তুরস্কের বিরুদ্ধে চার দশকব্যাপী সশস্ত্র লড়াইয়ের অবসান ঘটিয়ে নিরস্ত্রীকরণ প্রক্রিয়া শুরু করেছে কুর্দিস্তান ওয়ার্কার্স পার্টি (পিকেকে)। ১৯৮৪ সাল থেকে এ পর্যন্ত ৪০ হাজারের বেশি মানুষ নিহত হয়েছেন তুরস্ক ও পিকেকের মধ্যকার সংঘর্ষে।
শুক্রবার (১১ জুলাই) ইরাকের উত্তরাঞ্চলীয় কুর্দি অঞ্চলে একটি ছোট আনুষ্ঠানিকতায় ২০ থেকে ৩০ জন পিকেকে সদস্য প্রতীকীভাবে অস্ত্র ধ্বংস করতে শুরু করেন। তারা এগুলো কোনো সরকার বা কর্তৃপক্ষের কাছে হস্তান্তর না করে নিজেরাই ধ্বংস করছেন। কঠোর নিরাপত্তার মধ্য দিয়ে শুরু হওয়া এই প্রক্রিয়া গ্রীষ্মকালজুড়ে চলবে বলে ধারণা করা হচ্ছে।
তুরস্কের প্রেসিডেন্ট রিসেপ তাইয়্যেব এরদোয়ান এ পদক্ষেপকে স্বাগত জানিয়ে বলেছেন, ‘এটি আমাদের দেশের পায়ে পরানো রক্তাক্ত শৃঙ্খল ছিঁড়ে ফেলে দেওয়ার মতো ঘটনা।’ তিনি বলেন, ‘এতে পুরো অঞ্চল উপকৃত হবে।’
এই পদক্ষেপের আগে গত মে মাসে পিকেকে তাদের সশস্ত্র সংগ্রাম পরিত্যাগের ঘোষণা দেয়। সংগঠনটিকে তুরস্ক, ইউরোপীয় ইউনিয়ন ও যুক্তরাষ্ট্র দীর্ঘদিন ধরে ‘সন্ত্রাসী’ গোষ্ঠী হিসেবে তালিকাভুক্ত করে রেখেছে।
প্রায় ৪০ বছরের সংঘাতে দক্ষিণ-পূর্ব তুরস্ক থেকে বহু কুর্দি নাগরিক সহিংসতা এড়িয়ে উত্তরাঞ্চলের শহরগুলোতে আশ্রয় নিতে বাধ্য হন।
পিকেকে-ঘনিষ্ঠ ফিরাত নিউজ এজেন্সি সম্প্রতি এক ভিডিও প্রকাশ করে, যেখানে সংগঠনের বন্দি নেতা আবদুল্লাহ ওজালান এই পদক্ষেপকে “সশস্ত্র লড়াই থেকে গণতান্ত্রিক রাজনীতি ও আইনের পথে স্বেচ্ছায় উত্তরণের একটি ঐতিহাসিক অর্জন” বলে অভিহিত করেন। ভিডিওটি জুনে ধারণ করা হলেও সম্প্রতি সম্প্রচারিত হয়।
ওজালান ১৯৯৯ সাল থেকে তুরস্কের ইমরালি দ্বীপে একাকী কারাবন্দি। বন্দিত্বে থেকেও তিনি সংগঠন ও এর বিভিন্ন শাখার জন্য একটি প্রতীকী নেতা হিসেবে রয়েছেন।
তুরস্কের কুর্দি ডিইএম (DEM) পার্টি ও স্থানীয় গণমাধ্যম নিবিড়ভাবে এই নিরস্ত্রীকরণ পর্যবেক্ষণ করছে। পরবর্তী ধাপগুলো নির্ধারিত স্থানে তুরস্ক, ইরাক ও ইরাকের কুর্দি স্বায়ত্তশাসিত সরকারের সমন্বয়ে বাস্তবায়িত হবে।
সংঘাতের প্রভাব শুধু তুরস্কেই নয়, ইরাক, সিরিয়া ও ইরানেও গভীরভাবে অনুভূত হয়েছে, যেখানে পিকেকে ও তাদের সহযোগী গোষ্ঠীগুলোর উপস্থিতি রয়েছে।
‘এখনও অনেক পথ বাকি’
আল জাজিরার প্রতিবেদন অনুসারে, অস্ত্র জমাদানের অনুষ্ঠানটি ছিল অত্যন্ত প্রতীকী, যেখানে ইরাকের কেন্দ্রীয় সরকার ও কুর্দি স্বায়ত্তশাসিত প্রশাসনের উচ্চপর্যায়ের কর্মকর্তারা উপস্থিত ছিলেন।
তিনি বলেন, ‘এটি একটি গুরুত্বপূর্ণ মুহূর্ত, কিন্তু পথ এখনো দীর্ঘ। পিকেকে কিছু দাবি জানিয়েছে, যার মধ্যে রয়েছে তাদের নেতা ওজালানের মুক্তি এবং তাকে ইরাকের উত্তরাঞ্চলে এনে ‘গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়া’ পরিচালনার সুযোগ দেওয়া।’
২০২৪ সালের এপ্রিল মাসে ইরাক সরকার পিকেকে-কে আনুষ্ঠানিকভাবে নিষিদ্ধ সংগঠন ঘোষণা করে। তার আগে তুরস্ক-ইরাক নিরাপত্তা বৈঠকে এ সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়।
ইস্তানবুল থেকে আল জাজিরার প্রতিনিধি সিনেম কোসেউগ্লু জানিয়েছেন, আঙ্কারার কাছে সুলাইমানিয়ার এই উদ্যোগ কয়েক দশকের সংঘাত অবসানের বড় পদক্ষেপ হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে।
‘তুরস্ক ও কুর্দি - উভয় পক্ষের হাজার হাজার প্রাণহানির পর এটি একটি গুরুত্বপূর্ণ অগ্রগতি। এমনকি অতীতে যারা শান্তি প্রক্রিয়াকে ‘দেশদ্রোহ’ বলে অভিহিত করত, সেই জাতীয়তাবাদী দল (এমএইচপি) পর্যন্ত এখন এই প্রক্রিয়াকে সমর্থন করছে।’
প্রো-কুর্দি ডিইএম পার্টি মূল ভূমিকা পালন করছে। এমনকি প্রধান বিরোধী দল সিএইচপি - যারা একসময় শান্তি প্রক্রিয়ার তীব্র সমালোচক ছিল - এখন শান্তি প্রতিষ্ঠার প্রচেষ্টাকে সমর্থন করছে।
‘পিকেকে চলে গেলে গোলাবর্ষণও থামবে’
ইরাকের উত্তরাঞ্চলে, যেখানে পিকেকে ও তুরস্কের মধ্যে সংঘাত প্রায়শই ছড়িয়ে পড়ে, সেখানকার সাধারণ মানুষ এখন কিছুটা আশাবাদী।
সুলাইমানিয়ার আমেদি জেলার পার্বত্য গ্রামগুলোতে গিয়ে আবদেলওয়াহেদ দেখেছেন, কীভাবে স্থানীয় জনগণ লড়াইয়ের সরাসরি শিকার। সেখানে বহু গ্রাম এখন কার্যত যুদ্ধক্ষেত্রে পরিণত হয়েছে।
একজন কৃষক শিরওয়ান সিরকলি বলেন, ‘আমার খামার গোলাবর্ষণে পুড়ে গেছে। তুরস্ক ও পিকেকের সংঘাত আমাদের ভূমিতে চলে এসেছে। আমার ভাইয়ের তিন লাখ ডলারের (সাড়ে ৪ কোটির বেশি টাকার) খামার নষ্ট হয়েছে। গ্রামের ১০০টি পরিবারের মধ্যে মাত্র ৩৫টি এখনো টিকে আছে।’
স্থানীয় নেতা আহমদ সাদুল্লাহ বলেন, ‘পিকেকে যেদিন এই এলাকা ছাড়বে, সেদিনই গোলাবর্ষণ বন্ধ হবে। আমরা চাই, শান্তিচুক্তি বাস্তবায়ন হোক, যেন আমরা আবার আমাদের জমিতে ফিরে শান্তিতে থাকতে পারি।’ সূত্র: আল জাজিরা
মাহফুজ/