গাজার দক্ষিণে রাফায় বাড়িঘর ভাঙার অভিযানের গতি বাড়িয়েছে ইসরায়েল। আল-জাজিরার তদন্তে উঠে এসেছে বিষয়টি। এমন একটি সময় এ তথ্য সামনে এল, যখন রাফায় ‘মানবিক শহর’ বানাতে চাইছে ইসরায়েল। ধারণা করা হচ্ছে, ওই পরিকল্পনা বাস্তবায়নের জন্যই গতি বাড়িয়েছে তারা।
মানবিক শহর নাম দিয়ে এক পরিকল্পনা গত সোমবার তুলে ধরেন ইসরায়েলের প্রতিরক্ষামন্ত্রী ইসরায়েল কাৎজ। তিনি বলেন, ‘ওই মানবিক শহরে ৬ লাখ ফিলিস্তিনিকে নিয়ে যাওয়া হবে। তারা সেখানে ঢুকতে পারবেন, কিন্তু বের হতে পারবেন না।’
কাৎজ আরও জানান, একপর্যায়ে গাজার ২০ লাখেরও বেশি বেসামরিক জনসংখ্যার পুরোটাই রাফায় স্থানান্তর করা হবে। ইসরায়েলের এ প্রতিরক্ষামন্ত্রী আরও দাবি করেন, ওই শহর দেখভালের দায়িত্বে ইসরায়েলের সামরিক বাহিনী থাকবে না। আন্তর্জাতিক একাধিক সংস্থা এর দেখভাল করবে। তবে কোন সংস্থাগুলো সে দায়িত্ব পালন করবে, সে বিষয়ে বিস্তারিত কিছু জানাননি তিনি।
বিষয়টি এরই মধ্যে নিন্দা ও সমালোচনার মুখে পড়েছে। বহিঃবিশ্ব ছাড়াও খোদ ইসরায়েলের ভেতর থেকেই বিশেষজ্ঞরা এটি নিয়ে সমালোচনায় মুখর হয়েছেন। এতে আন্তর্জাতিক আইনের লঙ্ঘন হবে বলেও জানিয়েছেন তারা।
অনেকে বলেছেন, আসলে গাজাবাসীকে মিসর সীমান্তবর্তী রাফায় নিয়ে যাওয়া হবে অন্য লক্ষ্যে। পরে তাদের বের করে দেওয়া হতে পারে গাজা থেকেই। গাজার দক্ষিণে ইসরায়েল ‘কনসেনট্রেশন ক্যাম্প’ তৈরি করছে বলেও মন্তব্য করেছে অনেকে।
আল-জাজিরার সানাদ তদন্ত ইউনিট চলতি বছরের ৪ জুলাই থেকে স্যাটেলাইটের ছবি বিশ্লেষণ করে বাড়িঘর ভাঙার কাজের তোড়জোর দেখতে পেয়েছে। তারা হিসাব করে দেখেছে, গত এপ্রিল পর্যন্ত রাফায় ১৫ হাজার ৮০০ বাড়ি ভাঙা হয়েছিল। জুলাইয়ে ভাঙা বাড়ির পরিমাণ দিয়ে দাঁড়িয়েছে ২৮ হাজার ৬০০টিতে। এর অর্থ দাঁড়াচ্ছে যে, এপ্রিলের শুরু থেকে জুলাইয়ের শুরু পর্যন্ত ১২ হাজার ৮০০ বাড়ি ভেঙেছে ইসরায়েল। নিজেদের বিশ্লেষণের কাজে ইউনাইটেড নেশনস স্যাটেলাইট সেন্টারের ছবি ও ডেটা ব্যবহার করেছে তদন্ত ইউনিটটি।
এদিকে, জাতিসংঘের ফিলিস্তিনি শরণার্থীবিষয়ক সংস্থার প্রধান ফিলিপ্পে লাজারানি বলেছেন, ‘এটি আদতে প্রজন্মের পর প্রজন্ম ধরে বাস্তুচ্যুত হতে থাকা ফিলিস্তিনিদের জন্য মিসর সীমান্তে বড় মাপের একটি কনসেনট্রেশন ক্যাম্প।’
তিনি ইসরায়েলকে এ ধরনের কিছু না করার বিষয়েও সতর্ক করেন। তিনি বলেন, ‘এটি করা হলে ফিলিস্তিনিরা নিজেদের মাতৃভূমিতেই ভালো ভবিষ্যৎ পাওয়ার সম্ভাবনা থেকে বঞ্চিত হবেন।’
ইসরায়েলি রাজনৈতিক ধারাভাষ্যকার ওরি গোল্ডবার্গের মতেও এটি দক্ষিণ গাজায় কনসেনট্রেশন ক্যাম্প গড়ে তোলার শামিল। তিনি আরও বলেন, ‘ইসরায়েল যা করছে তা মূলত আন্তর্জাতিক মানবিক আইনের অধীনে মানবতাবিরোধী অপরাধ।’
বর্তমানে যুক্তরাষ্ট্র ও কাতারের মধ্যস্থতায় হামাস-ইসরায়েলের প্রতিনিধিদল যুদ্ধবিরতিতে পৌঁছানোর চেষ্টা করছে। সাম্প্রতিক সময়ে যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প, ইসরায়েলি প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহুসহ অনেকে ইতিবাচক ইঙ্গিত দিলেও সে আলোচনা ভেঙে পড়ার উপক্রম হয়েছে। গাজার ভেতরে প্রায় তিন কিলোমিটার পর্যন্ত বাফার অঞ্চল তৈরি করতে চায় ইসরায়েল। সেটি নিয়ে রাজি নয় হামাস। ইসরায়েল শুরুতে মৌখিকভাবে বলেছিল, দেড় কিলোমিটার বাফার অঞ্চলের কথা। হামাস সেটি নিয়ে রাজি ছিল। কিন্তু পরে মানচিত্রে ইসরায়েলি প্রতিনিধিদল তা বাড়িয়ে দেখায়। এটি নিয়ে ক্ষুব্ধ হয় তারা। এরকম পরিস্থিতিতে যুক্তরাষ্ট্রকে ইসরায়েলের ওপর চাপ বৃদ্ধির আহ্বানও জানিয়েছে হামাস।
তবে এতসব ডামাডোলেও গাজায় হামলা থেমে নেই। প্রতিদিনই সেখানে বাস্তুচ্যুত মানুষ ও ত্রাণপ্রত্যাশীদের ওপর হামলা চালাচ্ছে ইসরায়েলি বাহিনী। সূত্র: আল-জাজিরা