যুক্তরাষ্ট্র ও চীন তাদের চলমান শুল্কযুদ্ধে ৯০ দিনের জন্য বিরতি দিতে সম্মত হয়েছে। দুই দেশ একে অপরের পণ্যের ওপর আরোপিত অধিকাংশ শুল্ক হ্রাস করার সিদ্ধান্ত নিয়েছে। এই চুক্তির ফলে বৈশ্বিক অর্থনীতিতে কিছুটা স্বস্তি ফিরে এসেছে এবং শেয়ারবাজারে ইতিবাচক প্রভাব পড়েছে।
সোমবার (১৩ মে) সুইজারল্যান্ডের জেনেভায় অনুষ্ঠিত দ্বিপক্ষীয় আলোচনার পর এই চুক্তি হয়, যা বৈশ্বিক অর্থনীতির ওপর চাপ কমাতে বড় একটি পদক্ষেপ হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে।
যুক্তরাষ্ট্রের অর্থমন্ত্রী স্কট বেসেন্ট গতকাল জানান, উভয় দেশই ১৪ মে (আগামীকাল) থেকে তাদের শুল্ক ৯০ দিনের জন্য সাময়িকভাবে ৩০ শতাংশ ও ১০ শতাংশে নামিয়ে আনবে। এর আগে চীন যুক্তরাষ্ট্রের পণ্যে ১২৫ শতাংশ শুল্ক আরোপ করেছিল এবং যুক্তরাষ্ট্র চীনা পণ্যে ১৪৫ শতাংশ শুল্ক বসিয়েছিল। এই উচ্চ শুল্কের ফলে দুই দেশের মধ্যে বাণিজ্য প্রায় স্থবির হয়ে পড়েছিল।
নতুন চুক্তির অধীনে, উভয় দেশ তাদের প্রতিশোধমূলক শুল্কগুলো বাতিল করছে এবং একটি আলোচনা চালু রাখবে, যাতে ভবিষ্যতে আরও ভারসাম্যপূর্ণ বাণিজ্য সম্ভব হয়। বেসেন্ট বলেন, ‘উচ্চ শুল্ক কার্যত এক ধরনের নিষেধাজ্ঞার মতো ছিল, যা কেউই চায় না। দুই দেশই বাণিজ্য বজায় রাখতে চায়, তবে সেটা আরও সুষ্ঠুভাবে।’
চীনের বাণিজ্য মন্ত্রণালয় জানিয়েছে, এই চুক্তি মতপার্থক্য নিরসনের একটি গুরুত্বপূর্ণ ধাপ এবং ভবিষ্যতে সহযোগিতার ভিত্তি তৈরি করবে।
শুল্ক কমানোর খবর প্রকাশের পর বিশ্বজুড়ে শেয়ারবাজারে ঊর্ধ্বগতি দেখা যায়। হংকংয়ের হ্যাং সেং সূচক ৩% বৃদ্ধি পায়, আর ইউরোপের বাজারেও ইতিবাচক প্রবণতা দেখা যায়। জাহাজ পরিবহন সংস্থাগুলোর শেয়ারদরও বেড়ে যায়। কারণ যুক্তরাষ্ট্র ও চীনের মধ্যে পণ্য চলাচল আবার গতি পাবে বলে আশা করা হচ্ছে। তবে সোনার দাম ৩ শতাংশ হ্রাস পেয়েছে। কারণ বিনিয়োগকারীরা এখন তুলনামূলকভাবে ঝুঁকিপূর্ণ খাতে ফিরে আসছেন।
শুল্কযুদ্ধের কারণে চীন থেকে যুক্তরাষ্ট্রে পণ্য রপ্তানি হ্রাস পাওয়ায় উভয় দেশেই অর্থনৈতিক চাপ বাড়ছিল। চীনে কয়েক মিলিয়ন কর্মসংস্থান হুমকির মুখে পড়ে এবং যুক্তরাষ্ট্রে মুদ্রাস্ফীতি ও সরবরাহ সংকট দেখা দেয়। চুক্তির ফলে এই সংকট কিছুটা হলেও প্রশমিত হবে বলে আশা করা হচ্ছে।
বিশ্লেষকরা বলছেন, যদিও এটি একটি গুরুত্বপূর্ণ অগ্রগতি, তবে এটি দুই দেশের মধ্যে মৌলিক পার্থক্যগুলোর স্থায়ী সমাধান নয়। রেনমিন বিশ্ববিদ্যালয়ের ওয়াং ওয়েন বলেন, ‘এটি একটি অপ্রত্যাশিত সাফল্য হলেও, দুই দেশের মধ্যে কাঠামোগত দ্বন্দ্ব এখনো বিদ্যমান।’
এই ৯০ দিনের বিরতির সময় দুই দেশ ‘অর্থনৈতিক ও বাণিজ্য সম্পর্ক নিয়ে ভবিষ্যতে আলোচনা চালিয়ে যাওয়ার জন্য একটি যৌথ মেকানিজম গঠন’ করবে বলে জানানো হয়েছে। যুক্তরাষ্ট্রের অর্থমন্ত্রী স্কট বেসেন্ট ও চীনের উপ-প্রধানমন্ত্রী হে লিফেং এই কমিটির নেতৃত্ব দেবেন।
শুল্কযুদ্ধে বিশ্বব্যাপী শেয়ারবাজার ও উৎপাদন ব্যবস্থায় যে অস্থিরতা সৃষ্টি হয়েছিল, এই চুক্তি তা কিছুটা হলেও প্রশমিত করতে সক্ষম হবে বলে মনে করছেন অর্থনীতিবিদরা। এখন এই সাময়িক চুক্তি কীভাবে একটি স্থায়ী সমঝোতায় পরিণত হয়, সেটাই দেখার বিষয়। সূত্র: বিবিসি, দ্য গার্ডিয়ান