২০২০ সালে ট্রাম্প প্রশাসন ইরানের শীর্ষ সামরিক কর্মকর্তা কাসেম সোলাইমানিকে হত্যা করলে তৎকালীন সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ আলি খামেনি সীমিত ও নিয়ন্ত্রিত প্রতিশোধের পথ বেছে নিয়েছিলেন। ইরান তখন ইরাকে একটি মার্কিন ঘাঁটিতে ক্ষেপণাস্ত্র হামলা চালালেও আগাম সতর্কবার্তা পাঠানো হয়েছিল, যাতে মার্কিন সেনারা নিরাপদ স্থানে আশ্রয় নিতে পারেন। কিন্তু সাম্প্রতিক হামলাগুলো ইঙ্গিত দিচ্ছে যে, সেই হিসাব-নিকাশ বদলাতে শুরু করেছে।
চলতি সপ্তাহে ইসরায়েলে ইরানের নতুন হামলাকে সাম্প্রতিক সময়ের সবচেয়ে সাহসী পদক্ষেপ হিসেবে দেখা হচ্ছে। তেহরান কয়েক দশক ধরে প্রক্সি গোষ্ঠী, গোপন অভিযান এবং পাল্টা প্রতিক্রিয়ার মাধ্যমে পরিচালিত হয়ে আসা সংঘাতের নতুন সীমারেখা নির্ধারণের চেষ্টা করছে।
লেবাননে ইসরায়েলি হামলার জবাবে ইসরায়েলকে লক্ষ্যবস্তু করে ইরান এই বার্তা দিয়েছে যে, তাদের ‘চূড়ান্ত সীমা’ আর শুধু নিজস্ব সীমান্তের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। একই সঙ্গে দেশটির নেতৃত্ব আগের তুলনায় আরও বড় ঝুঁকি নিতে প্রস্তুত।
মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পও সম্প্রতি ইরানের বর্তমান নেতৃত্বকে ‘আগের তুলনায় বেশি যুক্তিবাদী’ ও ‘যৌক্তিক’ বলেছেন।
গত ৮ এপ্রিল যুদ্ধবিরতি কার্যকর হওয়ার পর থেকে তেহরান বারবার অভিযোগ করে আসছে– ইসরায়েল ও যুক্তরাষ্ট্র সামরিক পদক্ষেপের মাধ্যমে ওই যুদ্ধবিরতির কার্যকারিতা ক্ষুণ্ন করছে। পরোক্ষ আলোচনা চলতে থাকলেও যুক্তরাষ্ট্র ইরানি লক্ষ্যবস্তুতে হামলা চালিয়েছে।
লেবাননের প্রধানমন্ত্রী নওয়াফ সালাম জানান, যুদ্ধবিরতি সত্ত্বেও ইসরায়েল রাজধানী বৈরুতসহ দেশটিতে প্রায় ৩ হাজার ৫০০ বার হামলা চালিয়েছে।
জবাবে ইরান মধ্যপ্রাচ্যে যুক্তরাষ্ট্রের ঘাঁটি ও উপসাগরীয় অঞ্চলে কিছু লক্ষ্যবস্তুতে পাল্টা হামলা চালায়। তেহরান সতর্ক করেছে, কূটনৈতিক প্রচেষ্টা ব্যর্থ হলে তারা পুনরায় যুদ্ধ শুরু করতে এবং তা পারস্য উপসাগরের বাইরে বিস্তৃত করতে প্রস্তুত। এমন পরিস্থিতিতে ভারত মহাসাগর, লোহিত সাগর ও ভূমধ্যসাগর পর্যন্ত বিস্তৃত গুরুত্বপূর্ণ নৌপথও ঝুঁকির মুখে পড়তে পারে।
গত মঙ্গলবার রাত থেকে গতকাল বুধবার ভোর পর্যন্ত যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে আবারও পাল্টাপাল্টি হামলার ঘটনা ঘটে। এর আগে যুক্তরাষ্ট্রের একটি সামরিক হেলিকপ্টার ভূপাতিত হওয়ার ঘটনায় উত্তেজনা আরও বেড়ে যায়।
বিশ্লেষকরা বলছেন, চলতি সপ্তাহে ইসরায়েলের ওপর হামলা ইরানের কৌশলে আরও বড় পরিবর্তনের ইঙ্গিত দিচ্ছে।
তেহরান বলেছে, তাদের আঞ্চলিক মিত্রদের বিরুদ্ধে ইসরায়েলি সামরিক অভিযানও সরাসরি ইরানি প্রতিক্রিয়া ডেকে আনতে পারে।
ইরানের প্রধান আলোচক ও পার্লামেন্ট স্পিকার মোহাম্মদ বাঘের গালিবাফ গত সোমবার বলেন, ‘কাগজে-কলমে যে যুদ্ধবিরতি ছিল, তা বারবার লঙ্ঘিত হয়েছে। আমরা সেই সমীকরণ বদলে দিয়েছি। আস্থা অর্জনের প্রকৃত সদিচ্ছা না দেখা পর্যন্ত ইরানের প্রতিক্রিয়া একই থাকবে।’
ইরানের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র ইসমাইল বাঘাই বলেছেন, ইরান কখনোই এমন পরিস্থিতি মেনে নেবে না যেখানে ইসরায়েল ও যুক্তরাষ্ট্র হামলা চালিয়ে যাবে। আর বলবে তারা যুদ্ধবিরতির জন্য প্রতিশ্রুতিবদ্ধ।
পর্যবেক্ষকদের মতে, তেহরানের নতুন নেতৃত্ব ধীরে ধীরে সেই সতর্ক ও প্রতিক্রিয়াশীল নীতি থেকে সরে আসছে, যা দীর্ঘদিন ধরে ইসলামি প্রজাতন্ত্রের কৌশলের ভিত্তি ছিল। কেবল প্রতিরোধ ও ধৈর্যের ওপর নির্ভর না করে তারা এখন সামরিক, অর্থনৈতিক ও আঞ্চলিক প্রভাব ব্যবহার করে মধ্যপ্রাচ্যের পরিস্থিতি নিজেদের পক্ষে গড়ে তুলতে বেশি আগ্রহী।
সাবেক মার্কিন মধ্যপ্রাচ্য শান্তি আলোচক অ্যারন ডেভিড মিলার বলেন, ‘ইরান এখন যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েল- উভয়কেই কঠিন পরিস্থিতিতে ফেলেছে। তারা ঝুঁকি নিতে প্রস্তুত। নিজেরা এগিয়ে আছে বলে মনে করছে এবং যুদ্ধবিরতিতে তাদের স্বার্থ দেখছে না।’
যুক্তরাষ্ট্রভিত্তিক গবেষণা প্রতিষ্ঠান কুইন্সি ইনস্টিটিউটের নির্বাহী ভাইস প্রেসিডেন্ট ত্রিতা পারসি বলেন, ‘কয়েক দশকের মধ্যে এই প্রথম কোনো আঞ্চলিক শক্তি ইসরায়েলের সামরিক পদক্ষেপের বিরুদ্ধে সরাসরি শক্তি প্রয়োগের সক্ষমতা ও ইচ্ছা দেখিয়েছে।’
হামলার পর ইরান সতর্ক করেছে, তারা উত্তেজনার মাত্রা আরও বাড়াতে প্রস্তুত।
ইসরায়েলি সামরিক গোয়েন্দা সংস্থার সাবেক কর্মকর্তা ড্যানি সিট্রিনোভিচ বলেন, ‘ইরান এখন এমন একটি নতুন সমীকরণ প্রতিষ্ঠা করতে চায়, যার মাধ্যমে শুধু ইরান নয়, বরং পুরো আঞ্চলিক মিত্র নেটওয়ার্কের বিরুদ্ধে ইসরায়েলি পদক্ষেপও নিরুৎসাহিত করা যাবে।’
তার মতে, সাম্প্রতিক ঘটনাগুলো প্রমাণ করছে, ইরানের বর্তমান নেতৃত্ব ক্রমেই বিশ্বাস করতে শুরু করেছে, যা কূটনীতির মাধ্যমে অর্জন সম্ভব নয়, তা শেষ পর্যন্ত শক্তি প্রয়োগের মাধ্যমেও অর্জন করা যেতে পারে।
ইরানও যুক্তরাষ্ট্র-ইসরায়েলের সম্পর্ককে পরীক্ষা করছে। চলমান যুদ্ধের শেষ পরিণতি নিয়ে দুই দেশের মধ্যে ক্রমবর্ধমান মতপার্থক্যকে কাজে লাগাচ্ছে বলে মনে হচ্ছে। ট্রাম্প সাম্প্রতিক সময়ে বেশ কয়েকবার প্রকাশ্যে ইসরায়েলি প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহুর মতের বিরোধিতা করেছেন। তিনি জোর দিয়ে বলেছেন, তেহরানের সঙ্গে একটি কূটনৈতিক চুক্তি হাতের নাগালে রয়েছে এবং এও দাবি করেছেন, তা মেনে নেওয়া ছাড়া ইসরায়েলের ‘কোনো বিকল্প থাকবে না’। সূত্র: সিএনএন