বিশাল মাঠের শেষ প্রান্তে ইন্দো-ইউরোপিয়ান স্থাপত্যশৈলীতে নির্মিত বহুতল ভবনটি পুঠিয়া রাজবাড়ী। সম্রাট আকবরের সময় পুঠিয়া রাজবংশের উদ্ভব; আর এ রাজবংশের প্রতিষ্ঠাতা পীতাম্বর। রাজশাহী-নাটোর সড়কে নাটোর থেকে প্রায় ১৬ কিলোমিটার পশ্চিম-দক্ষিণে পুঠিয়া উপজেলা সদরে দৃষ্টিনন্দন পাঁচটি মন্দিরসহ বেশ কয়েকটি প্রত্নতাত্ত্বিক অবকাঠামো রয়েছে।
বহিঃশক্র থেকে রক্ষায় বহু বছর আগে খনন করা শিবসাগর দিঘী, গোবিন্দসাগর দিঘী, রাধাসাগর দিঘী, মরাচৌকি দিঘী আর হুগলা দিঘী ঘিরে রেখেছে পুঠিয়া রাজবাড়ীকে। আর এ রাজবাড়ীর পাশাপাশি ধর্মীয় আচার-অনুষ্ঠানের জন্য বিভিন্ন সময় তৈরি করা দোলমঞ্চ, পঞ্চরত্ন গোবিন্দ মন্দির, দক্ষিণমুখী শিবমন্দির, গোপাল মন্দির আর বড় আহ্নিক মন্দিরের দৃষ্টিনন্দন কারুকাজ দেখতে প্রতিদিনই দেশের বিভিন্ন এলাকা থেকে আসেন শত শত পর্যটক। কিন্তু তাদের জন্য নেই কোনো টয়লেট সুবিধা, থাকার বা বিশ্রাম করার ব্যবস্থা। নেই ভালো রেস্তোরাঁ, এমনকি বসার ব্যবস্থাও।
পুঠিয়া রাজবাড়ীকে প্রত্নতত্ত্ব অধিদপ্তর বহু বছর আগে পুঠিয়া গ্রুপ অব মনুমেন্টসে তালিকাভুক্ত করলেও এর নিদর্শনগুলো রক্ষণাবেক্ষণে তেমন গুরুত্ব দেয়নি। ফলে মাটিতে লবণাক্ততা বৃদ্ধি আর জলবায়ু পরিবর্তনের ফলে নষ্ট হয়ে যাচ্ছে নিখুঁত কারুকাজ করা পোড়মাটির ফলকগুলো।
বগুড়ায় প্রত্নতত্ত্ব অধিদপ্তরের রাজশাহী ও রংপুর বিভাগের আঞ্চলিক পরিচালকের দায়িত্বে আছেন এ কে এম সাইফুর রহমান। মাটিতে লবণাক্ততা বৃদ্ধি আর জলবায়ু পরিবর্তনে নিদর্শনগুলোর কী ধরনের ক্ষতি হচ্ছে এ প্রশ্নের জবাবে এ কে এম সাইফুর রহমান বলেন, ‘লোনা ধরে নষ্ট হয়ে যাচ্ছে পোড়ামাটির দৃষ্টিনন্দন ফলকগুলো। জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাবও পড়েছে ফলকগুলোয়। ফলে সৌন্দর্য আর উজ্জ্বলতা হারাচ্ছে দৃষ্টিনন্দন অবকাঠামোগুলো।’
গুরুত্বপূর্ণ এসব প্রত্নতাত্ত্বিক অবকাঠামোগুলো রক্ষার পাশাপাশি দর্শনার্থীদের সুযোগ-সুবিধা বৃদ্ধির কোনো উদ্যোগ আছে কি না এ প্রশ্নের জবাবে এ কে এম সাইফুর রহমান বলেন, ‘প্রায় ৫০ কোটি টাকার একটি প্রকল্প প্রস্তাব সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়ে পাঠানো হয়েছে। অনুমোদন হলে আগামী জুলাই মাসে শুরু হবে কাজ।’
পুঠিয়ায় রাজবাড়ীসহ অন্যান্য প্রত্নতাত্ত্বিক অবকাঠামো দেখতে রাজধানী ঢাকা থেকে সপরিবারে আসেন সাখাওয়াত হোসেন বাবু। কেমন দেখলেন এ প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, ‘এখানে এসে আমার ভালো লেগেছে, সুন্দর কারুকাজ করা মন্দিরগুলো দেখলাম। তবে মন্দিরগুলোর ওপরে ওঠা বন্ধ থাকায় কিছুটা অতৃপ্তি থেকে গেল। এখানে বাইরে থেকে আসা পর্যটকদের খাবারের সুব্যবস্থা নেই, বাথরুম নেই। এগুলো থাকা দরকার ছিল।’
গাজীপুর থেকে এসেছিলেন আমিনুল ইসলাম। সঙ্গে ছিলেন তার পরিবারের সদস্যরা। কেমন দেখলেন এ প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, ‘ভালো লেগেছে নিদর্শনগুলো বিশেষ করে রাজারবাড়ী, মন্দির ও আশপাশের পরিবেশ। তবে কিছু এলাকা নোংরা আর দুর্গন্ধে চলাচল করা কষ্টসাধ্য। দর্শনার্থীদের জন্য বসার ভালো জায়গা, খাবারের ভালো ব্যবস্থা আর টয়লেট সুবিধা নেই বললেই চলে। এসব ব্যবস্থা থাকলে দর্শনার্থীদের কষ্ট কম হতো।’
পুঠিয়া এলাকার বাসিন্দা রিকু মণ্ডল। এখানেই তার বেড়ে ওঠা। কী দেখেছেন ছোট বেলায় আর এখন কী দেখছেন আর দর্শক পর্যটকদের আকৃষ্ট করতে কী করা যেতে পারে–এসব প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, ‘মন্দির বা রাজবাড়ীতে ছোটবেলায় যা দেখেছি তার অনেক কিছুই নষ্ট হয়ে গেছে, পুকুরগুলো সংস্কার করে বিনোদনের নানা উদ্যোগ নেওয়া যেতে পারে। আর সুযোগ-সুবিধা বৃদ্ধি করা সম্ভব হলে দর্শক-পর্যটক বাড়বে।’
পুঠিয়ায় গিয়ে দেখা গেছে, চারতলা বিশিষ্ট দোলমন্দির সংস্কার করা হয়নি অনেকদিন ধরে। পঞ্চরত্ন গোবিন্দ মন্দিরের অনেকাংশ নষ্ট হয়ে গেছে, ক্ষয় হয়ে গেছে পোড়ামাটির সুন্দর সুন্দর ফলক। বড় আহ্নিক মন্দিরের ছাদ নষ্ট হয়ে যাচ্ছে। দীর্ঘদিন সংস্কার না করায় পোড়ামাটির ফলকও হারিয়েছে সৌন্দর্য। রাজবাড়ীর সৌন্দর্য এখনো কিছুটা ধরে রাখতে পেরেছে কর্তৃপক্ষ। কিন্তু অন্য অবকাঠামোগুলো রক্ষণাবেক্ষণের অভাবে নষ্ট হয়ে যাচ্ছে খুব দ্রুত। পঞ্চরত্ন গোবিন্দ মন্দিরে যেসব পোড়ামাটির ফলক রয়েছে তার অনেকগুলোতেই সূক্ষ্ম কারুকাজ দিয়ে বর্ণনা করা হয়েছে ধর্মীয় বিষয়। এ মন্দিরটি অন্তত ২৫০ বছর আগে নির্মিত বলে ধারণা করা হলেও মন্দিরের গায়ে যেসব পোড়ামাটির ফলক রয়েছে তা দেখে ধারণা করা হয় ঊনবিংশ শতাব্দীতে নির্মিত। রামায়ণ, মহাভারত ও পৌরাণিক কাহিনির ওপর ভিত্তি করে তৈরি পোড়ামাটির ফলকগুলোর অধিকাংশ নষ্ট হয়ে গেছে অথবা উজ্জ্বলতা হারিয়েছে। পুঠিয়া গ্রুপ অব মনুমেন্টের অন্যতম সুন্দর নিদর্শন এক কক্ষ বিশিষ্ট গোপাল মন্দির। এ মন্দিরের গায়ে লাগানো পোড়ামাটির ফলকেও রয়েছে রাধাকৃষ্ণের লীলার বিভিন্ন চিত্র, হিন্দু দেবদেবীর মূর্তি ও রামায়ণ মহাভারতের কাহিনি ইত্যাদি।