নজরুল নিঃসন্দেহে আমাদের জাতীয় জাগরণের অগ্রদূত। আমরা আজ যে স্বাধীনতা লাভ করেছি তার মূলে ছিল আমাদের মধ্যকার সামগ্রিক জাতীয় চেতনা এবং এ চেতনা জাগরণের অন্যতম নায়ক নজরুল। তার কৃতির কারণেই বাংলার জনমানস সব পরাধীনতার জিঞ্জির টুটবার জন্য প্রস্তুত হয়েছিল। জীবনের প্রারম্ভকাল থেকে মনেপ্রাণে বিপ্লব ও বিদ্রোহ কামনা করেছেন। প্রতিরোধ ব্যতীত স্বাধীনতা ও মুক্তি লাভ সম্ভব নয়, এরূপ ধারণা পোষণ করেই নজরুল থিতু হননি বরং কর্মকালে তরল অনল ছড়িয়েছেন সর্বময়।...
কাব্যসাধনার শুরুতেই নজরুল যেন এলেন, দেখলেন এবং জয় করলেন। করাচির সৈনিক ব্যারাকে নজরুলের সৃজন সাধনার স্ফূরণ হলেও বিকাশ ঘটে ১৯২০-এর প্রথমার্ধে কলকাতায় এসে। ১৯২১ সালের ডিসেম্বরের শেষদিকে কলকাতায় কোনো এক বর্ষণমুখর রাতে নজরুল রচনা করেন তার কালোত্তীর্ণ কবিতা ‘বিদ্রোহী’। বিদ্রোহীর চিরবিপ্লবী রূপ নজরুলকে চিরস্থায়ী বিপ্লবীর তকমা দিয়েছে। বিদ্রোহী রচনার আগে-পরের সময়টা ছিল ভারতের মুক্তিসংগ্রাম বা বিপ্লবের জন্য অগ্নিগর্ভ সময়। প্রথম বিশ্বযুদ্ধ ১৯১৯-এ সমাপ্তের পর ভারতের স্বাধীনতা আন্দোলন ক্রমবর্ধমান। এ বাতাবরণে ‘বিদ্রোহী’ কবিতা রচিত হলে বাঙালির হৃদয়ের সেই পুঞ্জীভূত ব্রিটিশবিরোধী ক্ষোভ অগ্নিস্ফূলিঙ্গের মতো ছড়িয়ে পড়ে। ‘বিদ্রোহী’ কবিতার বিপ্লবী রূপ যেন ভারতের আপামর জনতার চোখে-মুখে। এ যেন শুধু ভারতীয় নয়, তাবৎ বিশ্বের অত্যাচারী, উৎপীড়ক শক্তির বিরুদ্ধে নির্যাতিত-উৎপীড়িতদের পাশে এসে দাঁড়াবার কবিতা।
নজরুল শুধু বাণীবর্ষণেই থেমে যাননি, সুরের ঝংকার থেকে স্লোগানের ধ্বনির বিচ্ছুরণ ঘটিয়েছেন। নজরুল তার রচনায় ভিন্ন ভাষার সম্ভার থেকে যে শব্দ কিংবা যে উপমা দিয়েছেন তার মধ্যেও বিদ্রোহের বার্তা দৃশ্যমান হতো। তিনি ইন্দ্রের বাহন, বাণ ও ত্রিশূলের কথা এনেছেন। মুসলিমজাত শব্দ ‘তাজি’ ব্যবহার করেছেন, যার অর্থ ‘বেগবান তেজস্বী ঘোড়া’। এসব বিষয়েও তার গতির ও তেজের স্বাক্ষর মেলে।
নজরুলের বিপ্লবী চেতনার সন্ধানে আমরা ‘বিদ্রোহী’ রচনাকে অনেকেই মান্য করি; কিন্তু বালক ও কিশোর বয়সেই নজরুলের চেতনায় বিপ্লবের বারুদের গন্ধ মেলে।
বিপ্লবী চেতনার নজির নজরুলের লেটো দলের গানের মধ্যেও খুঁজে পাওয়া যায়। কারণ, তিনি যে আজন্ম বিপ্লবী। লেটো গানে নজরুল লেখেন-
‘চল ওহে মন্ত্রীসৃত স্বরাজ্যে ফিরে
ঈশ্বরের অপার মহিমা দেখি নাই দেশ-দেশান্তরে।
অসংখ্য গ্রাম নগরাদি
দুর্গ গুহা পর্বত আদি, কত নদ-নদী
দেখিলাম কিন্তু নিরবধি স্বদেশ জাগিছে অন্তরে।’
স্বদেশের প্রতি প্রেম ও স্বদেশকে মুক্ত করে সুরক্ষা দিতে চিরকাল নজরুল মগ্ন ছিলেন। সেই মগ্নতার ঘোর দোলা দিয়েছিল কিশোর বয়সে। এই দোলার অনুরণন ঘটেছে বিদ্যায়তনিক কালে ও পরবর্তী জীবনে।
নজরুলের প্রবন্ধে বিপ্লবী চেতনার পরিচয় নামলিপিতেই হাজিরা দেয়। ‘যুগবাণী’ (১৯২২), ‘রাজবন্দীর জবানবন্দী’ (১৯২৩), ‘দুর্দিনের যাত্রী’ (১৯২৬), ‘রুদ্রমঙ্গল’ (১৯২৭), ‘ধূমকেতু’ (১৯৬০) নামই গতি ও গন্তব্য জানান দেয়।
নজরুল সব সৃষ্টির মাঝে একটা সুস্পস্ট বাণী দিতেন। এই বাণী স্বচ্ছ ও সুস্পস্ট। নজরুলের বিবেচনায় ধর্মের, জাতির, বর্ণের কোনো বেড়াজাল ছিল না। এ জন্য সবাইকে এক কাতারে দাঁড় করিয়ে সামাজিক রেনেসাঁসের কথা বলতেন।
নজরুলের বিপ্লব কেবল বক্তব্যে নয়, একটা যুগ পরিবর্তনের বিষয় ছিল এর ভেতর। নজরুলের উন্মেষকালে কবিতার অনুভব স্তোত্র এবং ভাবানুষঙ্গই ছিল কবিতা আস্বাদনের প্রধান দৃষ্টিভঙ্গি। কবিরা শব্দ প্রয়োগের দিকে বেশি দৃষ্টি দিতেন। ছন্দ ও চিত্রকল্প নিয়ে বেশি ডুবে চিন্তা করতেন। একটা বিষয় সে সময়ের প্রাগ্রসর পাঠক অনুভব করতেন- কবিদের রক্ষণশীল ও অনুবর্তনকারী মানসিকতা। উপমার ব্যঞ্জনও যেন একটা গণ্ডির ভেতর ঘুরপাক খেত। নারীর চোখ, চুল, বাহু ও অন্য প্রত্যঙ্গগুলোর উপমা ঘুরেফিরে চলছিল একই ঘোরটোপে। কিন্তু নজরুল যেন কবিতার পুরো ছক পালটে দিলেন- জমিন ‘গঠন’ শৈলী, উপমা, রূপকল্প সবটাই। নজরুলের সৃজনে পুরাণ, বাইবেল, কোরআন সব তুলে এনেছেন। ইস্রাফিল, জিব্রাইল, পরশুরাম, চেঙ্গিসসহ নানা উপকরণ। কবিতার শব্দচয়নে তৎসম, তদ্ভব ও বিদেশি শব্দের সমন্বয়। সব মিলিয়ে নজরুল যেন সমকালীন নতুন যাত্রী, একই সঙ্গে মহাকালের দিকনির্দেশক।
বাঙালি যেন নজরুলকে উপজীব্য করে নবনিশান হাতে নতুন অভিযাত্রী দল। নজরুল ১৯২৫-এ মাতেন স্বাধীনতাকামী ‘লেবার স্বরাজ পার্টি’র কাজে। সম্পাদনা করেন ‘লাঙল’নামীয় ক্ষুরধার পত্রিকা। তিনি শুধু দেশের মুক্তি নয়, মানুষের মুক্তির ভাবনায় যুক্ত হন। নজরুল জন্ম দেন ‘সাম্যবাদী’, ‘কৃষকের গান’। নজরুলের রচনার ভেদ-বৃত্তান্ত যদি ফিরে দেখি তবে সহজেই অবলোকন করি কবিতা, গান, নাটক ও প্রবন্ধের মধ্যে কোনো না কোনো ফরম্যাটে নজরুল সমাজব্যবস্থার চালচিত্রে ভেঙে গড়ার তাগিদ দিয়েছেন।
নজরুলের বিপ্লবের বজ্রকঠিন রূপ নিপীড়নের মাধ্যমেও রদ করা যায়নি। ‘রাজবন্দীর জবানবন্দী’ রচনার জন্য ১৯২৩ সালের ১৬ জানুয়ারি ১ বছরের কারাদণ্ড হয় নজরুলের। জেলজীবনে তাকে প্রথম শ্রেণির কয়েদির মর্যাদা আদালত কর্তৃক মঞ্জুর হলেও ইংরেজ প্রশাসকরা তা পালন করেনি। বরং অত্যাচারের স্ট্রিম রোলার চালায়। সাধারণ কয়েদি তো বটেই, নজরুলের হাতে-পায়ে ডান্ডাবেড়ি পরানো হয়, লোহার থালায় অতি নিম্নমানের খাবার দেওয়া হয়। নজরুল অনশন শুরু করেন। অনেকেই তার পথ অনুসরণ করেন। ৩৯ দিন অনশনের পর মাতৃসম বিরজা দেবী নজরুলের অনশন ভাঙান।
দেশবন্ধু চিওরঞ্জন দাশ, বিপিনপাল, সুরেন্দ্রনাথ, সুভাষ বসু কাজীর বিদ্রোহী তাপের খবর জানতেন। ব্রিটিশবিরোধী ভূমিকা মূল্যায়নে রবীন্দ্রনাথ স্বয়ং নজরুলকে আমলে রেখেছেন। আর নেতাজি সুভাষ বসু নজরুলের সংর্বধনায় ১৯২৯ সালে অ্যালবার্ট হলে বলেছিলেন- ‘আমরা যখন যুদ্ধে যাব তখন কাজীর গান গাইব।’
নজরুলের বোধ ও সৃজন অপরিমেয় এবং শিল্পবোধের বাটখারা দিয়ে মাপা যায় না। তার চেতনা তীক্ষ্ণ। এ ক্ষেত্রে নজরুল চলেছেন নিজের বিশ্বাসের শিরদাঁড়ায়। সর্বভারতীয় নেতা গান্ধীজি প্রবর্তিত মিনমিনে অহিংস-অসহযোগ আন্দোলনের লক্ষ্যের গন্তব্যে নজরুলের ভরসা ছিল না। এ জন্য লেখেন- ‘স্বরাজ-টরাজ বুঝি না, কেননা ভারতবর্ষের এক পরমাণু অংশও বিদেশীদের অধীনে থাকবে না।’
নজরুলের প্রলয়লংকরী উচ্চারণ শুধু দুঃসাহসী নয়, কল্পনার সীমাকেও অতিক্রম করে। তিনি লেখেন-
‘যারা তেত্রিশ কোটি মানুষের অন্ন কেড়ে খায় সেই শোষক-
সাম্রাজ্যবাদী ব্রিটিশ শক্তির সর্বনাশ যেন হয়।’
কবির শিল্পসিদ্ধি ও সৌন্দর্য প্রকাশ স্বতঃস্ফূর্ত ও প্রাণময় বলেই তার সৃষ্টি কবিতা হয়ে ওঠে প্রাণের দাবিতে ইস্পাতের মতো তীক্ষ্ণ। সৃষ্টিধর্ম উল্লাসে ভরা যৌবনের মতো তরঙ্গিত।
কোনো ধরনের বিরূপতা তাকে অন্যায়ের বিরুদ্ধে যুদ্ধংদেহি অবস্থা থেকে বিরত করতে পারেনি। এটাই তো নজরুল চরিত্রের চিরবিপ্লবী রূপের সাক্ষ্য।
ভারতের পূর্ণ স্বাধীনতার দাবি উত্থাপন করতে যে দুজন ব্যক্তি প্রথম এগিয়ে আসেন তারা হলেন নেতাজি ও নজরুল। কাজী নজরুল ইসলাম সম্পাদিত অর্ধ-সাপ্তাহিক পত্রিকা ধূমকেতু প্রথম আত্মপ্রকাশ করে ১১ আগস্ট ১৯২২ সালে। এই পত্রিকার প্রথম সংখ্যায় নজরুল অকুতোভয়ে স্বাধীনতার দাবি ঘোষণা করে লিখলেন, “...সর্বপ্রথম ‘ধূমকেতু’ ভারতের পূর্ণ স্বাধীনতা চায়। স্বরাজ-টরাজ বুঝি না, কেননা ও কথাটার মানে এক এক মহারথী এক এক রকম করে থাকেন। ভারতবর্ষের এক পরমাণু অংশও বিদেশীয় অধীনে থাকবে না। ভারতবর্ষের সম্পূর্ণ দায়িত্ব, সম্পূর্ণ স্বাধীনতা রক্ষা, শাসনভার- সমস্ত থাকবে ভারতীয়দের হাতে। তাতে কোন বিদেশীর মোড়লীর অধিকারটুকু পর্যন্ত থাকবে না।”
নজরুল নিঃসন্দেহে আমাদের জাতীয় জাগরণের অগ্রদূত। কারণ, আমরা আজ যে স্বাধীনতা লাভ করেছি তার মূলে ছিল আমাদের মধ্যকার সামগ্রিক জাতীয় চেতনা এবং এ চেতনা জাগরণের অন্যতম নায়ক নজরুল। তার কৃতির কারণেই বাংলার জনমানস সব পরাধীনতার জিঞ্জির টুটবার জন্য প্রস্তুত হয়েছিল। তাই বিদ্রোহী কবি কাজী নজরুল ইসলাম আমাদের জাতীয় জাগরণের অগ্রদূত। জীবনের প্রারম্ভকাল থেকে মনেপ্রাণে বিপ্লব ও বিদ্রোহ কামনা করেছেন। প্রতিরোধ ব্যতীত স্বাধীনতা ও মুক্তি লাভ সম্ভব নয়, এরূপ ধারণা পোষণ করেই নজরুল থিতু হননি বরং কর্মকালে তরল অনল ছড়িয়েছেন সর্বময়।
লেখক: প্রাবন্ধিক ও গবেষক