বিশ্বজুড়ে তাপমাত্রা বৃদ্ধি ও চরম আবহাওয়ার বার্তা নিয়ে আবারও ফিরে আসছে ‘এল নিনো’। জাতিসংঘ ইতোমধ্যে এই আসন্ন পরিস্থিতি মোকাবিলায় বিশ্বকে প্রস্তুত হওয়ার আহ্বান জানিয়েছে। বিশ্ব আবহাওয়া সংস্থা (ডব্লিউএমও) জানিয়েছে, আগামী সেপ্টেম্বর মাসের আগে এল নিনো সক্রিয় হওয়ার সম্ভাবনা ৮০ শতাংশ ও নভেম্বরের আগে এই সম্ভাবনা ৯০ শতাংশ।
তবে বিশেষজ্ঞদের সবচেয়ে বড় উদ্বেগের জায়গা হলো মানবসৃষ্ট জলবায়ু পরিবর্তনের পটভূমিতে এবার এল নিনো আবির্ভূত হচ্ছে। ফলে এর প্রভাব আরও মারাত্মক ও ধ্বংসাত্মক হতে পারে। তীব্র তাপপ্রবাহ ও খরার কারণে এশিয়া মহাদেশ সবচেয়ে বেশি ঝুঁকিতে রয়েছে। এটি এই অঞ্চলের কৃষি, বিদ্যুৎ গ্রিড ও পানি সরবরাহের ওপর চরম চাপ সৃষ্টি হবে।
ভারতের জন্য ‘প্রাণঘাতী সংমিশ্রণ’ মূল শঙ্কা হচ্ছে, এল নিনো ভারতের চলমান তীব্র তাপপ্রবাহকে আরও বাড়িয়ে দিতে পারে। একই সঙ্গে এটি আসন্ন মৌসুমি বায়ুকে দুর্বল করে দিতে পারে। জুন মাসে শুরু হতে যাওয়া বর্ষা মৌসুমে ইতোমধ্যে ‘স্বাভাবিকের চেয়ে কম’ বৃষ্টির পূর্বাভাস দেওয়া হয়েছে। সাম্প্রতিক সপ্তাহগুলোতে তীব্র তাপপ্রবাহে বিপর্যস্ত ও মধ্যপ্রাচ্য সংকটের কারণে জ্বালানিসংকটে থাকা ভারতের জন্য এটি মারাত্মক বিপর্যয় ডেকে আনতে পারে।
যদি এল নিনোর কারণে বৃষ্টিপাত দেরিতে হয়, তবে তাপপ্রবাহ আরও দীর্ঘায়িত হবে। এতে সাধারণ মানুষের জীবিকা ব্যাহত হবে ও হাজার হাজার মানুষের মৃত্যু হতে পারে। বৃষ্টির ঘাটতি কৃষকদের জন্য বড় বিপর্যয় নিয়ে আসবে। মে মাসের তাপপ্রবাহ ইতোমধ্যে গম ও সরিষা ফসলের ক্ষতি করেছে। এল নিনো খরা পরিস্থিতিকে আরও খারাপ করতে পারে, যা দেশের খাদ্য নিরাপত্তার ওপর মারাত্মক প্রভাব ফেলবে।
ভারতীয় কৃষি বিশেষজ্ঞ ও অ্যাক্টিভিস্ট দেবিন্দর শর্মা জলবায়ুর গতিপ্রকৃতি অনুসরণ করা প্রতিষ্ঠান ‘কার্বন কপি’কে বলেন, ‘জলবায়ু পরিবর্তন ও বর্তমান ভূরাজনৈতিক পরিস্থিতির মধ্যে ২০২৬ সাল ভারতের জন্য একটি পরীক্ষা ক্ষেত্র হতে যাচ্ছে।’
‘চলমান তীব্র তাপপ্রবাহ শঙ্কা তৈরি করছে। আমরা এল নিনো আসছে বলে মনে করছি, যার প্রভাব জুলাই বা আগস্টে দৃশ্যমান হবে। এটি ভারতের জন্য, বিশেষ করে ভারতের কৃষির জন্য প্রাণঘাতী হয়ে উঠতে পারে।’
মধ্যপ্রাচ্য সংকটের কারণে ভারতের কৃষকরা ইতোমধ্যে সারসংকটের শঙ্কায় রয়েছেন। এ ছাড়া এল নিনোর প্রভাব পড়তে পারে ভারতের মুম্বাই শহরের ওপর। মুম্বাইয়ের ২২ মিলিয়নেরও বেশি মানুষের পানির একমাত্র উৎস সাতটি বৃষ্টিনির্ভর হ্রদ। বর্তমানে এই হ্রদগুলোতে মাত্র ৪৫ দিনের পানি অবশিষ্ট রয়েছে। বর্ষা সময়মতো না এলে মুম্বাই বড় ধরনের পানির সংকটে পড়বে।
চীনের বিভিন্ন অংশে জরুরি রসদ মজুতের ডাক। চীনে গ্রীষ্মকালে সাধারণত বন্যা ও খরা উভয় পরিস্থিতিই দেখা যায়। জলবায়ুসংকটের কারণে এই দুর্যোগগুলো আরও তীব্র হয়েছে ও বিদ্যুৎ গ্রিডের ওপর চাপ বাড়িয়েছে। এল নিনোর কারণে চলতি বছর এই চ্যালেঞ্জ আরও বড় হবে। দেশটির জাতীয় জলবায়ু কেন্দ্র জানিয়েছে, শরৎ ও শীতকালে এল নিনোর প্রভাব সর্বোচ্চ পর্যায়ে পৌঁছাবে। এর ফলে দক্ষিণ চীনে বৃষ্টিপাত বাড়বে ও সারা দেশে তাপমাত্রা বৃদ্ধি পাবে। সিনহুয়া জানিয়েছে, কিছু অংশে বৃষ্টিপাত গড় পরিমাণের চেয়ে ২০ শতাংশ বেশি হতে পারে।
তিব্বত মালভূমিতে অবস্থিত উত্তর-পশ্চিম চীনের উঁচু প্রদেশ ছিংহাইয়ের আবহাওয়া ব্যুরো সতর্ক করেছে, এল নিনোর প্রভাব এই মালভূমিতে ‘অপ্রত্যাশিত ও চরম’ হবে। ব্যুরো আকস্মিক আবহাওয়া পরিবর্তনের জন্য প্রস্তুতি নেওয়ার পাশাপাশি সাধারণ মানুষকে বাড়িতে জরুরি রসদ মজুত রাখার পরামর্শ দিয়েছে। বন্যা নিয়ন্ত্রণ পরিস্থিতিকে ‘গুরুতর ও জটিল’ বলে উল্লেখ করেছে চীনের পানিসম্পদ মন্ত্রণালয়। হুবেই প্রদেশসহ দেশের কিছু অংশে ইতোমধ্যে অত্যন্ত ভারী বৃষ্টিপাত শুরু হয়েছে।
দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার জন্য এক ‘স্ট্রেস টেস্ট’।মালয়েশিয়া সাবাহ বিশ্ববিদ্যালয়ের জলবায়ু পরিবর্তনবিষয়ক অধ্যাপক জাস্টিন সেনটিয়ান জানান, একটি শক্তিশালী এল নিনো দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়াজুড়ে দীর্ঘস্থায়ী ও তীব্র তাপপ্রবাহ, তীব্র খরা, দাবানল ও বায়ুদূষণ তৈরি করতে পারে। সাধারণত শক্তিশালী বাতাস পশ্চিম প্রশান্ত মহাসাগরের দিকে উষ্ণ পানি নিয়ে আসে, যা এই অঞ্চলে ভারী বৃষ্টিপাত ঘটায়। তিনি বলেন, ‘তবে এই বাতাস যখন দুর্বল বা উল্টো হয়ে যায়, তখন সেই উষ্ণ পানির প্রবাহ পূর্ব দিকে সরে যায়। এটি মালয়েশিয়া, সিঙ্গাপুর, ইন্দোনেশিয়া, থাইল্যান্ড ও ফিলিপাইনের মতো দেশগুলোকে গুরুত্বপূর্ণ বায়ুমণ্ডলীয় আর্দ্রতা থেকে বঞ্চিত করে।’ এর ফলে এই অঞ্চলের তাপমাত্রা বৃদ্ধি পাবে, যা জনস্বাস্থ্যকে ঝুঁকিতে ফেলবে, বিদ্যুৎ গ্রিডকে বিপর্যস্ত করবে ও পানির মজুত দ্রুত কমিয়ে দেবে।
ন্যাশনাল ইউনিভার্সিটি অব সিঙ্গাপুরের ভিজিটিং প্রফেসর ও বোস্টন কলেজের অধ্যাপক মিং ই জানান, কৃষি ও জলবিদ্যুৎশিল্প সবচেয়ে বেশি ঝুঁকির মুখে পড়বে। ইন্দোনেশিয়া, মালয়েশিয়া, থাইল্যান্ড ও ফিলিপাইনের মতো কৃষিপ্রধান দেশগুলো মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হবে। মধ্যপ্রাচ্য সংকটের কারণে এই অঞ্চলে ইতোমধ্যে জ্বালানি ও সারের ঘাটতি রয়েছে, যার কারণে তারা দূষিত জ্বালানির ওপর নির্ভর করতে বাধ্য হচ্ছে।
গ্লোবাল হিট হেলথ ইনফরমেশন নেটওয়ার্ক সাউথইস্ট এশিয়া হাবের চেয়ার অ্যাসোসিয়েট প্রফেসর জেসন লি বলেন, ‘দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ায় এল নিনোর প্রত্যাবর্তন কেবল একটি আবহাওয়াজনিত ঘটনা নয়। এটি ইতোমধ্যে চাপে থাকা ব্যবস্থাগুলোর জন্য স্ট্রেস টেস্ট।’
অধ্যাপক জাস্টিন সেনটিয়ান সতর্ক করেছেন, শুষ্ক মাটি ধান ও পাম তেলের মতো প্রধান ফসলের ক্ষতি করতে পারে। এটি খাদ্য সংকট তৈরি করবে ও বাজারের দাম বাড়িয়ে দেবে। ফলে স্থানীয় অর্থনীতি ক্ষতিগ্রস্ত হবে ও নিম্ন আয়ের পরিবারগুলোর পুষ্টির নিরাপত্তা বিঘ্নিত হবে। প্রত্যন্ত গ্রামীণ এলাকায় যেখানে পানির অবকাঠামো দুর্বল, সেখানে এর প্রভাব সবচেয়ে বেশি পড়বে। সেনটিয়ান বলেন, ‘শহরগুলো যেখানে কেন্দ্রীভূত ইউটিলিটি গ্রিড দিয়ে চলে, সেখানে বিচ্ছিন্ন সম্প্রদায়গুলো প্রায়ই অগভীর কুয়া, প্রাকৃতিক নদী ও পাহাড়ের ঝরণার ওপর নির্ভর করে।’
‘এল নিনোর কারণে বাষ্পীভবন দ্রুত হলে এই ভঙ্গুর পানির উৎসগুলো অদৃশ্য হয়ে যেতে বাধ্য। শোধন প্ল্যান্ট না থাকায় পরিবারগুলোর কাছে নদীগর্ভ থেকে অনিরাপদ, জমে থাকা পানি সংগ্রহ করা ছাড়া কোনো উপায় থাকে না। এটি কলেরার মতো পানিবাহিত রোগের প্রাদুর্ভাব বাড়িয়ে দেয়।’
অধ্যাপক মিং ই আরও জানান, শক্তিশালী এল নিনো ডেঙ্গু ও ম্যালেরিয়ার মতো ক্রান্তীয় রোগের অনুকূল পরিবেশ তৈরি করতে পারে।
পর্যটন খাতও এর দ্বারা ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে বলে জানান সেনটিয়ান। ব্যাংকক থেকে দা নাং পর্যন্ত বিখ্যাত পর্যটন কেন্দ্রগুলোর দিনের তাপমাত্রা ৪০ ডিগ্রি সেলসিয়াস ছাড়িয়ে যেতে পারে। এতে দর্শনার্থীদের জন্য আউটডোর আকর্ষণ ও সৈকতগুলো ব্যবহারের অনুপযোগী হয়ে পড়বে। এ ছাড়া সুমাত্রা ও কালিমান্তানের মতো জায়গায় কৃষিজমি ও পিটল্যান্ডে আগুন লাগতে পারে। এর ফলে সৃষ্ট বিষাক্ত ধোঁয়ার মেঘ সিঙ্গাপুর এবং কুয়ালালামপুরের মতো আর্থিক ও ট্রানজিট হাবগুলোকে ঢেকে ফেলতে পারে।
সিটি ইউনিভার্সিটি অব হংকংয়ের স্কুল অব এনার্জি অ্যান্ড এনভায়রনমেন্টের ডিন অধ্যাপক বেঞ্জামিন হর্টন বলেন, দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়া এল নিনোর প্রভাবে সবচেয়ে ঝুঁকিপূর্ণ অঞ্চলগুলোর একটি। তিনি যোগ করেন, ‘যে বিষয়টি এই পর্বকে আমার কাছে বিশেষভাবে উদ্বেগজনক করে তুলেছে তা হলো এটি মানবসৃষ্ট জলবায়ু পরিবর্তনের পটভূমিতে উন্মোচিত হচ্ছে। আমরা এখন আর আলাদাভাবে এল নিনোকে মোকাবিলা করছি না।’ সূত্র: দ্য গার্ডিয়ান