃত্যুর সওদা নিয়ে কে জানে’ (সফেদ হাঙ্গর: পৃ-৪৬) চারপাশের অবক্ষয় দেখে কবি সন্দিহান কখন যে সমাজ, জনপদ কুজনের দ্বারা ধ্বংসপ্রাপ্ত হয়, তা কবি দিব্যদৃষ্টিতে foresee করতে পারছেন নিবেদিতপ্রাণ কবিই সমাজের এই অধঃপাত দেখতে পারেন কারণ কবি শিষ্টজন তিনি বলে ওঠেন, ‘হে বন্ধু আমার, তুমি কি দেখো নৈসর্গিক বিলাস?/ আমি সব দেখে চোখ বুজি/ নৈষ্ঠিক ঋষির মতো/ বুকের গভীরে পুঁতে রাখি আরাধনার বীজ’ (নৈষ্ঠিক ঋষি: পৃ-৪৭)ডানাভাঙা পায়রা/ হাওয়ায় খুঁজে ফেরে আঁততায়ীর মুখ.../ রোদের গায়ে কান্না, লেগেছিল রক্তের দাগ আজ মনে হয় সময়ের স্রোতে/ মিশে যাচ্ছে সব স্মৃতি’ (আঁততায়ীর মুখ: পৃ-৬২)

শামীম আহমদের কবিতার একজন নিয়মিত পাঠক হিসেবেই বলা যায়, তার কবিতায় থাকে প্রতীক, মিথ, চিত্রকল্প, উৎপ্রেক্ষা ইত্যাদি যা অত্যন্ত সুনিপুণভাবে তিনি প্রয়োগ করেন, যা অনেক বোদ্ধা কবির কাছেও ঈর্ষণীয় হয়ে দাঁড়ায় কিন্তু কাব্যের সামগ্রিক ছাপ্পান্নটি কবিতা পড়লে মনে হয় কবি চটজলদি কবিতাগুলো লিখে ফেলেছেন যার কাছে কবিতা লেখার সময় শক্তি চট্টোপাধ্যায়, নীরেন্দ্রনাথ চক্রবর্তী, বুদ্ধদেব বসু, জীবনানন্দ, শহীদ কাদরী এসে টেবিলের চারধারে ঘিরে ধরেন, তার কাছ থেকে এত চটজলদি কবিতাগ্রন্থ পাঠক কামনা করে না এমনও হতে পারে দেশ সামাজিক পরিবেশের সাম্প্রতিক দৈনতা তাকে ক্রুদ্ধ করে তুলেছে তবুও তার কবিতা এক অনন্যতার জন্য আমাদের চিন্তাজগৎকে আচ্ছন্ন করে

সিলেটের ভাস্কর প্রকাশন মুদ্রণে রাজধানীর সেরা প্রকাশনকেও হার মানিয়েছে প্রচ্ছদ অত্যন্ত সুন্দর অঙ্কন করেছেন আল নোমান

কবিতা অনুবাদ হয় না মানুষের

প্রকাশ: ১৯ জুন ২০২৬, ১২:০৭ পিএম
আপডেট: ১৯ জুন ২০২৬, ১২:১১ পিএম
অনুবাদ হয় না মানুষের

সব মানুষই পরিব্রাজক

পানিপথের যুদ্ধ থেকে

            বিসমিল্লাহ খাঁর সানাই পর্যন্ত

 

যুদ্ধ যুদ্ধ খেলা ছেড়ে

কোলাহল থেকে দূরে গিয়ে

কার্তুজও জানে

            কখনো না কখনো জাগতে হবে

 

জন্মসূত্রেই মানুষ শিখেছে হানাহানি

প্রয়োগও করছে

            প্রেমে কিংবা রাষ্ট্রতন্ত্রে

 

            মানুষ কখনোই অনূদিত নয়...

কবিতা স্মৃতির ভেতর

প্রকাশ: ১৯ জুন ২০২৬, ১২:০১ পিএম
স্মৃতির ভেতর

যে ঢেউ ঘুমায় না সমুদ্রের মন্থর বুকে, পাশ ফিরে খোঁজে সমসূত্র-ছেঁড়া ফেরারি ঢেউ; তার মতো একাকী রাত জেগে আছি বুকের উঠোনে সুতীব্র বেদনার মাশরুম ছিঁড়ে ছিঁড়ে পড়ে, চিতার কালো জোছনা ঝরে পড়ে নখরে নখরে

 

হরিণখোলা মুণ্ডেশ্বরীর জলে যে দেহাতি সন্ধ্যা বিসর্জন-বিসর্জন খেলে, তুমি তার মতো আমাকে বিসর্জন দিয়ে গেছ এই স্যাঁতসেঁতে শহরে কতকাল শাদা পালকের তারাদের কোন্ডর পাখিদের মতো ডানা মেলে নামতে দেখিনি শালিকদের চরাচরে

 

আহা, কী নিখুঁত পরিকল্পনা তোমার! তবুও আতপচালের গন্ধমাখা স্মৃতির ভেতর

সোনামুখী সুই দিয়ে সেলাই করে যাব ছেঁড়া ছেঁড়া মায়ার কাহন