বাঙালির ইতিহাসে এমন বিরল বোধসঞ্জাত আর আত্মশনাক্তকারী এক সৃষ্টিশীল ব্যক্তিত্ব তথা মানবসত্তার নাম কাজী নজরুল ইসলাম। প্রাণজন্ম থেকে মানবজন্মে সত্তান্তরিত হয়ে সক্রিয় চেতনায় উদ্ভাসিত হওয়ার মুহূর্তেই তার এই ব্যক্তিস্বাতন্ত্র্য ও আত্মমুক্ততা তাকে আলাদা করে রেখেছে। বাংলাদেশ ও বাঙালির স্বাধীনতার সঙ্গে উপমহাদেশ ও অখণ্ড বাংলার স্বাধীনতার লিখিত দাবি উত্থাপন করেছেন তিনিই প্রথম। আমাদের সৌভাগ্য, তিনি আজ আমাদের জাতীয় কবি।...
মাতাধরিত্রীর প্রান্তমুক্ত বুক। সেই বুকে মানুষ জন্মস্বাধীন এক অনন্য সত্তা। কিন্তু কজন তা বোঝে বা প্রয়োগ করে? বাঙালির ইতিহাসে এমন বিরল বোধসঞ্জাত আর আত্মশনাক্তকারী এক সৃষ্টিশীল ব্যক্তিত্ব তথা মানবসত্তার নাম কাজী নজরুল ইসলাম। প্রাণজন্ম থেকে মানবজন্মে সত্তান্তরিত হয়ে সক্রিয় চেতনায় উদ্ভাসিত হওয়ার মুহূর্তেই তার এই ব্যক্তিস্বাতন্ত্র্য ও আত্মমুক্ততা তাকে আলাদা করে রেখেছে। তিনি লিখেছেন, ‘সাহিত্য মানুষের ব্যক্তিত্বের অভিব্যক্তি।’
ব্যক্তিত্ব একজন ব্যক্তির ‘আইডি’ তথা অবিভাজ্যতা তথা অনন্য পরিচয়। এ ধরনের মাঙ্গলিক, সামবায়িক, ব্যক্তিক ও সামষ্টিক অনন্যতার কথা তিনিই উপলব্ধি করেন, যিনি প্রায় চূড়ান্তভাবে আত্মসতেন ও চেতনাজাগর। এটি আসলে জন্মসূত্রে অর্জিত একটি শক্তি, যাকে সচেতনভাবে লালন করতে হয়। জগতে যখন তখন এমন ঘটে না। নিজের এই চেতনাকে অন্যের বোধে সঞ্চারিত করতে পারা মানে অন্যের ‘সহিত’ নিজের বোধের বিনিময় করতে পারা। তার নাম কমিউনিকেশন বা যোগাযোগ-ক্ষমতা। এ ক্ষমতার আত্মিক, নান্দনিক ও প্রায়োগিক রূপকেই আমরা সাধারণত সাহিত্য বা বৃহত্তর অর্থে সৃষ্টিশীলতা বলে থাকি। এটি ব্যক্তিসত্তার সঙ্গে অবিভাজ্য। সেহেতু এ ধরনের স্বশক্তি ব্যক্তিভেদে বিভিন্ন। তার বিকশিত রূপও নানা ধরনের। স্মর্তব্য, সাহিত্য কেবল গদ্য-পদ্য, গল্প-কাহিনি, নাটক ইত্যাদি মাত্র নয়। নিজের বোধকে অন্যের কাছে বিশেষভাবে গ্রহণযোগ্য করার জন্য নবোদ্ভাবিত কার্যকর আঙ্গিকও বলা যেতে পারে এই সাহিত্য। এই বৈচিত্র্য ব্যক্তির পঠনপাঠন ও স্বজ্ঞাপ্রসূত অনুশীলনের সংশ্লেষে অর্জিত হতে দেখা যায়। এ পথেই ব্যক্তিস্রষ্টার হাতে সাহিত্যের চলমান প্রকরণ নিয়ত নবায়িত হয়। সৃষ্টিশীল সাহিত্যের শাখাপ্রশাখায় নিত্যনৈমিত্তিক ভাষ্যমিশ্রণ বা ইন্টারটেকচুয়ালিটি তো ঘটেই চলেছে।
কথাসাহিত্য, কাব্যসাহিত্য, নাট্যসাহিত্য… কোনোটাই তো বাদ যায় না। তবে একমুখী স্রষ্টার সংখ্যাই অধিক, আর নানামুখী স্রষ্টা অঙ্গুলিমেয়। নজরুল শেষোক্তদের দলে অবশ্যই। যে নজরুলকে হুজুগের কবি বলে স্বকালের স্বঘোষিত প্রাগ্রসর কবি-লেখকরা অগ্রাহ্য করার চেষ্টা করেছিলেন, আজ দেখা যাচ্ছে নজরুল তাদের সবার চেয়ে অগ্রসর। কালের হুজুগ কেটে গেছে, কিন্তু নজরুলের বোধ, বীক্ষণ ও নির্মিতি নতুনভাবে মূল্যায়িত হয়ে চলেছে। চলবেও আরও বহুকাল। অন্তত যতদিন বিশ্বমঙ্গল ও শান্তির স্বার্থে মানবজাতির নৈয়ায়িক ও ভারসাম্যময় ঐক্য প্রতিষ্ঠিত না হবে। ব্যক্তি, গোত্র ও জাতি পেরিয়ে নজরুল সেই বিশ্বজাতির কথা বলেছেন তার ধ্যানে, জ্ঞানে, বাণীতে ও নির্মাণে। এই সুন্দর নজরুলের ‘আমার সুন্দর’। তার ভাষায় সর্বমঙ্গলের লক্ষ্যে ‘অভেদসুন্দর’। নজরুলের এই প্রাসঙ্গিকতা কালের সীমা ক্রমাগত অতিক্রম করেই চলেছে।
লক্ষ্যণীয়, নজরুলের বহুমাত্রিক প্রতিভা শৈশব থেকেই কবিতা বা সংগীতসহ সৃষ্টিশীলতার নানা শাখায় বিকশিত হয়েছে। মাধ্যমিক বিদ্যালয়ের গণ্ডি পেরিয়েই। ‘এই অনন্যতার মুখ্য সূত্রগুলো হচ্ছে নজরুলের উপলব্ধির মৌলিকত্ব ও অভিনবত্ব, তার অভিব্যক্তির স্বতন্ত্র শৈল্পিক পরিশীলন এবং তার বাণীসত্যের নান্দনিকতা। হাজার বছরের বাংলা কবিতার ইতিহাসে নজরুল এই বিষয়গুলো যেপথে ও যেভাবে রপ্ত, আত্মস্থ ও ব্যক্ত করেছেন, অন্য কোনো বাঙালি কবির ক্ষেত্রে তা দেখা যায় না সচরাচর।‘ (হুদা: ২০১৮: নজরুলের শ্রেষ্ঠত্ব)
নজরুলের ৪৩ বছরের সবাক যাপিত জীবন আর পরবর্তী দুই দশকাধিক নির্বাক ‘আয়নাজীবনে’ তার উক্তি ও উপলব্ধির সমর্থন মেলে। পিতৃগৃহে পিতার হাতে নানাভাষিক জ্ঞানের তালিম গ্রহণ থেকে শুরু করে চার দশক পরে বেতারে সৃষ্টিবয়ান করতে করতে যখন তিনি নির্বাক হলেন, তখন তার যাপিত এই নাতিদীর্ঘ জীবনটাই তার উক্তি ও উপলব্ধির প্রত্যক্ষ সাক্ষ্য হিসেবে উপস্থাপন করা যায়। শিল্প, সততা ও মানবসাম্যের বাণী যে সমাজে ও বিশ্বে পদদলিত, সেখানে তো নির্বাক হওয়া ছাড়া গত্যন্তর নেই। তাই ‘চির-কবিবিদ্রোহী’র বীরসত্তাও নির্বাক হয়ে গেল। যে কবি লিখিতভাবে তার জন্মভূমির স্বাধীনতা ঘোষণা করেছিলেন (ধূমকেতু/বাঙালির বাংলা) তিনি বোধে, দ্রোহে ও জীবনায়নে চির আপসহীন। এই স্বাধীনচিত্ততা যেমন তার, তেমনি সর্বকালের ভারসাম্যময় মানবজাতির। তাই তিনি মানবসমাজে প্রাসঙ্গিক কালনিরবধি।
নজরুলের বিদ্রোহে দেশ-জাতি-সমাজের পাশাপাশি নান্দনিক বিবর্তনের সাক্ষ্য আছে বাক্যে বাক্যে, ছত্রে ছত্রে। তার আগের বাংলা কবিতা ও তার পরের বাংলা কবিতা চয়নে, বয়নে, উক্তিতে ও নিরীক্ষায় স্পষ্টত আলাদা। মাতৃভাষা, দেশজ শব্দ, বহির্বিশ্বীয় শব্দ, নবোদ্ভাবিত ছন্দ-প্রকরণ, তালমাত্রার নবায়ন ও নবসৃষ্টি..., অর্থাৎ নতুন সৃষ্টির কেতন ওড়ানো যে নন্দনযুদ্ধ তিনি শুরু করেছিলেন, বাংলা সাহিত্যে তার সমান্তরাল পাওয়া ভার। আসলে স্বশিক্ষিত, স্বদীক্ষিত ও স্ব-অঙ্গীকৃত এমন একক কবিসত্তা আর কোথাও সহজে চোখে পড়ে না। রাশিয়ান ফরমালিজমের ‘অচেনাকরণ’ (ডিফেমিলিয়ারাইজন) তত্ত্বকে তার মতো আর কেউ প্রয়োগ করেননি বাংলা কবিতায়। হাজার বছরের বাংলা কবিতার সব আঙ্গিককে ব্যবহার, নবায়ন ও অগ্রায়ণ করেছেন তিনি। যুক্ত করেছেন নতুন রীতি বা শৈলীও। অর্থাৎ বাংলা ভাষার সবচেয়ে নিরীক্ষাপ্রবণ কবিদের শীর্ষেও তিনিই। পোস্ট-মডার্নিজমের পর মেটা-মডার্নিজমের শুরু, তারও সূত্রপাত নজরুলের আইকনিক কবিতা ‘বিদ্রোহী’র ‘আমি’ প্রতীকে। বিষয়টি অবশ্য অন্যত্র বিশদ ব্যাখ্যার দাবি রাখে।
সবচেয়ে বড় কথা, বাংলাদেশ ও বাঙালির স্বাধীনতার সঙ্গে উপমহাদেশ ও অখণ্ড বাংলার স্বাধীনতার লিখিত দাবি উত্থাপন করেছেন তিনিই প্রথম। তিনি সৈনিক ও যোদ্ধা কবি। বাংলা, বাঙালি ও উপমহাদেশকে বিজয়ের পথে নিয়ে গেছে তার উপলব্ধি, উক্তি, ঘোষণা ও পরিকল্পনা। বিজয়ী কবি তিনি, বিজয়ী বাঙালি, বিজয়ী মানবসন্তান। আমাদের সৌভাগ্য, তিনি আজ আমাদের জাতীয় কবি।
কাজী নজরুল, কাজী নজরুল, কাজী নজরুল ইসলাম
জননীবিশ্বে জন্মস্বাধীন কাজী নজরুল ইসলাম
বাংলাদেশের জাতীয় কবি কাজী নজরুল ইসলাম
জন্মে জন্মে বর্ষে বর্ষে
শত সালাম, তোমাকে শত সালাম।
বাংলার তুমি বাঙালির তুমি তুমি এ বিশ্বমানবের
আঘাতে তোমার নুয়ে পড়ে শির শাসক শোষক দানবের
সত্যসেনানী বীরগাজীবীর, মানুষ তমার নাম।
সুন্দর তুমি, চিরসুন্দর, সুন্দর এই পৃথিবীর
তোমার মাঝেই স্রষ্টা সৃষ্টি চির-উন্নত শির।
পদ্মা-মেঘনা-গোমতী-সুরমা-কর্ণফুলীর তীরে
ভুবনে ভবনে ফুলে ও ফসলে জয়তু জনতা ভিড়ে
ওঠে কলরোল, জয় নজরুল, জয় মানবতাধাম।
কাজী নজরুল, কাজী নজরুল, কাজী নজরুল ইসলাম
জননীবিশ্বে জন্মস্বাধীন কাজী নজরুল ইসলাম
বাংলাদেশের জাতীয় কবি কাজী নজরুল ইসলাম
জন্মে জন্মে বর্ষে বর্ষে
শত সালাম, তোমাকে শত সালাম।
লেখক: কবি ও সাবেক মহাপরিচালক, বাংলা একাডেমি