কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (এআই) নিয়ে উদ্বেগ যেন আরও বাড়ছে। মানুষের তৈরি করা এই প্রযুক্তি এখন নিজেই নিজেকে আরও উন্নত করার ক্ষমতা অর্জন করছে। ফলে একসময়ে এই শক্তিশালী এআই সিস্টেমের ওপর মানুষের আর কোনো নিয়ন্ত্রণ নাও থাকতে পারে। এমন এক আশঙ্কার কথা জানিয়ে বিশ্বের সব বড় এআই কোম্পানিকে আপাতত এই প্রযুক্তির দৌড় থামানোর আহ্বান জানিয়েছে খ্যাতনামা টেক প্রতিষ্ঠান ‘অ্যানথ্রোপিক’।
ভারতীয় সংবাদমাধ্যম এনডিটিভির এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ‘ক্লোড’ নামক জনপ্রিয় এআইয়ের নির্মাতা প্রতিষ্ঠান অ্যানথ্রোপিক সম্প্রতি এক চাঞ্চল্যকর তথ্য প্রকাশ করেছে। তারা জানিয়েছে, এআই এখন নিজেই নিজের উন্নত সংস্করণ বা উত্তরসূরি তৈরি করার পর্যায়ে পৌঁছে গেছে। প্রযুক্তিবিদরা একে বলছেন ‘রিকার্সিভ সেলফ-ইম্প্রুভমেন্ট’ বা স্বয়ংক্রিয় ধারাবাহিক উন্নতি। সহজ কথায়, মানুষের কোনো রকম হস্তক্ষেপ বা সাহায্য ছাড়াই এআই এখন নিজেকে আরও বেশি শক্তিশালী করে গড়ে তুলতে পারছে।
কোম্পানিটি আরও জানায়, তারা এআই তৈরির কাজ দিন দিন এআইয়ের ওপরেই বেশি ছেড়ে দিচ্ছে। বিভিন্ন লক্ষণ থেকে বোঝা যাচ্ছে, পর্যাপ্ত কম্পিউটিং ক্ষমতা পেলে এআই সম্পূর্ণ স্বাধীনভাবে নিজের চেয়েও উন্নত এআই ডিজাইনও তৈরি করতে সক্ষম হবে।
বাস্তব চিত্র তুলে ধরে অ্যানথ্রোপিক জানায়, ২০২৬ সালের মে মাস পর্যন্ত তাদের নিজস্ব মূল কোডবেসের ৮০ শতাংশের বেশি কোড লিখেছে তাদেরই তৈরি এআই ‘ক্লোড’। উল্লেখ্য, কোডবেস হলো যেকোনো সফটওয়্যার বা প্রযুক্তি তৈরি, পরীক্ষা এবং তা টিকিয়ে রাখার মূল চালিকাশক্তি বা মাস্টারপ্ল্যান।
অন্যান্য প্রযুক্তি কোম্পানির তুলনায় অ্যানথ্রোপিক একটু ব্যতিক্রম। তারা প্রায়ই এআইয়ের দ্রুত উন্নয়নের নানা দিক নিয়ে সতর্ক করে। তারা জানায়, প্রযুক্তির ধারা অনুযায়ী আগামী বছরগুলোতে এআই আরও বেশি শক্তিশালী হয়ে উঠবে। এই ধারার প্রভাব হবে সুদূরপ্রসারী। নিজে নিজেই তৈরি হতে পারা এআই প্রযুক্তি মানব ইতিহাসের এক বিশাল বড় মাইলফলক হতে পারে। এটি বিজ্ঞান, চিকিৎসা, স্বাস্থ্যসেবাসহ বিভিন্ন ক্ষেত্রে মানুষের জন্য অভাবনীয় কল্যাণ বয়ে নিয়ে আসার ক্ষমতা রাখে।
তবে প্রতিষ্ঠানটি সতর্ক করেছে, যদি কোনো এআই নিজেই নিজের উত্তরসূরি তৈরি করতে পারে, তাহলে সেটিকে নিরাপদ রাখা, পর্যবেক্ষণ করা এবং তার আচরণ নিয়ন্ত্রণ করা আরও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠবে।
ফিউচার শিফট ল্যাবসের সহ-প্রতিষ্ঠাতা সাগর বিষ্ণই এ বিষয়ে কথা বলেছেন। তিনি জানান, ভবিষ্যতের এআই সিস্টেমের কোড যেহেতু এআই নিজেই লিখছে, তাই এখন মূল চ্যালেঞ্জ এর ক্ষমতা বাড়ানো নয়, বরং একে নিয়ন্ত্রণে রাখা। এই স্বয়ংক্রিয় উন্নতি উদ্ভাবনের গতি অনেক বাড়িয়ে দেবে। তবে এটি নিরাপত্তা ও জবাবদিহি নিয়েও বড় প্রশ্ন তুলবে। আসল পরীক্ষা হবে এটিই নিশ্চিত করা যে, এআই যতই শক্তিশালী হোক না কেন, তা যেন মানুষের কল্যাণে কাজ করে।
কাজ স্থগিত রাখার প্রস্তাব ও বিতর্ক এই পরিস্থিতি সামাল দিতে অ্যানথ্রোপিক বলছে, এই খাতের সব কোম্পানির একসঙ্গে বসে অত্যাধুনিক এআই বা ‘ফ্রন্টিয়ার এআই’ তৈরির কাজ কিছুদিনের জন্য ‘স্থগিত’ করা উচিত। তবে তারা এই ভয়ও পাচ্ছে যে, এই ধীরগতির সুযোগ নিয়ে যদি কম দায়িত্বশীল কোনো দেশ বা কোম্পানি প্রযুক্তিতে এগিয়ে যায়, তবে তা সবার নিরাপত্তাকেই ঝুঁকির মুখে ফেলে দেবে।
কোম্পানিটির বিবৃতিতে বলা হয়, ‘আমরা বিশ্বাস করি ফ্রন্টিয়ার এআইয়ের কাজ সাময়িকভাবে থামিয়ে রাখা বিশ্বের জন্য ভালো হবে। এতে করে সমাজ ও গবেষকরা এই প্রযুক্তির সঙ্গে মানিয়ে নেওয়ার এবং এর নিরাপত্তা নিশ্চিত করার জন্য পর্যাপ্ত সময় পাবেন।’
তবে এআইনসিউরডের প্রধান প্রযুক্তি কর্মকর্তা ড. শ্রীনিবাস পদ্মনাভুনি সংশয় প্রকাশ করে বলেন, ‘ধারণাটি শুনতে ভালো লাগলেও বাস্তবে তা কার্যকর করা কঠিন। কারণ কোনো প্রতিষ্ঠানই প্রতিযোগিতায় পিছিয়ে পড়ার ঝুঁকি নিতে চাইবে না।’
অবশ্য অ্যানথ্রোপিক বসে নেই। তাদের গবেষণা শাখা ‘অ্যানথ্রোপিক ইনস্টিটিউট’ এই ধীরগতির প্রক্রিয়াকে সফল করতে প্রয়োজনীয় সিস্টেম বা কাঠামো নিয়ে কাজ করার পরিকল্পনা করছে।
দ্য কাটিং এজ গ্রুপের প্রতিষ্ঠাতা ও এআই শিক্ষাবিদ অংশ মেহরা অ্যানথ্রোপিকের এই উদ্যোগকে স্বাগত জানিয়েছেন। তিনি বলেন, প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠানগুলোর উচিত আগামী ছয় মাস নতুন বৃহৎ ভাষা মডেল (এলএলএম) প্রকাশে স্বেচ্ছায় বিরতি দেওয়া। এই সময়টায় মানুষের দক্ষতা বৃদ্ধি, প্রযুক্তির ব্যবহার এবং বাস্তব প্রয়োগে বেশি গুরুত্ব দেওয়া উচিত।
ইতিহাসের উদাহরণ টেনে অংশ মেহরা বলেন, ‘আমরা ১৯৭০-এর দশকে ডিএনএ প্রযুক্তির সময়েও এমনটি দেখেছিলাম। তখন বিজ্ঞানীরা কেবল অন্ধের মতো আবিষ্কারের পেছনে ছুটে যাননি। তারা প্রথমে এর নিরাপত্তা নীতিমালা নিয়ে বিতর্ক ও আলোচনা করেছিলেন।’
তবে পদ্মনাভুনির মতো তিনিও সন্দেহ প্রকাশ করেছেন যে, এআই প্রতিযোগিতায় থাকা বড় প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠানগুলো এমন বিরতিতে রাজি হবে কি না।
অন্যদিকে ‘শর্টহিলস এআই’য়ের সহ-প্রতিষ্ঠাতা ও প্রেসিডেন্ট পবন প্রভাত অবশ্য মানুষের নিয়ন্ত্রণ হারানোর ভয় নিয়ে একটু ভিন্নমত পোষণ করেন। তিনি বলেন, “আমি ‘দ্য ম্যাট্রিক্স’ বা ‘টার্মিনেটর’ সিনেমার মতো চরম কোনো পরিস্থিতির ব্যাপারে চিন্তিত নই। কারণ এআই যদি কখনো মানুষের অস্তিত্বের জন্য হুমকি হয়ে দাঁড়ায়, মানুষ সব সময়ই এর প্লাগ টেনে (লাইন কেটে) এটি বন্ধ করে দিতে পারবে।”
তবে তিনি সতর্ক করেছেন, নিজেকে উন্নত করতে সক্ষম অত্যন্ত শক্তিশালী এআই মানবজাতির জন্য অনেক উপকার বয়ে আনতে পারে। কিন্তু এর সঙ্গে সামাজিক মূল্য বা নেতিবাচক প্রভাবও থাকবে।