আগামী পহেলা আগস্ট থেকে কানাডা থেকে আমদানিকৃত পণ্যে ৩৫ শতাংশ শুল্ক আরোপ করবে যুক্তরাষ্ট্র - এমন ঘোষণা দিয়েছেন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প। পাশাপাশি তিনি যুক্তরাষ্ট্রের অন্যান্য বাণিজ্য অংশীদারদের ওপরও ১৫ থেকে ২০ শতাংশ ‘সর্বজনীন’ শুল্ক আরোপের হুমকি দিয়েছেন।
স্থানীয় সময় বৃহস্পতিবার (১০ জুলাই) রাতে কানাডার উদ্দেশে পাঠানো এক চিঠিতে ট্রাম্প এ ঘোষণা দেন। এর আগে এনবিসি নিউজকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে তিনি জানান, ইউরোপীয় ইউনিয়নের দেশগুলোও খুব শিগগিরই শুল্ক সংক্রান্ত ঘোষণা শুনতে পাবে।
ট্রাম্প বলেন, যেসব দেশ তার কাছ থেকে কোনো চিঠি পায়নি, তাদের ওপর তুলনামূলক বেশি হারে শুল্ক আরোপ করা হবে, যদি না তারা ১০ শতাংশের ‘প্রতিশোধমূলক’ (reciprocal) বাণিজ্য চুক্তিতে সম্মত হয়।
সাক্ষাৎকারে তিনি বলেন, বাকি সব দেশকে আমরা শুধু বলব—তোমাদেরকে ১৫ বা ২০ শতাংশ শুল্ক দিতেই হবে। আমরা এখন এই বিষয়গুলো গুছিয়ে নিচ্ছি।’
নিজস্ব সামাজিক মাধ্যমে ট্রুথ স্যোশালে প্রকাশিত চিঠিতে ট্রাম্প কানাডার প্রধানমন্ত্রী মার্ক কার্নিকে জানান, ১ আগস্ট থেকে শুল্ক কার্যকর হবে এবং কানাডা পাল্টা ব্যবস্থা নিলে তা আরও বাড়ানো হবে।
জবাবে কার্নি এক্স (সাবেক টুইটার)-এ বলেন, “যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে চলমান বাণিজ্য আলোচনায় কানাডা সবসময় আমাদের শ্রমিক ও ব্যবসা প্রতিষ্ঠানগুলোর স্বার্থ রক্ষা করেছে। ১ আগস্টের নতুন সময়সীমা সামনে রেখে আমরা সেই অবস্থান বজায় রাখব।”
চিঠিতে ট্রাম্প অভিযোগ করেন, কানাডা থেকে যুক্তরাষ্ট্রে ফেন্টানিল নামক প্রাণঘাতী মাদক প্রবাহিত হচ্ছে। তিনি লিখেন, ‘যদি কানাডা ফেন্টানিল ঠেকাতে আমার সঙ্গে কাজ করে, তাহলে আমরা হয়তো এই চিঠির কিছু অংশ পুনর্বিবেচনা করতে পারি।’
তবে কানাডীয় কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, যুক্তরাষ্ট্রে প্রবেশ করা ফেন্টানিলের পরিমাণের খুবই সামান্য অংশ কানাডা থেকে আসে। এর জবাবে কার্নি বলেন, ‘উত্তর আমেরিকায় ফেন্টানিল (মাদক) মোকাবেলায় কানাডা গুরুত্বপূর্ণ অগ্রগতি অর্জন করেছে। আমরা যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে যৌথভাবে কাজ চালিয়ে যেতে প্রতিশ্রুতিবদ্ধ, যাতে উভয় দেশের মানুষকে রক্ষা করা যায়।’
যুক্তরাষ্ট্রের সাবেক কর্মকর্তারা সতর্ক করেছেন, ট্রাম্পের কঠোর বাণিজ্য নীতিগুলো দেশটিকে বিদেশি সিনথেটিক মাদক প্রবাহের ক্ষেত্রে আরও ঝুঁকির মুখে ফেলতে পারে।
এক মার্কিন প্রশাসনিক কর্মকর্তা জানান, ট্রাম্পের ২০২০ সালের ইউএসএমসিএ (USMCA) চুক্তিভুক্ত পণ্যে সম্ভাব্যভাবে শুল্ক ছাড় দেওয়া হতে পারে, যদিও এখনো কোনো চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত হয়নি। এ ধরনের ছাড় পাওয়া গেলে কানাডার ওপর শুল্ক বৃদ্ধির প্রভাব অনেকটাই হ্রাস পাবে।
চলতি বছরের মার্চে ট্রাম্প কানাডা থেকে আমদানিকৃত গাড়ি ও গাড়ির যন্ত্রাংশে ২৫ শতাংশ শুল্ক দেন। জুনে কানাডার স্টিল ও অ্যালুমিনিয়ামে ৫০ শতাংশ শুল্ক আরোপ করেন। নতুন ৩৫ শতাংশ হারে শুল্ক এই তালিকার বাইরে থাকা সব পণ্যের ক্ষেত্রে কার্যকর হবে।
বর্তমানে কানাডা ও যুক্তরাষ্ট্র একটি সমঝোতার লক্ষ্যে আলোচনায় আছে, তবে ট্রাম্পের সর্বশেষ হুমকি আলোচনার ভবিষ্যৎকে অনিশ্চিত করে তুলেছে। এ সপ্তাহে তিনি বিশ্বের বহু দেশের উদ্দেশে ২০টিরও বেশি অনুরূপ চিঠি পাঠিয়েছেন।
তবে ট্রাম্পের ঘোষিত নতুন শুল্ক হার আদালতে চ্যালেঞ্জের মুখে শূন্যে নেমে আসতে পারে, যদি চলতি মাসের শেষে মার্কিন আন্তর্জাতিক বাণিজ্য আদালতের এক রায়ের বিরুদ্ধে প্রশাসনের আপিল খারিজ হয়। মে মাসে আদালত রায় দিয়েছিল, জরুরি অবস্থা ছাড়া ট্রাম্প প্রেসিডেন্ট হিসেবে শুল্ক আরোপের আইনগত ক্ষমতা অতিক্রম করেছেন।
এই আপিলের শুনানি ৩১ জুলাই সকাল ১০টায় ওয়াশিংটনে যুক্তরাষ্ট্রের ফেডারেল সার্কিট কোর্ট অব আপিলসে অনুষ্ঠিত হবে।
এদিকে কানাডা ও মেক্সিকো নতুন করে যুক্তরাষ্ট্রকে সন্তুষ্ট করতে চাইছে, যাতে ২০২০ সালে প্রবর্তিত ইউএসএমসিএ চুক্তির ভবিষ্যৎ স্থিতিশীল থাকে। এটি আগের নাফটা (NAFTA) চুক্তির পরিবর্তে চালু হয়।
কানাডা ও মেক্সিকোর পণ্যে ইতোমধ্যেই ২৫ শতাংশ পর্যন্ত আমেরিকান শুল্ক বসানো হয়েছে, যদিও কানাডার জ্বালানির ক্ষেত্রে হার কিছুটা কম ছিল। ট্রাম্প উভয় প্রতিবেশী দেশের বিরুদ্ধে অভিযোগ তোলেন যে, তারা অবৈধ অভিবাসন ও মাদক পাচার রোধে যথেষ্ট পদক্ষেপ নিচ্ছে না।
পরবর্তীতে ট্রাম্প ইউএসএমসিএ আওতায় আসা অনেক পণ্যে শুল্ক ছাড়ের ঘোষণা দেন।
বৃহস্পতিবারের চিঠি এমন এক সময় এলো, যখন অনেকেই ট্রাম্প ও কার্নির মধ্যে সম্পর্কের উত্তাপ কমে আসার ইঙ্গিত দেখছিলেন। ৬ মে কার্নি হোয়াইট হাউসে এসে ট্রাম্পের সঙ্গে ওভাল অফিসে সৌহার্দ্যপূর্ণ বৈঠক করেছিলেন।
তবে কানাডা সম্প্রতি একটি ডিজিটাল সার্ভিসেস ট্যাক্স চালু করায় ট্রাম্প আলোচনার টেবিল ছেড়ে দেন। পরে কার্নি সেই কর প্রত্যাহারের ঘোষণা দেন, যা মার্কিন টেক কোম্পানিগুলোর ওপর প্রভাব ফেলতে পারত।
গত কয়েক দিনে ট্রাম্প তার বাণিজ্যযুদ্ধ আরও বিস্তৃত করেছেন। তিনি জাপান ও দক্ষিণ কোরিয়ার মতো মিত্র দেশগুলোর ওপর নতুন শুল্কের হুমকি দিয়েছেন এবং তামার ওপর ৫০ শতাংশ শুল্ক আরোপের ঘোষণাও দিয়েছেন।
এনবিসি-তে বৃহস্পতিবার প্রকাশিত সাক্ষাৎকারে ট্রাম্প বলেন, ‘সব দেশকে চিঠি দিতে হবে এমন না। আমরা শুধু আমাদের শুল্ক ঠিক করে দিচ্ছি। বাকি দেশগুলোকে বলব, তারা ২০ অথবা ১৫ শতাংশ শুল্ক দেবে। আমরা এখন এটা গুছিয়ে নিচ্ছি।’ সূত্র: দ্য গার্ডিয়ান
মাহফুজ/