ইরান-ইসরায়েলের উত্তেজনার পারদ ক্রমেই বেড়ে চলেছে। গত শুক্রবার (১৩ জুন) ভোরে ইরান ও ইসরায়েলের পাল্টাপাল্টি হামলার জেরে উত্তপ্ত হয়ে উঠেছে সমগ্র মধ্যপ্রাচ্য।
এই পরিস্থিতিতে ইতোমধ্যেই বৈশ্বিক জ্বালানি পরিবহনের জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ জলপথ হরমুজ প্রণালি বন্ধ করে দেওয়ার হুমকি দিয়েছে ইরান।
ইরানের রাষ্ট্রীয় সংবাদমাধ্যম আইআরআইএনএন এর খবরে বলা হয়, ইসরায়েলের হামলার জবাবে ইরান হরমুজ প্রণালী বন্ধের বিষয়টি গুরুত্ব দিয়ে বিবেচনা করছে। এমন মন্তব্য করেছেন দেশটির সংসদের নিরাপত্তা কমিশনের সদস্য এসমাইল কসারি।
কাতারভিত্তিক সংবাদমাধ্যম আল-জাজিরাকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে, ন্যাশনাল ইরানিয়ান আমেরিকান কাউন্সিলের (এনআইএসি) প্রেসিডেন্ট জামাল আবদি এই হুমকিকে ইরানের ‘ট্রাম্প কার্ড’ হিসেবে অভিহিত করেছেন।
হরমুজ প্রণালী, যেটিকে নানাবিধ কারণেই দ্য পাওয়ার অব করিডর নামেও ডাকা হয়। গুরুত্বপূর্ণ এই প্রণালী বন্ধ হয়ে গেলে সম্ভাব্য ভয়াবহ অর্থনৈতিক পরিণতি নিয়ে উদ্বেগ বাড়ছে। জামাল আবদি বলেন, ‘এটি প্রতিরোধের একটি প্রধান রূপ হতে পারে। অবশ্য ইরান আগেও এ ধরনের হুমকি দিয়েছে। কিন্তু কখনোই কার্যকর করেনি।'
প্রশ্ন উঠেছে, ইরান যদি হরমুজ প্রণালী বন্ধ করে দেয় তাহলে বিশ্বজুড়ে এর প্রভাব কী হবে?
হরমুজ প্রণালি বন্ধ করে দেওয়া মানে বিশ্ব অর্থনীতির শ্বাসরোধ করা। অর্থনীতিতে এটির ব্যাপক প্রভাব পড়বে। যদিও খুব ছোট একটি জলপথ হলেও এটিকে একটি চোকপয়েন্ট বানিয়ে নিয়ন্ত্রণ করার জন্য যে সক্ষমতা দরকার তা ইরানের আছে কীনা তা নিয়ে সংশয় আছে।
যুক্তরাষ্ট্রের হিউস্টন বিশ্ববিদ্যালয়ের জ্বালানি বিশেষজ্ঞ ও অধ্যাপক এড হির্স জানান, ইরান যদি হরমুজ প্রণালী বন্ধ করে দেয়, তাহলে তেলের আন্তর্জাতিক বাজারে বড় ধরনের প্রভাব ফেলবে। বিশ্বজুড়ে তেলের দাম বাড়বে আশঙ্কাজনকভাবে।
যদি হরমুজ প্রণালী দিয়ে তেল পরিবহন অর্ধেকেও নেমে আসে, তাহলে বিশ্ববাজারে তেলের দাম ব্যারেলপ্রতি ১২০ মার্কিন ডলার বা তারও বেশি হতে পারে। আর দাম বৃদ্ধির এই প্রভাব বিশ্বজুড়ে সব দেশের ওপরই দ্রুত পড়বে।
এই প্রণালী দিয়ে বিশ্বের মোট তেলের প্রায় ২০ শতাংশ পরিবহন করা হয়। এই রুটে প্রতিদিন প্রায় ১৮ থেকে ২০ মিলিয়ন ব্যারেল তেল পরিবাহিত হয়। আর সৌদি আরব, কুয়েত ও অন্যান্য উপসাগরীয় দেশগুলোর জন্য আর কোনো সহজ বিকল্প রুট নেই।
এছাড়া হরমুজ প্রণালী বন্ধ হলে এটি যুক্তরাষ্ট্রের জন্য ইরানে সরাসরি হামলার একটা অজুহাত হয়ে উঠতে পারে। সেক্ষেত্রে মধ্যপ্রাচ্যজুড়ে অশান্তির কোনও সীমা থাকবে না।
হরমুজ প্রণালী হলো পারস্য উপসাগরে প্রবেশের একমাত্র সমুদ্রপথ। মূলত হরমুজ প্রণালী হচ্ছে ইরান ও ওমানের মাঝখানে অবস্থিত একটি সংকীর্ণ পানিপথ, যার মাধ্যমে উপসাগরীয় দেশগুলোর অধিকাংশ তেল রপ্তানি হয়। এর আগে ২০১৯ সালে যুক্তরাষ্ট্র তেহরানের তেল রপ্তানির ওপর কঠোর নিষেধাজ্ঞা আরোপ করার পর ইরান এই প্রণালী বন্ধের হুমকি দিয়েছিল।
বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন, হরমুজ প্রণালি বন্ধ হয়ে গেলে বিশ্ববাজারে অপরিশোধিত জ্বালানি তেলের সরবরাহ মারাত্মকভাবে ব্যাহত হবে। এতে তেলের দাম আকাশচুম্বী হবে এবং বিশ্বব্যাপী মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যাবে। এর ফলে বৈশ্বিক অর্থনীতিতে মন্দার ঝুঁকি আরও প্রকট হবে।
অনেকেই আবার হরমুজ প্রণালি বন্ধে ইরানের এই হুমকিকে একটি কৌশলগত চাল হিসেবে দেখছেন। তাদের মতে, এর মাধ্যমে হয়ত ইরান আঞ্চলিক সংঘাতের গতিপথ পরিবর্তন করতে চাচ্ছে। সেই সঙ্গে এটি আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের কাছ থেকে ছাড় আদায় করারও একটি কৌশল হতে পারে। তবে এই ‘ট্রাম্প কার্ড’ শেষ পর্যন্ত কী পরিণতি নিয়ে আসে, সেটাই এখন দেখার বিষয়।
সুলতানা দিনা/